ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভের সময় প্যারিসের প্রজাতন্ত্র চত্বরে একটি ভাস্কর্যের ওপর দাঁড়িয়ে ফরাসি ও ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে বিক্ষোভকারীরা। ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভের সময় প্যারিসের প্রজাতন্ত্র চত্বরে একটি ভাস্কর্যের ওপর দাঁড়িয়ে ফরাসি ও ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে বিক্ষোভকারীরা। ১৭ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্ট কারা, কীভাবে তাঁদের আন্দোলন শুরু হলো

জ্বালানির দাম কমানোর অনলাইন দাবি থেকে ২০১৮ সালে ফ্রান্সে শুরু হয় ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন। একক নেতা ছাড়াই ফেসবুক ও গোলচত্বরের জমায়েতে সংগঠিত হন সাধারণ মানুষ। এখন ভালো শিক্ষা, ন্যায্য মজুরি ও জনসেবার দাবিতে নতুন প্রজন্মকে নিয়ে আবার রাস্তায় নামছেন আন্দোলনকারীরা।

১৭ অক্টোবর ২০২৬। প্যারিসের প্রজাতন্ত্র চত্বরের বিশাল ভাস্কর্যের গায়ে জড়ানো হলো হলুদ জ্যাকেট। নিচে বিক্ষোভকারীদের ভিড়। রয়টার্সের ভিডিওতে ধরা পড়েছে দৃশ্যটি। সাধারণ একটি নিরাপত্তা পোশাক তখন প্রতিবাদের প্রতীক। কিন্তু একটি জ্যাকেট কীভাবে আন্দোলনের পরিচয় হয়ে উঠল?

গত শনিবার প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে আবার বড় শিক্ষার্থী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে বিক্ষোভ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুঁড়েছে। ১ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে। বিক্ষোভে ছিল ইয়েলো ভেস্টের সমন্বয়কারীদের একটি অংশ।

এর আগে ১৭ অক্টোবর শনিবার প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে গত শনিবার সতর্ক অবস্থানে ছিল প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকার। তারপরও বিক্ষোভ ঠেকাতে পারেনি।

ইয়েলো ভেস্ট ফ্রান্সের একটি বিকেন্দ্রীভূত নাগরিক আন্দোলন। সহজ করে বললে, নানা এলাকার মানুষ নিজেদের উদ্যোগে যে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন, এটি তার সম্মিলিত রূপ।

কয়েক দিন ধরে প্যারিসের কিছু এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে রাতে কারফিউ চলছে। লিওঁর কেন্দ্রস্থলে শনিবার বিক্ষোভ নিষিদ্ধ ছিল। মার্সেইয়েও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, তবে পরে একটি শ্রমিক সংগঠনের মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই পটভূমিতে ইয়েলো ভেস্টকে বুঝতে হলে ফিরতে হবে ২০১৮ সালে।

ইয়েলো ভেস্ট আসলে কী

ইয়েলো ভেস্ট ফ্রান্সের একটি বিকেন্দ্রীভূত নাগরিক আন্দোলন। সহজ করে বললে, নানা এলাকার মানুষ নিজেদের উদ্যোগে যে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন, এটি তার সম্মিলিত রূপ। কোনো শ্রমিক ইউনিয়ন, শিক্ষার্থী সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের শাখা নয় এটি। স্থানীয় দলগুলো নিজেদের মতো আলোচনা ও কর্মসূচি চালায়। সর্বজনস্বীকৃত একক প্রধান নেই।

ফরাসি নাম ‘জিলে জোন’, ইংরেজিতে ‘ইয়েলো ভেস্টস’। অর্থ হলুদ জ্যাকেট। গাড়িচালকেরা নিরাপত্তার জন্য এই পোশাক ব্যবহার করেন। সেখান থেকেই আন্দোলনের নাম।

