
আলবেনিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পরিকল্পিত বিলাসবহুল অবকাশযাপন কেন্দ্র প্রকল্পটির বিরুদ্ধে দেশটিতে বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীরা এ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে তা সত্ত্বেও আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা বলেছেন, তাঁর সরকার এ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বলকান উপকূলের প্রত্যন্ত এলাকায় প্রস্তাবিত এই অবকাশযাপন কেন্দ্র নির্মাণের কথা আছে। প্রকল্পটি বাতিলের দাবিতে রাজধানী তিরানা ও দেশের দক্ষিণ উপকূলের হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের দাবি, ওই স্থানে অবকাশযাপন কেন্দ্র নির্মাণ করা হলে তা সংরক্ষিত জলাভূমির পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতির মুখে ফেলবে। এ জলাভূমি ফ্লেমিঙ্গো, সিল এবং সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
ফ্লেমিঙ্গো পাখিটি চলমান আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভকারীরা গোলাপি রঙের ফোলানো ফ্লেমিঙ্গো এবং ‘ফ্লেমিঙ্গো রেভোল্যুশন’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করছেন।
তবে আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রামা এসব প্রতিবাদে বিচলিত নন। তিনি বলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রকল্পের নকশা ও পরিকল্পনা দেখে মানুষ ‘অবাক’ হবে। তাঁর মতে, দশক শেষ হওয়ার আগেই অবকাশযাপন কেন্দ্রের কিছু অংশ সাধারণ মানুষের জন্যও খুলে দেওয়া হতে পারে।
নিজ কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রামা বলেন, ‘আমি আপনাকে বলছি, এটি একটি দারুণ সুন্দর প্রকল্প হতে যাচ্ছে। আমরা এটি বাস্তবায়ন করব এবং ইউরোপের উন্নয়নে অবদান রাখতে পেরে গর্বিত হব।’
কুশনারের প্রকল্পের বিরুদ্ধে আলবেনিয়ায় রাতের বেলা করে বিক্ষোভ হচ্ছে। এ বিক্ষোভস্থলের অবস্থান এদি রামার কার্যালয় থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে।
রামা বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যই জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে। দেশের উন্নয়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে ভিন্ন ধারণা পোষণকারী কিছু মানুষের নির্দেশনায় চলার জন্য আমাকে নির্বাচিত করা হয়নি।’
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় হাজারো মানুষ রাজধানী তিরানার রাস্তায় নেমে অবকাশযাপন কেন্দ্র প্রকল্পটি বন্ধের দাবি জানান। একই সঙ্গে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার ১৩ বছরের শাসনামল নিয়ে নানা অভিযোগ তোলেন। তাঁদের দাবি, এ সময়ের মধ্যে সরকার দুর্নীতি দূর করতে পারেনি এবং সাধারণ মানুষের জন্য মৌলিক সেবার মানও উল্লেখজনকভাবে উন্নত হয়নি।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী আলবানো লুশি বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন আরও বড় হচ্ছে। তিনি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। শুধু জীববৈচিত্র্য রক্ষা নয়, আমরা প্রতিনিয়ত যেসব অন্যায়–অবিচারের মুখোমুখি হচ্ছি, সেগুলোর বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
বড় স্বপ্ন, বড় বিতর্ক
৬১ বছর বয়সী এদি রামা সাবেক বাস্কেটবল খেলোয়াড় ও শিল্পী। ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি আলবেনিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন।
রামা নিজেকে একজন অনানুষ্ঠানিক ও ব্যতিক্রমধর্মী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। ঢিলেঢালা কালো স্যুট, কালো টি-শার্ট ও সাদা স্নিকার্স পরতে তিনি পছন্দ করেন। তাঁর কার্যালয়ও প্রচলিত সরকারি অফিসের মতো নয়, বরং অনেকটা আধুনিক কো-ওয়ার্কিং স্পেসের মতো। দেয়ালে তাঁর নিজের আঁকা রঙিন চিত্রকর্মের নকশা, চারদিকে ছড়িয়ে থাকে রং পেন্সিল ও মার্কার, আর ডেস্কজুড়ে নানা আঁকিবুঁকি—সবকিছু মিলে যেন তাঁর শিল্পীসত্তার পরিচয় বহন করে।
রামা যে বিলাসবহুল অবকাশযাপন কেন্দ্র প্রকল্পকে সমর্থন করছেন, মূলত সেটির পরিকল্পনা করেছেন ট্রাম্পের মেয়েজামাই জ্যারেড কুশনার এবং তাঁর স্ত্রী ইভাঙ্কা ট্রাম্প। কুশনার ও ইভাঙ্কার ভাষ্যমতে, কয়েক বছর আগে নৌযানে করে আলবেনিয়া সফর করার সময় তাঁরা দেশটির প্রেমে পড়েছেন। ওই সফরেই রামার সঙ্গে তাঁদের পরিচয় হয়। রামার দৃষ্টিতে কুশনার ও ইভাঙ্কা ‘খুবই ভালো, বিনয়ী এবং মানবিক মানুষ।’
বর্তমানে কুশনারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনারস এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আছে। ১৪০ কোটি ইউরো (প্রায় ১৬০ কোটি ডলার) মূল্যের এ প্রকল্পটি ভিজোসা–নারতা নামের সুরক্ষিত এলাকার কাছে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সাজান আইল্যান্ডের কাছেও আরেকটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রামার মতে, দুটি প্রকল্পের সম্মিলিত মূল্য ৫০০ কোটি ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।
রামা বলেন, ‘এটি একটি বড় স্বপ্ন। আর বড় স্বপ্ন সব সময়ই বিতর্কের মুখোমুখি হয়।’
এ প্রকল্পের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অ্যাফিনিটি পার্টনারস কর্তৃপক্ষ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে রয়টার্স। তবে তারা সাড়া দেয়নি।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সাজান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট এলএলসি। প্রতিষ্ঠানটি রয়টার্সকে বলেছে, তারা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এটি বাস্তবায়ন করবে।
বন্য প্রাণী রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেন রামা
বিলাসবহুল রিসোর্ট প্রকল্পটি ঘিরে বিতর্ক চললেও আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা বন্য প্রাণী ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মে মাসের শেষ দিকে ভিজোসা–নারতা সুরক্ষিত এলাকার কাছে অবস্থিত নির্মাণস্থলটিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হলে বিক্ষোভ শুরু হয়। ওই সময় অ্যাকসেস রোড ও প্রাথমিক নির্মাণকাজ চলছিল। সংঘর্ষে কিছু বিক্ষোভকারী আহত হন। পরে এই ক্ষোভ রাজধানী তিরানা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে ওই বেড়া সরিয়ে ফেলা হয়। রামা স্বীকার করেছেন, সে বেড়া বসানোটা একটি ‘লজ্জাজনক সিদ্ধান্ত’ ছিল।
তবে রামা পরিবেশগত উদ্বেগকে ততটা গুরুত্ব দিতে চান না। তাঁর মতে, প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের কাজ এখনো শেষ হয়নি। উন্নয়ন কাজের সঙ্গে সমান্তরালভাবে এটি করা হবে।
আলবেনিয়ায় বন্য প্রাণী রক্ষায় নিজের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে গর্ববোধ করেন রামা। তাঁর মতে, বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সুরক্ষায় আলবেনিয়া সরকারের দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই।