১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সাল পর্যন্ত ইউরোপে তাণ্ডব চালানো প্লেগের জন্য দায়ী ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়ার ওয়েসন স্টেইন
১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সাল পর্যন্ত ইউরোপে তাণ্ডব চালানো প্লেগের জন্য দায়ী ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়ার ওয়েসন স্টেইন

প্লেগ–রহস্য: রাশিয়ায় সত্যিই কি নতুন করে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে

বিশ্বজুড়ে মহামারি নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। এরই মধ্যে কি এবার প্লেগের সংক্রমণও ছড়িয়ে পড়ল?

এ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর, আমরা জানি না। আর একটু বিস্তারিত বললে রাশিয়ার সাইবেরিয়ার একটি প্লেগ গবেষণাগারের এক নারী কর্মী ‘রহস্যজনক নিউমোনিয়া’য় মারা গেছেন। গবেষণাগারটি পরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে রুশ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বেশি কিছু বলছে না। তাতেই নানা জল্পনা ও গুঞ্জন ছড়িয়েছে।

কে মারা গেছেন

রাশিয়ার ইরকুতস্কে অবস্থিত সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যবিষয়ক অ্যান্টিপ্লেগ ইনস্টিটিউটে ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন ২৮ বছর বয়সী দারিয়া শিপিলোভা। চলতি মাসের শুরুতে ওই রহস্যজনক নিউমোনিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওই নারী যে হাসপাতালে মারা যান, সেখানকার কর্মী ও রোগীদের কোয়ারেন্টিনে রেখেছে রাশিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে গবেষণাগারটির অন্য কর্মী ও দারিয়ার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।

প্লেগ কি এখনো আছে

হ্যাঁ। প্লেগ অনেক দীর্ঘ সময় ধরেই মানুষের সঙ্গে আছে। প্লেগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার নাম ইয়ারসিনিয়া পেসটিস। হাজার বছর ধরে এ ব্যাকটেরিয়া মানুষকে সংক্রমিত করে আসছে। এটি ইঁদুরজাতীয় প্রাণী ও মাছির মধ্যেও ছড়ায়। এসব প্রাণী ও কীটপতঙ্গের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যাকটেরিয়া টিকে আছে।

ওই নারী যে হাসপাতালে মারা যান, সেখানকার কর্মী ও রোগীদের কোয়ারেন্টিনে রেখেছে রাশিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে গবেষণাগারটির অন্যান্য কর্মী ও দারিয়ার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।

চতুর্দশ শতাব্দীতে প্লেগ মহামারিতে ইউরোপের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যান বলে ধারণা করা হয়। এরপর ইতিহাসে এটি ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিতি পায়।

এখনো প্রতিবছর কয়েক শ মানুষ প্লেগে আক্রান্ত হন। তাঁদের বেশির ভাগই মাদাগাস্কার ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বাসিন্দা। তবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশেও প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দেখা যায়।

প্লেগের সংক্রমণ কীভাবে

মানুষের শরীরে প্লেগের সংক্রমণ ঘটতে পারে মূলত তিনভাবে।

বিউবনিক প্লেগ। এর ফলে প্লেগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া লসিকাগ্রন্থিতে দ্রুত বংশবিস্তার করে। সাধারণত সংক্রমিত মাছি কামড়ানোর পর এ ধরনের সংক্রমণ ঘটে। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে এ প্লেগই মহামারি আকার ধারণ করে।

চতুর্দশ শতাব্দীতে প্লেগ মহামারিতে ইউরোপের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যান বলে ধারণা করা হয়। এরপর ইতিহাসে এটি ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিতি পায়।

ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে বলা হয় সেপ্টিসেমিক প্লেগ।

সবচেয়ে ভয়ংকর ধরন হলো নিউমোনিক প্লেগ। এতে ব্যাকটেরিয়া ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে এ রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিষয়টি কি উদ্বেগের

এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ এখনো খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন।