পুরোনো অংশগ্রহণকারী, ইতিমধ্যে কর্মজীবনে ঢোকা তরুণ ও শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে রাস্তায় নামতে পারেন। তাঁর মতে, মানুষ প্রতিবাদ সংগঠনের পদ্ধতি শিখেছে। তাই হলুদ জ্যাকেটকে শুধু পোশাক হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজেদের জীবন নিয়ে কথা বলা এবং সেই কথা রাষ্ট্রকে শোনানোর চেষ্টা।
প্রিসিলিয়া লুদোস্কি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ইয়েলো ভেস্টের প্রথম ডাক দেন

ফ্রান্সে গাড়িতে উজ্জ্বল নিরাপত্তা জ্যাকেট রাখার নিয়ম আছে। গাড়ি বিকল হলে রাস্তায় নামার সময় এটি পরলে চালক অন্যদের চোখে পড়েন। পরিচিত পোশাকটি তাই প্রতিবাদের সহজ প্রতীকে পরিণত হয়। নিজেদের কথা কর্তৃপক্ষকে শোনাতে চাওয়া মানুষদের একে অন্যকে চিনতে দলীয় লোগো বা ব্যাজ লাগল না। গায়ের হলুদ জ্যাকেটই যথেষ্ট।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের সময় কাঁদানে গ্যাসের মধ্যে ফরাসি পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন হলুদ জ্যাকেট পরা এক বিক্ষোভকারী। প্যারিসের প্রজাতন্ত্র চত্বর, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

অনলাইন আবেদন থেকে শুরু

জ্বালানির দাম কমানোর দাবিতে ২০১৮ সালের মে মাসে ইন্টারনেটে একটি আবেদন প্রকাশ করেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রিসিলিয়া লুদোস্কি। তিনি মানুষকে তাতে নিজের নাম লিখে সমর্থন জানানোর আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেদনটি ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তায় বিক্ষোভ শুরুর আগেই এভাবে অনলাইনে সমর্থন গড়ে উঠতে থাকে।

ইয়েলো ভেস্ট ২০১৮ সালের ১৭ নভেম্বর হয় প্রথমবারের মতো ফ্রান্সব্যাপী বড় কর্মসূচি পালন করে। মানুষ মহাসড়ক ও গোলচত্বরে জড়ো হন। এরপর শনিবার হয়ে ওঠে বিক্ষোভের নিয়মিত দিন। করোনাকাল তাতে ছেদ পড়ে।

এর মধ্যে ট্রাকচালক এরিক দ্রুয়েসহ অন্যরা বিক্ষোভ সংগঠিত করতে এগিয়ে আসেন। ২০১৮ সালের ১৭ নভেম্বর হয় প্রথম দেশব্যাপী বড় কর্মসূচি। মানুষ মহাসড়ক ও গোলচত্বরে জড়ো হন। এরপর শনিবার হয়ে ওঠে বিক্ষোভের নিয়মিত দিন। নাটকের পর্বের মতো কর্মসূচিগুলোর নাম হয় ‘অ্যাক্ট’।

বিক্ষোভ শুরুর পর অনলাইন আবেদনেও সমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২৯ নভেম্বর স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। সাপ্তাহিক বিক্ষোভ চলে ২০১৯ সালজুড়েও। ২০২০ সালের মার্চে করোনার বিধিনিষেধে এই ধারায় ছেদ পড়ে। অর্থাৎ প্রথম কর্মসূচির পর প্রায় ১৬ মাস শনিবারের বিক্ষোভ চলেছিল। এবার ‘অ্যাক্ট’ নামকরণও নতুন করে ফিরেছে।

জীবনযাত্রার খরচ ও জ্বালানির দাম বেশি। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করতে গিয়ে আহত হচ্ছেন। হলুদ জ্যাকেটের পাশে নতুন প্রজন্মের উপস্থিতির পেছনে এই মিলিত উদ্বেগ কাজ করছে।
লোলা, ১৯ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী

তখন জ্বালানি কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছিল সরকার। যুক্তি ছিল, দূষণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব যাতায়াতে উৎসাহ দেওয়া। কিন্তু ছোট শহর ও গ্রামের অনেক বাসিন্দার কর্মস্থলে যাওয়ার ভরসা গাড়ি। তাঁদের অভিযোগ, বিকল্প যাতায়াতের সুযোগ না দিয়ে পরিবেশ রক্ষার খরচ তাঁদের ওপর চাপানো হচ্ছে। তাই, পাম্পের দাম বৃদ্ধির প্রশ্নটি হয়ে ওঠে সংসার চালানোর প্রশ্ন।

কারা পরেছিলেন হলুদ জ্যাকেট

চালক, দোকানকর্মী, সেবাকর্মী, কারিগর, ছোট ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অনেকেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। নারীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য।

ফ্রান্সের অর্থনীতি ও ব্যবসাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লা ত্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে গবেষক কামিল বেদক প্রথম দিকের মাঠগবেষণার ফল ব্যাখ্যা করেন। আন্দোলনে যোগ দেওয়া অনেকেরই কাজ আছে, কিন্তু আয় কম। মাস শেষে খরচ মেলানো কঠিন। তাই, তাঁদের সবাইকে বেকার বা একই পেশার মানুষ ভাবলে আন্দোলনের সঠিক চিত্র বোঝা যাবে না।

আন্দোলনকারীরা আরআইসি বা নাগরিকের উদ্যোগে গণভোটের দাবি জানান। অর্থাৎ নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষের সমর্থন পেলে কোনো প্রস্তাব নিয়ে জনগণের সরাসরি ভোটের সুযোগ দিতে হবে।

আবার অনেকে জীবনে প্রথমবার প্রতিবাদে যোগ দেন। ২০২২ সালে ফ্রেঞ্চ পলিটিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন ২০ জনের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখেন, দলীয় রাজনীতি থেকে দূরত্ব কিছু মানুষকে আন্দোলনে যোগ দিতে সাহায্য করেছে। আলোচনায় অংশ নিতে তাঁদের রাজনৈতিক পরিভাষা জানা জরুরি ছিল না। নিজের কাজ, বাড়িভাড়া কিংবা সংসারের গল্পই ছিল আলাপ শুরুর জায়গা।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের সময় প্যারিসের প্রজাতন্ত্র চত্বরে দাঙ্গা পুলিশের মুখোমুখি এক বিক্ষোভকারী। ১৭ অক্টোবর ২০২৬

দাবি শুধু তেলের দাম নিয়ে নয়

আন্দোলনে মজুরি, ন্যায্য কর, জনসেবা ও গণতন্ত্রের দাবিও সামনে আসে। ন্যায্য কর বলতে বেশি সামর্থ্যবান মানুষের ওপর বেশি দায়িত্বের কথা বলা হয়। আর জনসেবা বলতে স্কুল, হাসপাতাল বা গণপরিবহনের মতো সেবাকে বোঝায়।

আন্দোলনকারীরা আরআইসি বা নাগরিকের উদ্যোগে গণভোটের দাবি জানান। অর্থাৎ নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষের সমর্থন পেলে কোনো প্রস্তাব নিয়ে জনগণের সরাসরি ভোটের সুযোগ দিতে হবে।

ইয়েলো ভেস্টে নানা মতের মানুষ মিশেছেন। কেউ বামপন্থী, কেউ ডানপন্থী, কেউ কোনো দলের পরিচয় নিতে অনিচ্ছুক। তাই, ঐক্যের পাশাপাশি মতভেদও আছে।

গবেষকদের মতে, একসঙ্গে থাকতে অনেক অংশগ্রহণকারী নিজেদের দলীয় পছন্দ নিয়ে বিতর্ক এড়াতেন। তবে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বদলাতে চাওয়া নিজেই একটি রাজনৈতিক কাজ। তাই, দলীয় পতাকা না থাকলেও আন্দোলনের রাজনৈতিক অর্থ থাকে।

