ফ্লোরেন্স ডুগডেলের ‘গালিভারস ট্রাভেলস টোল্ড ইন সিম্পল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (১৯১২) গ্রন্থে গালিভারের দুই পায়ের নিচ দিয়ে যাচ্ছে লিলিপুট সেনাবাহিনী
ফ্লোরেন্স ডুগডেলের ‘গালিভারস ট্রাভেলস টোল্ড ইন সিম্পল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (১৯১২) গ্রন্থে গালিভারের দুই পায়ের নিচ দিয়ে যাচ্ছে লিলিপুট সেনাবাহিনী

গালিভারস ট্রাভেলসের ৩০০ বছর, বইটি আজও কেন প্রাসঙ্গিক

লিলিপুটের খুদে মানুষ আর ব্রবডিংনাগের দৈত্যদের দেশে গালিভারের অভিযান আজও পাঠককে টানে। জোনাথন সুইফটের বিখ্যাত ব্যঙ্গ রচনা ‘গালিভারস ট্রাভেলস’ প্রকাশের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়ারল্যান্ডে চলছে নানা আয়োজন। প্রদর্শনী, আলোচনা, সংগীত ও শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে নতুন করে ফিরে দেখা হচ্ছে বইটি। শিশুদের কাছে রূপকথার রাজত্ব হিসেবে জনপ্রিয় হলেও প্রবীণ পাঠকদের জন্য বইটি মানব চরিত্রের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ।

গতকাল বুধবার আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের সেন্ট প্যাট্রিকস ক্যাথেড্রালে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই গির্জায় একসময় প্রধান যাজকের দায়িত্ব পালন করেন সুইফট। সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে।

১৭২৬ সালের ২৮ অক্টোবর ‘গালিভারস ট্রাভেলস’ বইটি প্রকাশিত হয়। এর আগে ওই বছরের মার্চে সুইফট লন্ডনে গিয়ে রাতের আঁধারে একজন বাহকের মাধ্যমে প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। প্রথম প্রকাশেই বইটি সাড়া ফেলে। আর্মা রবিনসন গ্রন্থাগারের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম সংস্করণ এক সপ্তাহের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়। দুই মাসের মধ্যে ছাপা হয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংস্করণ।

আয়ারল্যান্ডে লেখা বইটি লন্ডনে প্রকাশিত হয়েছিল লেখকের নাম ছাড়াই। এমনকি প্রকাশক বেঞ্জামিন মোটও প্রথমে লেখকের আসল পরিচয় জানতেন না। তবে আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের সাহিত্যপ্রেমীরা দ্রুতই ধরে ফেলেছিলেন কে এই ক্ষুরধার লেখনীর কারিগর। পরে নানা ভাষায় অনুবাদ, চলচ্চিত্র ও শিশুদের উপযোগী সংস্করণের মাধ্যমে এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

১৭২৭ সালের একটি ফরাসি খোদাইচিত্রে গালিভারকে লিলিপুটিয়ানদের বেঁধে রাখার দৃশ্য

প্রদর্শনী

আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের পুরোনো গ্রন্থাগারের লং রুমে চলছে ‘গালিভার অ্যাট ৩০০’ প্রদর্শনী। ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত এটি চলবে। অনলাইনেও প্রদর্শনী দেখা যাবে। সুইফট একসময় এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।

প্রদর্শনীতে রয়েছে বইটির পুরোনো সংস্করণ, কমিকস এবং পাতা খুললে ছবি উঠে আসে এমন বই। বিশেষ আকর্ষণ ১৭৬১ সালে ডাবলিনে ছাপা একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। এর আর কোনো কপি টিকে থাকার তথ্য জানা নেই। আয়োজকেরা গালিভারের সব অভিযানের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করাতে চান।

ট্রিনিটি কলেজের প্রদর্শনীর অন্যতম সহসংরক্ষক ও সহকারী গ্রন্থগারিক স্টেফানি ব্রিন বলেন, ‘লেমুয়েল গালিভারের লিলিপুটের দেশে প্রথম অভিযানের সঙ্গেই আজকের পাঠকেরা সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তবে এই প্রদর্শনী দর্শকদের গালিভারের সফর করা সব কটি রাজ্যে ঘুরিয়ে আনবে। যার মধ্যে রয়েছে লিলিপুট, ব্রোবডিংনাগ, লাপুটা ও এর বাইরের ভূমি হুয়িনহমদের দেশ।’

উত্তর আয়ারল্যান্ডের আর্মা রবিনসন গ্রন্থাগারেও চলছে আলাদা প্রদর্শনী। সেখানে সংরক্ষিত আছে প্রথম সংস্করণের একটি বিশেষ কপি। বইটি সুইফটের নিজের ছিল। এর পাতায় লেখকের হাতে লেখা টিকাও রয়েছে। প্রদর্শনী চলবে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

