ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে চরম অস্থির সময়ের মুখোমুখি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয় দলটির। এরপর ভাঙনের মুখে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন এই দল। ভেঙে দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের পশ্চিমবঙ্গ ও সব শাখা কমিটি। অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার দলে নেতৃত্ব নিয়েও।
গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ৮০টি আসন পায়। দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় বিধানসভায় যাওয়ার সুযোগ হারান। বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মনোনয়ন দেন তিনি।
কিন্তু মমতার এই সিদ্ধান্তে তৃণমূলের বিধানসভার সদস্যদের (এমএলএ) বড় অংশ বিদ্রোহ করে বসে। দল থেকে বহিষ্কৃত এমএলএ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বড়সংখ্যক এমএলএকে নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। তাঁরা ইতিমধ্যে বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন যে তাঁদের সঙ্গে তৃণমূলের ৮০ জনের মধ্যে ৫৮ জন এমএলএ আছেন। ফলে তাঁরাই ‘আসল তৃণমূল’।
আজ বুধবার তৃণমূলের ৫৮ জন এমএলএ পৃথক বা নতুন তৃণমূল কংগ্রেসের ঘোষণা দেন। এই অংশের দাবি, তাঁরাই হবেন ভবিষ্যতের বিরোধী দল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল কংগ্রেস নয়।
জানা গেছে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দেখতে চাইছে তৃণমূলের নতুন অংশ। একসময় সিপিআইএম এবং পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবারের বিধানসভা নির্বাচনে জিতেছেন।
অবশ্য নতুন তৃণমূল যে চিঠি বিধানসভার অধ্যক্ষকে দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট জানিয়েছে যে এই দলেরও নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এমনটাই জানিয়েছে। এই নাটকীয়তার কারণে নতুন তৃণমূলের সঙ্গে ৫৮ জন এমএলএ রয়েছেন নাকি আরও কম রয়েছেন, তা এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না।
বিধানসভার অধ্যক্ষ এ বিষয়ে এখনো মুখ খোলেননি। নতুন তৃণমূল বিধানসভার অধ্যক্ষের স্বীকৃতি পাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আর পেলেও এই নতুন দলের কতজনকে নতুন তৃণমূলের সদস্য এবং কতজনকে পুরোনো তৃণমূলের সদস্য হিসেবে বিধানসভার অধ্যক্ষ স্বীকৃতি দেবেন, সেটাও স্পষ্ট নয়। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসু বিকেল পর্যন্ত সময় নিয়েছেন। নতুন তৃণমূল চারজনকে বিরোধীদলীয় নেতার ডেপুটি বা উপনেতা হিসেবে প্রস্তাব করেছে। বিধানসভা আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব অনুমোদন করবে কি না, সেটাও দেখার বিষয়।
এদিকে মমতার সঙ্গে এখন পর্যন্ত যেসব নেতা-নেত্রী রয়েছেন, তাঁদের অন্যতম কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং দলের অন্যতম মুখপাত্র কুনাল ঘোষ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দপ্তরে গেছেন তাঁর ডাকা বৈঠকে যোগ দিতে। এই বৈঠকের ওপরও নজর রয়েছে সবার।
বিধানসভা ঘিরে এই অস্থিরতার মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস আজ পশ্চিমবঙ্গে দলটির সব শাখা, সংগঠন এবং উপসংগঠন ভেঙে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়েছে, ‘গভীরভাবে পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গের সব কমিটি এবং এর সব শাখা সংগঠন অবিলম্বে ভেঙে দেওয়া হলো।’
এই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের এই মুহূর্তে কোনো পদাধিকারী নেই। কারণ, সংগঠনের কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কেন তৃণমূল এই কাজ করেছে, তার নানা ব্যাখ্যা থাকলেও মমতা কিংবা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দিষ্টভাবে কিছুই জানাননি।
কমিটি ভেঙে দেওয়ার মানে হলো মাঠপর্যায়ে তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক কোনো সংগঠন রইল না। ফলে বিধানসভা ও দলীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে ঠিক কী অপেক্ষা করছে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।