অনলাইন কর্মকাণ্ড

শুরুতে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে আন্দোলনের দাবি ও কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতো। কিছু গ্রুপ সবার জন্য খোলা। কিছু গ্রুপের আলোচনা কেবল সদস্যদের মধ্যে সীমিত।

আন্দোলনে যোগ দেওয়া অনেকেরই কাজ আছে, কিন্তু আয় কম। মাস শেষে খরচ মেলানো কঠিন। তাই তাঁদের সবাইকে বেকার বা একই পেশার মানুষ ভাবলে আন্দোলনের সঠিক চিত্র বোঝা যাবে না।
কামিল বেদক, গবেষক

কী ঘটছে, কর্মসূচি কী, কোথায় জড়ো হতে হবে—গ্রুপগুলোর মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ত। বিভিন্ন ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে এসব গ্রুপ ও ফেসবুক লাইভের ভূমিকা উঠে এসেছে। নিজের এলাকার ক্ষোভ অন্য এলাকার মানুষও দেখতে পেতেন। সংগঠনের দপ্তর ছাড়াই দেশজুড়ে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছিল।

এবার টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনকারীরা সংগঠিত হচ্ছেন, ভিডিও প্রকাশ করছেন। তবে এই তথ্যপ্রবাহে ভুয়া বক্তব্য, ছবি ও ভিডিওও ছড়াচ্ছে।

১৭ অক্টোবরের আগে মন্ত্রী ও পুলিশের কর্মকর্তার নামে বিক্ষোভকারীদের হুমকি দেওয়ার মনগড়া বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। এএফপি তথ্য যাচাই করে জানায়, বক্তব্যগুলো মিথ্যা।

‘১৭ অক্টোবর জিলেজোন.নেট’ ওয়েবসাইটে চলমান কর্মসূচির মানচিত্র, ক্যালেন্ডার, প্রচারের পোস্টার ও হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় কর্মসূচি যুক্ত করার সুযোগও আছে। একটি গোষ্ঠী এসব কাজ সমন্বয় করছে। তাই, একে সব ইয়েলো ভেস্টের কেন্দ্রীয় কার্যক্রম বলা যাবে না।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান বিক্ষোভকারীরা। প্রজাতন্ত্র চত্বরের কাছে প্যারিসের বুলভার ম্যাজেন্তা সড়কে, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

গোলচত্বরে গড়ে ওঠে সম্পর্ক

ফরাসি ভাষায় গোলচত্বরকে বলা হয় ‘রঁ-পোয়াঁ’। ইয়েলো ভেস্টের কাছে এটি জমায়েত ও আলোচনার জায়গা হয়ে ওঠে। এসব গোলচত্বর নতুন ধরনের জনপরিসরে পরিণত হয়।

রাস্তা আটকানোর পাশাপাশি সেখানে সাময়িক আশ্রয় ও পারস্পরিক সাহায্যের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ অর্থ, খাবার ও আশ্রয় তৈরির সামগ্রী দিয়ে বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করেছেন।

ফ্রান্সের দুই সমাজবিজ্ঞানী আঁতোয়ান বের্নার দ্য রেমঁ ও সিলভ্যাঁ বোর্দিয়েক বিক্ষোভকারীদের জমায়েত হওয়া দুটি গোলচত্বর নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে, সরাসরি যোগাযোগ আন্দোলন ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কর্মসূচি চালান যাঁরা

কর্মসূচি চালাতে বাস্তব প্রস্তুতি লাগে। লুদোস্কি ফরাসি সংবাদমাধ্যম ভেরকে বলেন, ২০১৮ সালে তিনি নানা এলাকার মানুষের সঙ্গে অনেক ভিডিও সভা করেছিলেন। কোথায় জড়ো হতে হবে বা কীভাবে বিক্ষোভের ঘোষণা দিতে হয়, সেসব বোঝাতেন।

এবার কর্মসূচির মানচিত্রের ওয়েবসাইটটির প্রতিষ্ঠাতা ও ইয়েলো ভেস্টের একটি সমন্বয়কারী গোষ্ঠীর মুখপাত্র বেঞ্জামিন বল পুলিশের সঙ্গে প্যারিসের মিছিলের পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ একক প্রধান না থাকলেও সংগঠকের কাজ আছে।

