ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রতি তরুণদের কেন এত ক্ষোভ

ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) প্রতিবাদ–বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। ২৩ জুলাই ২০২৬, নয়াদিল্লি
ছবি: এএনআই

নৈতিক সাহসের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া এক অসাধারণ অনুভূতি। আর এর সঙ্গে যে আবেগ যুক্ত থাকে, তা প্রায়শই এক অদম্য ক্ষোভ। ভারতের তরুণ সমাজ আজ রাজপথে, তাঁরা নির্বাচিত একটি সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহি দাবি করছেন।

তবে এই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে যে বিষয়টি, সেটি হচ্ছে—ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বড় একটি অংশের প্রতি তরুণদের তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণা ও অবজ্ঞা। কিছু সংবাদমাধ্যমের চাটুকারিতাকে ব্যঙ্গ করে তৈরি স্ল্যাম পোয়েট্রি (আবৃত্তি) থেকে শুরু করে এমন সব পোস্টার তরুণদের বিক্ষোভে শোভা যাচ্ছে—যেখানে ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে অনেক সাংবাদিকের তথাকথিত ‘ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক নিয়ে রসিকতা করা হচ্ছে।

ভারতের চলমান ছাত্র আন্দোলন অতীতের অন্যান্য বিক্ষোভের চেয়ে স্পষ্টত আলাদা। কারণ, এখানকার তরুণ শিক্ষার্থীরা মোদি সরকার এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের মধ্যকার অশুভ আঁতাতের দিকে সরাসরি আঙুল তুলছেন।

এবার তরুণদের আন্দোলনে যন্তর মন্তরসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের প্রতি শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ লক্ষ করা গেছে। তারা ওইসব সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের উদ্দেশ করে নানা স্লোগান দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কটাক্ষ করেছেন। এমনকি কোনো কোনো জায়গা তাঁদেরকে বিক্ষোভস্থল থেকে সরিয়ে দিয়েছেন তরুণেরা।

মূলধারার বা ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম বলতে সাধারণত প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র ও টিভি নিউজ চ্যানেলগুলোকে বোঝায়। ভারতে এমন সংবাদমাধ্যম প্রচুর রয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৯০০টি বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারে রয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকই সংবাদ পরিবেশন করে থাকে।

‘গোদি মিডিয়া’ বৈশ্বিক শব্দকোষে জায়গা করে নিচ্ছে

সত্যি বলতে, ভারতের তরুণ সমাজের ক্ষোভের বড় অংশটিই টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলগুলোর ওপর গিয়ে পড়েছে। ‘গোদি’ বা ‘লেজ গুটিয়ে থাকা পোষা মিডিয়া’ শব্দটি এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই লড়াইয়ের নেতৃত্বে রয়েছে এমন এক প্রজন্ম, যাদের টিভি নিউজ দেখার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই, আবার নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাসও নেই।

বর্তমানে ভারতে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের অর্ধেকের বেশি বলছেন, সংবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই তাঁদের প্রধান উৎস। তাহলে, গত ১২ বছরের প্রতিবেদন ও টেলিভিশন খবরের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে কেন তাঁরা এত সোচ্চার?

এর একটি উত্তর হতে পারে, বেশির ভাগ তরুণই মূলত ‘সোশ্যাল ফার্স্ট’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর। খবর জানা, খবর নিয়ে আলোচনা করা বা এতে আগ্রহ তৈরি হওয়া—এসবই ঘটছে ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের মতো তৃতীয় পক্ষের প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে। আগের প্রজন্মের মতো টেলিভিশনের প্রতি তাঁদের কোনো টান নেই কিংবা টিভির সংবাদ উপস্থাপকদের (অ্যাঙ্কর) প্রতিও কোনো অন্ধ ভক্তি নেই।

অথচ ভারতে দীর্ঘ দিন ধরে এই সংবাদ পাঠকেরা সুপারস্টারের মর্যাদা ভোগ করেছেন; মাঠে রিপোর্ট করার সময় লোকজন তাঁদের চারপাশে ভিড় জমাত, একই টিভি সাংবাদিকদের সঙ্গে সেলফি তুলতে বা অটোগ্রাফ নিতে লাইন ধরে দাঁড়াত। কিন্তু তরুণ দর্শকরা সামাজিক মাধ্যমমুখী, তারা খবর পরিবেশনে সততা এবং জবাবদিহি দাবি করে।

সাংবাদিকতার মুখোমুখি হওয়া ও মেনে নেওয়ার মতো অন্য জটিল কারণটি হলো—জনগণ ও সাংবাদিকতার মধ্যকার চুক্তি বা বিশ্বস্ততার ভাঙন। তরুণেরা কেবল তাঁদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো—যেমন বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক কল্যাণমূলক ব্যবস্থার অভাবের মতো সংবাদ পুরোপুরি চেপে যেতেই দেখেনি; বরং বছরের পর বছর ধরে যেসব নিউজ চ্যানেলের কাজ ছিল জনগণের দাবি তুলে ধরা, তারা উল্টো জনগণের সেই চাওয়া-পাওয়াকে পদ্ধতিগতভাবে বিতর্কিত বা ছোট করেছে।

