মার্কিন নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ট্রাম্প রাজনৈতিক সংকটে পড়লে এ ধরনের কাজ করেন। তিনি আলোচনার বিষয় বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। নিজের ক্ষমতা নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের দমন করতে সরকারকে কাজে লাগান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর অনেক চেষ্টাই সফল হয়নি। এরপর তিনি পরিচিত এক প্রতিপক্ষকে নিশানা করেছেন। সেটি হলো সংবাদমাধ্যম।
জন এফ কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস ভবনের সামনে নিজের নাম বসাতে প্রচণ্ড চাপ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু আদালত তাঁর চেষ্টা আটকে দেন।
সুদের হার কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) ওপরও তিনি প্রচণ্ড চাপ দিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি অস্বাভাবিক সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নিজের পছন্দে নিয়োগ পাওয়া ফেড চেয়ারম্যানও তাঁর কথা রাখেননি। বরং অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনিও ঋণের খরচ বাড়ানোর পক্ষে ভোট দেন। সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মত ছিল।
ট্রাম্প কথার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তারপরও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে খুবই অজনপ্রিয়।
দেশটির মানুষ অর্থনীতি ও পেট্রলের চড়া দাম নিয়েও উদ্বিগ্ন রয়েছেন। এসব বিষয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত করতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তাঁর চেষ্টা আটকে দেন। ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া বিচারপতিরাও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ছিলেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে নভেম্বরে। ট্রাম্প বছরের পর বছর রিপাবলিকান পার্টির ওপর প্রভাব ধরে রেখেছেন। দেশের রাজনৈতিক আলোচনাও নিয়ন্ত্রণ করেছেন। কিন্তু এখন তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা কমছে বলে মনে হচ্ছে।
একের পর এক ধাক্কায় ট্রাম্পের হতাশা বাড়ছে। তিনি মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে নিতে চাইছেন। এ জন্য তিনি তাঁর পছন্দের পুরোনো প্রতিপক্ষ সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে নতুন করে আক্রমণ শুরু করেছেন।
ট্রাম্প মনে করেন, ভয় দেখিয়ে তিনি যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করাতে পারবেন। তিনি দেখেছেন, এই কৌশল তাঁর জন্য কাজ করেছে। পুরো রিপাবলিকান পার্টি তাঁর কাছে মাথা নত করেছে।সারাহ ম্যাথুস, হোয়াইট হাউসের সাবেক উপপ্রেস সচিব
শনিবার হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত ঘোষণা কার্যকর করেছে। সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞা সেই বিরোধকে আরও তীব্র করেছে।
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ট্রাম্প রাজনৈতিক সংকটে পড়লে এ ধরনের কাজ করেন। তিনি আলোচনার বিষয় বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। নিজের ক্ষমতা নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের দমন করতে সরকারকে কাজে লাগান।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমকে অপমান ও তুচ্ছ করে আসছেন। তাঁর সমালোচনা করে এমন সংবাদ বন্ধ করতে আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টাও করেছেন।এখন সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে ঢোকা নিষিদ্ধ করেছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের উপপ্রেস সচিব ছিলেন সারাহ ম্যাথুস। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প মনে করেন, ভয় দেখিয়ে তিনি যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করাতে পারবেন। তিনি দেখেছেন, এই কৌশল তাঁর জন্য কাজ করেছে। পুরো রিপাবলিকান পার্টি তাঁর কাছে মাথা নত করেছে।’
সারাহ ম্যাথুস আরও বলেন, ‘আদালত, ফেড এবং নিজের দলের মানুষের কাছ থেকেও তিনি বাধার মুখে পড়ছেন। তাই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে আক্রমণ করছেন।’
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমকে অপমান ও তুচ্ছ করে আসছেন। তাঁর সমালোচনা করে এমন সংবাদ বন্ধ করতে আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টাও করেছেন।
আবার হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্প তাঁর মতো চিন্তা করেন, এমন অনুগত লোকজন দিয়ে নিজেকে ঘিরে রেখেছেন। এখন তিনি শুধু কড়া বক্তব্য বা মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর প্রশাসন আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
সরকারি টেলিভিশন ও বেতারের অর্থায়ন বন্ধ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন তার দীর্ঘদিনের স্বাধীন সংবাদপত্র ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর সম্পাদক ও প্রকাশককে চাকরিচ্যুত করেছে।
একটি দেশ ইচ্ছা করে নেতিবাচক সংবাদ লেখার সুযোগ মানুষকে কীভাবে দিতে পারে? তাতে নিশ্চয়ই সমস্যা আছে।ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট
সংবাদপত্রটির সাংবাদিকেরা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো নৌবাহিনীর একটি বিমানবাহী রণতরির অবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা লিখেছিলেন। এ কারণেই প্রশাসন তাঁদের সরিয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্প এমন সম্প্রচারমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল করতে সরকারকে চাপ দিয়েছেন, যারা তাঁকে নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ বা মন্তব্য প্রচার করে।
ট্রাম্প উদারপন্থী সংগঠনগুলোর করসুবিধার মর্যাদা বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছেন। অনলাইনে মানুষের বক্তব্য নজরদারির চেষ্টা করেছেন। যাঁরা তাঁর অপছন্দের মত প্রকাশ করেন, তাঁদের ভিসা না দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট গত শুক্রবার নিজেই তিন সংবাদমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা এতে অবাক হন। তখন তাঁর চিফ অব স্টাফও শহরের বাইরে ছিলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওই তিন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ তাঁর পছন্দ নয়। সে কারণেই তিনি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর ইচ্ছা মেনে নিলে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো তারা আরও ভালো হতে পারে। আমরা তাদের ভেতরে ঢুকতে দিতে চাই।’ তাঁর এই বক্তব্যকে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি একধরনের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি বলে মনে হয়েছে। এর অর্থ হলো, ট্রাম্পকে নিয়ে ভালো সংবাদ প্রকাশ করলে তিনি তাঁদের হোয়াইট হাউসে ঢুকতে দেবেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘একটি দেশ ইচ্ছা করে নেতিবাচক সংবাদ লেখার সুযোগ মানুষকে কীভাবে দিতে পারে? তাতে নিশ্চয়ই সমস্যা আছে। এখন তারা যদি এসব লিখতে চায়, লিখতে পারে। কিন্তু আমার বাড়িতে-জনগণের বাড়িতে-তাদের ঢুকতে দিতে আমি বাধ্য নই।’
মানুষ সত্য জানুক, এটি ডোনাল্ড ট্রাম্প চান না। কারণ, সত্য তাঁর পক্ষে নয়। পেট্রলের চড়া দাম তাঁর পক্ষে নয়। এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিও তাঁর পক্ষে নয়। দুর্বল হতে থাকা অর্থনীতিও তাঁর পক্ষে নয়।ডেরিক জনসন, নাগরিক অধিকার সংগঠন এনএএসিপির সভাপতি
তবে সংবিধানবিশেষজ্ঞ ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো ভিন্ন কথা বলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টতই অসাংবিধানিক। কারণ, সংবাদ প্রকাশের বিষয়বস্তুর জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পুরোনো নাগরিক অধিকার সংগঠন ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপলের (এনএএসিপি) সভাপতি ডেরিক জনসন বলেছেন, ট্রাম্প মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে নেওয়ারও চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ সত্য জানুক, এটি ডোনাল্ড ট্রাম্প চান না। কারণ, সত্য তাঁর পক্ষে নয়। পেট্রলের চড়া দাম তাঁর পক্ষে নয়। এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিও তাঁর পক্ষে নয়। দুর্বল হতে থাকা অর্থনীতিও তাঁর পক্ষে নয়।’
জনসন আরও বলেন, ‘ট্রাম্পের পক্ষে শুধু একটি বিষয়ই রয়েছে, সেটি হলো, মানুষ তাঁর মিথ্যা কথা বিশ্বাস করবে। আর তিনি আলোচনার বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই কেবল সেটি সম্ভব।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে তারা সাড়া দেয়নি।
ভিন্নমত ও সংবাদমাধ্যম দমনে ট্রাম্পের চেষ্টা ভোটারদের উদ্বেগ কমাতে পারেনি। নভেম্বরের নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের আশঙ্কায় থাকা রিপাবলিকানদের উদ্বেগও কমেনি।
জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারদের বেশির ভাগ মনে করেন, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর প্রতি ট্রাম্প যথেষ্ট মনোযোগ দেননি।
ডগলাস হাই রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির সাবেক যোগাযোগ পরিচালক। তিনি বলেন, ট্রাম্পের রাগ কীভাবে আক্রমণাত্মক আচরণে রূপ নিচ্ছে, তা আরও বেশি মার্কিন নাগরিক বুঝতে পারছেন।
কেনেডি সেন্টারের বাইরের অংশে ট্রাম্পের নাম বসানোর চেষ্টা আটকে দিয়েছিলেন একজন কেন্দ্রীয় বিচারক। এরপর ভবনটির জন্য পরিকল্পিত ২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সংস্কারকাজ বাতিলের হুমকি দেন ট্রাম্প।
পরে এয়ার ফোর্স ওয়ানের জানালা দিয়ে তোলা ছবিতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘কেনেডি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’ শিরোনামের একটি পোস্টার পর্যালোচনা করছেন। এতে নতুন জল্পনা তৈরি হয়। নিজের নামের ছাপ রাখতে না পারলে ট্রাম্প প্রতিষ্ঠানটিই ধ্বংস করে দিতে পারেন কি না, সেই প্রশ্ন ওঠে।
ডগলাস হাই বলেন, রিপাবলিকানদের অনেকেই চান, ট্রাম্প তাঁদের সমর্থকদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ দূর করার নীতিতে আরও বেশি মনোযোগ দিন।
ডগলাস হাই বলেন, ‘সংবাদের আলোচনার বিষয় দখল করতে ট্রাম্প অবশ্যই আক্রমণাত্মক কৌশল ব্যবহার করেন। আমার মতে, এসব কৌশল প্রায়ই তাঁর কোনো উপকার করে না।’
ডগলাস হাই আরও বলেন, ‘নির্বাচনের আর ৪৫ দিন বাকি। এই সপ্তাহে এবং আগামী সপ্তাহের শুরুতে আমরা কী নিয়ে কথা বলছি? দাম কমাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে কোনো কথাই হচ্ছে না।’