এই পদ্ধতির সমস্যাও আছে। সবার হয়ে কে কথা বলবেন, আলোচনায় পাওয়া সমঝোতা কারা মানবেন—সেই প্রশ্ন ওঠে। ২০১৮ সালে সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে এমন অসুবিধায় পড়েছিল। একই হলুদ পোশাক পরলেও সবার দাবি বা পরের পদক্ষেপ এক ছিল না।

এখন কেন আবার বিক্ষোভ

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সরকার ২০১৯ সালের জন্য পরিকল্পিত জ্বালানি কর বৃদ্ধি বাতিল করে। এটি আন্দোলনের একটি স্পষ্ট অর্জন। পরে বিক্ষোভে উপস্থিতি কমে। তবে ক্ষোভ শুধু জ্বালানির দামে সীমিত থাকেনি।

এবার ভালো স্কুল ও শিক্ষক পাওয়ার দাবি থেকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এর সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান কমে যাওয়াসহ নানা বিষয় যুক্ত হয়। যোগ দেন বিভিন্ন স্তরের মানুষ।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করতে এলিসি প্রাসাদে যান শিক্ষার্থীদের সংগঠন রেনুভো লিসেনের নেতা নাথানায়েল কোমবারি। ২৩ অক্টোবর ২০২৬

১৭ অক্টোবর প্যারিসে ১৯ বছরের লোলা রয়টার্সকে বলেন, জীবনযাত্রার খরচ ও জ্বালানির দাম বেশি। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করতে গিয়ে আহত হচ্ছেন। হলুদ জ্যাকেটের পাশে নতুন প্রজন্মের উপস্থিতির পেছনে এই মিলিত উদ্বেগ কাজ করছে।

তবে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও সহিংসতাকে আলাদা করে দেখতে হবে। রয়টার্স জানিয়েছে, ১৭ অক্টোবর বিপুল মানুষ শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন। পাশাপাশি সহিংস কিছু গোষ্ঠী ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পুলিশের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, চলছে তদন্ত।

১৭ অক্টোবর ভেরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লুদোস্কি বলেন, পুরোনো অংশগ্রহণকারী, ইতিমধ্যে কর্মজীবনে ঢোকা তরুণ ও শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে রাস্তায় নামতে পারেন। তাঁর মতে, মানুষ প্রতিবাদ সংগঠনের পদ্ধতি শিখেছে। তাই, হলুদ জ্যাকেটকে শুধু পোশাক হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজেদের জীবন নিয়ে কথা বলা এবং সেই কথা রাষ্ট্রকে শোনানোর চেষ্টা।

তথ্যসূত্র:

১. ল্য পারিসিয়াঁ, ২৯ নভেম্বর ২০১৮: লুদোস্কির অনলাইন আবেদনে ১০ লাখ স্বাক্ষর।

২. রয়টার্স, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০: করোনার বিরতির পর ইয়েলো ভেস্টের বিক্ষোভে ফেরা।

৩. মেত্রোপলিতিক, ১৪ অক্টোবর ২০১৯: গোলচত্বরে জমায়েত ও আন্দোলন টিকিয়ে রাখা নিয়ে গবেষণা।

৪. ভের, ১৭ অক্টোবর ২০২৬: প্রিসিলিয়া লুদোস্কির সাক্ষাৎকার-আন্দোলন সংগঠন ও নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ।

৫. ল্য পারিসিয়াঁ, ২৩ অক্টোবর ২০২৬: সমন্বয়কারী বেঞ্জামিন বলের পরিচয় ও ভূমিকা।

৬. এএফপি ফ্যাক্টচেক, ১৪ অক্টোবর ২০২৬: বিক্ষোভকারীদের হুমকি দিয়ে ছড়ানো ভুয়া বক্তব্যের যাচাই।