অনেক টেলিভিশন চ্যানেল তাদের বুলেটিনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বলেছিল—কোনো করোনা–সংকট ছিল না, শিক্ষার কোনো জরুরি সংকট ছিল না। অথচ অধিকাংশ শিশু যে অনলাইন শিক্ষার নাগালই পায়নি সেটার স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রায় দুই বছর ভারতের বেশির ভাগ স্কুল বন্ধ ছিল।

এখন আবার এসব টিভি চ্যানেল বলতে শুরু করেছে, দেশে কোনো চাকরির সংকটও নাকি নেই। অথচ তরুণ শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থা আর জালিয়াতিতে ভরা পরীক্ষাপদ্ধতি পেরিয়ে শেষমেশ চাকরির বাজারে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন।

সংবাদমাধ্যমকে, বিশেষ করে ভারতের টিভি চ্যানেলগুলোকে সততার সঙ্গে জবাব দিতে হবে, গত এক দশকে এসব মূল সমস্যার খবরের পেছনে তারা কতটা সময় বরাদ্দ রেখেছিল। তাই ভারতে সব বয়সের মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি যে প্রায়শই খবর দেখা এড়িয়ে চলেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এক তরুণ ভারতীয় প্রশ্ন তুলতেই পারেন, ‘আজকের খবর আমার জীবন আর আমার চাহিদার কথা কী বলছে? সত্যি বলতে, কী-ই বা বলছে?’

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বহু তরুণের জন্য এক উর্বর ও পরিচিত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বর্তমান আন্দোলনে শক্তিশালী ভিডিও, মিম এবং আরও নানা কনটেন্ট রাজপথে নেমে আসা তরুণ আন্দোলনকারীদের ক্ষোভকে সংক্ষেপে তুলে ধরছে এবং বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এর নিজস্ব ভাষা তরুণদের মজ্জাগত। তারা এর সঙ্গেই বড় হয়েছে এবং কীভাবে এটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা তাঁদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ ঘিরে যন্তর মন্তরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ২৩ জুলাই ২০২৬, নয়াদিল্লি

গত এক দশকের প্রতিবেদনগুলোতে কি কোনো নিরপেক্ষতা ছিল

এখন অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিক তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুনয় জানিয়ে বলছেন, রাজনীতিকে আলাদা রাখুন। কিন্তু ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাছে সেই একই প্রশ্ন ফিরিয়ে দেওয়ার পূর্ণ অধিকার ভারতের তরুণদের রয়েছে। গত এক দশকের প্রতিবেদনে কি এমন কোনো নিরপেক্ষতা ছিল, যা কোনো এক পক্ষের দালালি না করার পরীক্ষায় টিকে থাকতে পারে?

ভারতের পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উদ্বেগ অনুভব করছে, তা তুলে ধরার বা তা প্রকাশের কোনো চেষ্টা কি করা হয়েছিল? আসলে কার কাছে সাংবাদিকতার জবাবদিহি করা উচিত, আর সাধারণ মানুষের জন্য সেই জবাবদিহি চাওয়ার সুযোগটাই বা কোথায়?

২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভারতজুড়ে ৮০৫ বার সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। যা এখন পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট বন্ধের রেকর্ড। ২০২৫ সালেও ভারতে ৬৫ বার ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে; যা এখনো বিশ্বের শীর্ষ ইন্টারনেট বন্ধকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। যদি কোনো ভিন্নমত বা সমালোচনা দেখা যায়, তবে এই ইন্টারনেট বন্ধের সংখ্যা থেকেই তা পরিষ্কার—টিভি নিউজ চ্যানেলে নয়, বরং দ্রুত প্রবাহিত, নিত্য পরিবর্তনশীল ইন্টারনেটে মানুষের চোখ ছিল।

তরুণ শিক্ষার্থী ও ক্ষমতাসীন সরকারের মধ্যকার এই সংঘর্ষ হয়তো চলতে পারে, আরও তীব্র হতে পারে কিংবা মিটেও যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসের ফাটল ধরেছে গণমাধ্যমের সেই অংশটির সঙ্গে, যাঁদের হাতে রাজপথে নামা ওই তরুণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা, সুযোগ ও নিরপেক্ষ খবর প্রচারের প্ল্যাটফর্ম রয়েছে।

জনগণ ও সাংবাদিকতার মধ্যকার এই ভাঙা চুক্তি জোড়া লাগাতে ভারতীয় সাংবাদিকতা এখন কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ভারতের সংবাদব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। ভারতের গণমাধ্যম শেষ পর্যন্ত কী বেছে নেবে, আর এই তরুণ প্রজন্মের দর্শকেরাই বা কাকে বেছে নেবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।