জনগণনা শেষ হয়েছে চার বছর আগে ২০১১ সালে, বিহারের ভোট বড় জোর মাস তিনেক দূরে। ঠিক এই সময় ধর্মের ভিত্তিতে জনগণনার প্রতিবেদন পেশ হওয়ার পেছনে তা হলে কি বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে? ভারতে রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠে পড়েছে।
প্রশ্ন ওঠার কারণ, ২০০১ থেকে ২০১১ সাল, এই দশ বছরে ভারতে হিন্দুদের মোট জনসংখ্যা যেখানে ০.৭ শতাংশ কমেছে, সেখানে মুসলমানদের জনসংখ্যা ০.৮ শতাংশ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী যে রাজ্য গুলিতে মুসলমান জনসংখ্যা যথেষ্ট বেড়েছে, সেগুলির মধ্যে রয়েছে বিহার, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ।
এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ সালে ভারতের মোট জনসংখ্যা ১২১.০৯ কোটি। এর মধ্যে হিন্দু ৯৬ কোটি ৬৩ লাখ, মুসলমান ১৭ কোটি ২২ লাখ। অবশ্য, প্রতিবেদন অনুযায়ী আগের দুই বারের তুলনায় এই জনগণনায় হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়েরই বৃদ্ধির হার কমেছে। মুসলমানদের আগের দু দশকের হার ছিল যথাক্রমে ৩২.৮৮ ও ২৯.৫২ শতাংশ। ২০১১ তে তা আরও কমে হয়েছে ২৪.৬ শতাংশ। তুলনায় হিন্দুদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ২২.৭১ ও ১৯.৯২ শতাংশ। এবার তা আরও কমে হয়েছে ১৬.৭৬ শতাংশ।
প্রতিবেদন পেশের সঙ্গে রাজনীতির যোগ থাকার অভিযোগ তুলেছে বাম দলগুলি, জনতা দল (সংযুক্ত) এবং কংগ্রেস। বিহারের ভোটে লড়াই যেখানে তুল্যমূল্য, সেখানে মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিকে সামনে রেখে বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরণ করতে চাইছে বলে এই দলগুলির অভিযোগ। জেডিইউ নেতা শরদ যাদব ও কে সি ত্যাগী সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, চার বছর আগে জনগনণা শেষ হয়েছে। তা হলে কেন আজ হঠাৎ ধর্মের ভিত্তিতে দেশের জনসংখ্যার ফল ঘোষিত হলো? তা ছাড়া তাই যদি হলো, তা হলে জাতভিত্তিক প্রতিবেদন কেন এখনো পেশ করা হলো না? কে সি ত্যাগীর অভিযোগ, বিজেপি বিহার জিততে এতই মরিয়া যে মুসলমান বেড়ে চলার ধুয়ো তুলে তারা বিহারে মেরুকরণ করতে চাইছে। দিল্লির জামা মসজিদের শাহি ইমাম সৈয়দ আহমেদ বুখারিও বিরোধীদের সুরে সুর মিলিয়ে বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিহারের সীমাঞ্চল বলে পরিচিত চার জেলা কিষেণগঞ্জ, কাটিহার, আরারিয়া ও পূর্ণিয়ায় মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনায় অনেক বেশি। কিষেণগঞ্জে মুসলমান জনসংখ্যা ৬৮ শতাংশ, কাটিহারে ৪৪, আরারিয়ায় ৪৩ ও পূর্ণিয়ায় ৩৮ শতাংশ। এই কারণেই মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (মিম) দলের নেতা আসাউদ্দিন ওয়াইসি এই সীমাঞ্চলের ওপরেই বিশেষ নজর দিয়েছেন। অভিযোগ, বিজেপি আসাউদ্দিন ওয়াইসিকে যথেষ্ট উৎসাহিত করছে। কারণ, সীমাঞ্চলে বিজেপির উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। রাজ্যের শাসক জোটের এই ঘাঁটিতে মিম থাবা বসালে বিজেপিরই লাভ।
এই প্রতিবেদনে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতির সহায়ক বলেও মনে করা হচ্ছে। বিহারের পরেই বিজেপি আসাম জিততে মরিয়া। আসাম কংগ্রেসের একদা দুই নম্বর নেতা ও রাজ্যের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা কংগ্রেস ছেড়ে দিয়েছেন। দু-এক দিনের মধ্যেই তিনি বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। সারা দেশের মধ্যে আসামে মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি, ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০১ সালে রাজ্যের জনসংখ্যার ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল মুসলমান। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ। আসামের রাজনীতিতে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বরাবরই একটা স্পর্শকাতর বিষয়। বিজেপি এই স্পর্শকাতরতাকে হাতিয়ার করে ২০১৬ সালের ভোটে রাজ্য দখলে মরিয়া। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পেশ করা ধর্মভিত্তিক এই জনগণনা প্রতিবেদন এই রাজ্যে তাদের হাতিয়ার।
পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি এই রিপোর্টকে হাতিয়ার করতে চাইছে। রাজ্যের মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি বেশি। ২০০১ সালে রাজ্যে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ২৫ দশমিক ২ শতাংশ। দশ বছর পরে ২০১১ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। বিজেপি রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা অনুপ্রবেশ ও সরকারের মুসলিম তোষণ নীতিকে এ জন্য দায়ী করেছেন। জবাবে রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, বিজেপি রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাইছে। রাজ্যবাসী তা হতে দেবে না।
২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী
হিন্দু ৯৬.৬৩ কোটি (৭৯.৮০ শতাংশ)
মুসলিম ১৭.২২ কোটি (১৪.২ শতাংশ)
খ্রিষ্টান ২.৭৮ কোটি (২.৩ শতাংশ)
শিখ ২.০৮ কোটি (১.৭ শতাংশ)
বৌদ্ধ ৮৪ লাখ (০.৭ শতাংশ)
জৈন ৪৫ লাখ (০.৪ শতাংশ)।