ওই প্রদর্শনীতে অষ্টাদশ শতকের সমাজ, রাজনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও মানবস্বভাব নিয়ে বইটির বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে। আলোচনায় এসেছে সে সময় বই প্রকাশের জটিলতাও। সুইফটের লেখার পদ্ধতি কীভাবে প্রকাশনা ও পাঠকের কাছে বইটির পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছিল, সেটিও দেখানো হচ্ছে।

জোনাথন সুইফটের ১৭২৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাস (গালিভারস ট্রাভেলস), যা শুরুতে ‘ট্রাভেলস ইনটু সেভারেল রিমোট নেশনস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে পরিচিত ছিল

বইটি এখনো প্রাসঙ্গিক

ট্রিনিটি কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রদর্শনীর সহ–কিউরেটর আইলিন ডগলাসের মতে, বইটি প্রথম যুগের পাঠকদের টেনেছিল ক্ষমতাবান রাজনীতিক ও ক্ষমতার কারসাজি নিয়ে সুইফটের ব্যঙ্গের কারণে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে নিজের কাজের জায়গা হারানোর আশঙ্কায় থাকা পাঠকদের কাছেও বইটি প্রাসঙ্গিক। মানুষের যুক্তিবোধ ও অগ্রগতি নিয়ে অহংকারকে প্রশ্ন করেছেন সুইফট।

বইয়ের তৃতীয় পর্বে লাগাডোর বিদ্যাপীঠে গিয়ে অদ্ভুত সব গবেষণা দেখেন গালিভার। কেউ শসা থেকে সূর্যের আলো বের করতে চায়। আবার এক অধ্যাপকের দাবি, তাঁর যন্ত্র দিয়ে মেধা বা পড়াশোনার সাহায্য ছাড়াই দর্শন, কবিতা ও গণিতের বই লেখা সম্ভব। আইলিনের মতে, শিল্প ও বিজ্ঞানের প্রতি উৎসর্গ করা ভাসমান দ্বীপ লাপুটায় গালিভারের ওই অভিজ্ঞতা প্রযুক্তিকেন্দ্রিক আধুনিক যুগের আশঙ্কার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।

লিলিপুটের কাহিনিতেও রয়েছে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। ডিমের কোন দিক ভাঙতে হবে, সেই বিরোধ গড়ায় বিদ্রোহ ও যুদ্ধে। এমন তুচ্ছ মতভেদকে ঘিরে ক্ষমতার লড়াইয়ের ছবি এঁকেছেন সুইফট।

আরও যত আয়োজন

অনুষ্ঠানে প্রথমবার পরিবেশিত হওয়ার কথা সুরকার শন ডোহার্টির নতুন রচনা ‘দ্য ম্যান মাউন্টেন’। বইটির ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষেই এটি তৈরি করা হয়েছে। ডাবলিনের বিভিন্ন এলাকার শিশুদের নিয়ে গঠিত দল এটি পরিবেশন করবে। সুইফট–বিশেষজ্ঞ ‘ব্রেন্ডন টুমি’ বই থেকে নির্বাচিত অংশ পড়ে শোনাবেন। থাকবে অর্গানবাদনও। সাহিত্য ও সংগীত মিলিয়ে গালিভারের কল্পজগৎকে তুলে ধরার পরিকল্পনা করেছেন আয়োজকেরা।

উদ্‌যাপনে যুক্ত হয়েছে শিশু-কিশোরদের আঁকা ছবিও। আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। নির্বাচিত ছবিগুলো ২৮ অক্টোবর থেকে সেন্ট প্যাট্রিকস ক্যাথেড্রালের টাওয়ারে আলোর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার কথা। গালিভার, লিলিপুটের মানুষ কিংবা দৈত্যদের কল্পজগৎ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ছবি আঁকার আহ্বান জানানো হয়।

জোনাথন সুইফট ১৬৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর ডাবলিনে জন্ম নেন। ৭৭ বছর বয়সে ১৭৪৫ সালের ১৯ অক্টোবর ডাবলিনেই মারা যান। তিনি বেশ কিছু তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করে গেছেন। এর মধ্যে অন্যতম ‘আ মডেস্ট প্রপোজাল’। ব্যঙ্গত্মক এই প্রবন্ধে তিনি আইরিশ দরিদ্রদের কষ্ট কমানোর উপায় হিসেবে তাঁদের সন্তানদের ধনী লোকদের কাছে খাবার হিসেবে বিক্রি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।