চিকিৎসা না করা হলে নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত ব্যক্তি কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যেতে পারেন। তবে তিন ধরনের প্লেগই অ্যান্টিবায়োটিকে ভালোভাবে সাড়া দেয়। আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা গেলে চিকিৎসা কার্যকর হয়।

তাহলে এত উদ্বেগ কেন

দারিয়া শিপিলোভা যে প্লেগ গবেষণাগারে কাজ করতেন, সেটিই উদ্বেগের বড় কারণ। এসব গবেষণাগার থেকে যাতে প্লেগের জীবাণু বাইরে ছড়াতে না পারে, সে জন্য এগুলোয় সাধারণত শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি–বিশেষজ্ঞ জেনিফার নুজ্জো নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘এ ঘটনার কিছু বিষয় ঠিক মেলানো যাচ্ছে না।’

জেনিফার বলেন, গবেষণাগারে কাজ করার সময় ওই নারী ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করে থাকলে ও জীবাণুর সংস্পর্শে আসার পর দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক পেয়ে থাকলে তাঁর প্রাণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়।

রুশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য না পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। কারণ, কোভিড-১৯ মহামারির স্মৃতি এখনো অনেকের মনে তাজা। ওই মহামারির ক্ষেত্রে ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল চীনের সরকার তথ্য গোপন করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুর পর রুশ কর্তৃপক্ষ খুব সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেয়। মৃত্যুর আগে ওই নারী কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানায়নি। গবেষণাগারে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছিল কি না, সে প্রশ্নেরও জবাব দেয়নি।

রুশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য না পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। কারণ, কোভিড-১৯ মহামারির স্মৃতি এখনো অনেকের মনে তাজা। ওই মহামারির ক্ষেত্রে ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল চীনের সরকার তথ্য গোপন করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ও মার্কিন সরকার এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পর রুশ কর্তৃপক্ষ আরও কিছু তথ্য দেয়।

গত বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, রাশিয়ার উচিত বিশ্বকে এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত তথ্য জানানো। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খুব নিবিড়ভাবে ও ঘণ্টায় ঘণ্টায় পর্যবেক্ষণ করছি।’

রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দারিয়া শিপিলোভাকে প্লেগের টিকা দেওয়া হয়েছিল। গবেষণাগারে কোনো জরুরি পরিস্থিতি শনাক্ত হয়নি।

তবে একটি বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। প্লেগের যে টিকা বর্তমানে পাওয়া যায়, তা কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।

রাশিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, ইরকুতস্ক শহর ও ইরকুতস্ক অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য ‘কোনো মহামারির ঝুঁকি নেই’।

প্লেগ কি কখনো জৈবিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়েছে

সম্ভবত। তবে সে ঘটনা অনেক পুরোনো। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, চতুর্দশ শতাব্দীতে মঙ্গোল বাহিনী ক্রিমিয়ার কাফা শহরে প্লেগে আক্রান্ত মানুষের মরদেহ ছুড়ে মেরেছিল।

এর ফলেই ইউরোপে ভয়াবহ ওই মহামারির সূচনা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও মহামারি–বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ মহামারি শস্যবাহী জাহাজে থাকা মাছি ও ইঁদুরের মাধ্যমেও শুরু হয়ে থাকতে পারে।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জৈবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে পালিয়ে আসা এক ব্যক্তি সম্প্রতি দাবি করেন, তৎকালীন সরকার বিপুল পরিমাণে গুটিবসন্ত ও প্লেগের জীবাণু মজুত করেছিল। এসব জীবাণু বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার করা যেত বলেও দাবি করেন। তবে সেটিও কয়েক দশক আগের ঘটনা।

তবে কি আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, না। অনেক বিষয়ই এখনো অজানা। তবে বিশেষজ্ঞরা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুর কারণ প্লেগ বলে নিশ্চিত হলেও ব্যাপকভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম বলেই মনে হচ্ছে।