যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে অন্যতম আলোচিত নাম অ্যান্ডি বার্নহাম। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বর্তমান মেয়র, সাবেক মন্ত্রী ও দীর্ঘদিনের লেবার পার্টির এই নেতাকে অনেকেই দেশটির ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন। ১৮ জুন মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচন ঘিরে তিনি এখন ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
অ্যান্ডি বার্নহাম দীর্ঘদিন ধরে লেবার পার্টির পরিচিত মুখ। এর আগে তিনি স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৫ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি উত্তর ইংল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির ভরাডুবি, দলের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বার্নহামের নাম নতুন করে আলোচনায় আসে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, স্টারমারের বিকল্প হিসেবে লেবার পার্টির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মুখ হতে পারেন তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের সংসদীয় আসন মেকারফিল্ডের লেবার পার্টির হাউস অব কমন্সের সদস্য (এমপি) জশ সাইমন্স পদত্যাগ করেছেন, যাতে বার্নহাম উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে আবার পার্লামেন্টে ফিরতে পারেন। কারণ, লেবার পার্টির নেতৃত্বের দৌড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিতে হলে পার্লামেন্টের সদস্য হতে হয়।
ঐতিহাসিকভাবে মেকারফিল্ড লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে ১৮ জুনের এই নির্বাচনকে কেবল একটি আসনের ভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের লড়াইয়ের সূচক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উপনির্বাচনে বার্নহামের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী নাইজেল ফারাজের ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকে। গত ৭ মে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে দলটি ওই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। অভিবাসন, ব্রেক্সিট ও জাতিগত পরিচয়ের মতো ইস্যুগুলো সামনে এনে তারা ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে কিয়ার স্টারমার সরকারের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষও বার্নহামের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক ভোটার ব্যক্তিগতভাবে বার্নহামকে পছন্দ করলেও জাতীয় পর্যায়ে লেবার পার্টির প্রতি যে ক্ষোভ রয়েছে, তা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই নির্বাচনকে অনেকেই বার্নহামের জন্য একধরনের রাজনৈতিক গণভোট হিসেবে দেখছেন। জয় তাঁকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগিয়ে দেবে; আর পরাজয় তাঁর নেতৃত্বের স্বপ্নে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও জরিপে বার্নহামকে সামান্য এগিয়ে রাখা হলেও ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখনো উল্লেখযোগ্য। অনেক ভোটার তাঁকে উত্তর ইংল্যান্ডের কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখেন। তবে রিফর্ম ইউকের উত্থান এবং লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ সংকট নির্বাচনের ফলকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা প্রায় ৪৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি জরিপে দেখা গেছে, লেবার পার্টির জাতীয় জনপ্রিয়তার চেয়ে বার্নহামের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অনেক বেশি শক্তিশালী।
মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের ফল শুধু একজন এমপিই নির্ধারণ করবে না, এটি লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং সম্ভবত ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হতে পারেন—সেই প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেবে। বার্নহাম জয়ী হয়ে পার্লামেন্টে ফিরলে লেবার পার্টির নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হবেন। আর পরাজিত হলে কিয়ার স্টারমারের অবস্থান সাময়িক শক্তিশালী হলেও লেবার পার্টির নেতৃত্বসংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক থামবে না।
১৮ জুন মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে মোট ১৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন লেবার পার্টির অ্যান্ডি বার্নহাম, রিফর্ম ইউকের রবার্ট কেনিয়ন এবং গ্রিন পার্টির সারাহ ওয়েকফিল্ড। এ ছাড়া কনজারভেটিভ পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, রিস্টোর ব্রিটেন, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসডিপি), ওয়ার্কার্স পার্টি ও লিবার্টারিয়ান পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে মূল লড়াইটি লেবার পার্টি ও রিফর্ম ইউকের মধ্যে হলেও ফল নির্ধারণে অন্য দলগুলোর ভোটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।