পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও নেতাদের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের ছবি শোভা পাচ্ছে
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও নেতাদের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের ছবি শোভা পাচ্ছে

পশ্চিমবঙ্গে পূজামণ্ডপে ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারীর ছবি, চলছে বিতর্ক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহিষাদলে সম্প্রতি একটি পূজামণ্ডপে স্বাধীনতাসংগ্রামীদের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের ছবি প্রদর্শনকে ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

মহিষাদলের মাইকো ক্লাবের পক্ষ থেকে এই দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছিল। এ বছর ক্লাবের ৫০তম বর্ষে দুর্গাপূজার থিম ছিল ‘প্রতিচ্ছবি’। সেই কারণে পূজামণ্ডপে বিশিষ্ট মনীষী ও দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের ছবি প্রদর্শিত হয়েছিল।

ক্লাব আয়োজিত সেই প্রদর্শনীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ভগৎ সিং, ক্ষুদিরামের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তি ও নেতাদের পাশাপাশি গডসের ছবিও প্রদর্শন করা হয়েছে। শুধু তা–ই নয়, মণ্ডপে একই সারিতে গান্ধী ও তাঁর হত্যাকারী গডসের ছবি রাখা হয়েছিল।

১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধীকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া নাথুরাম গডসের ছবি কীভাবে তাঁর সঙ্গে একই জায়গায় ঠাঁই পেল, তা নিয়ে দর্শনার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই সর্বস্তরে আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়েছে।

নাথুরাম বিনায়ক গডসের সঙ্গে বিজেপির মতাদর্শগত অভিভাবক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং অন্যান্য কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সম্পর্ক নিয়ে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। আরএসএস সব সময় দাবি করে আসছে, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার সময় গডসের সঙ্গে তাদের কোনো সাংগঠনিক যোগাযোগ ছিল না।

সংঘের দাবি, ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে তরুণ বয়সে তিনি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীকালে তা ছেড়ে হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন।

তবে গডসের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং বেশ কিছু নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক গবেষক ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি আরএসএসের একটি বৌদ্ধিক কার্যক্রমের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এ কারণে তাঁর জাতীয়তাবাদী ভাবনায় সংঘের স্পষ্ট প্রভাবও ছিল।

এসব কারণেই গান্ধী হত্যার পর তৎকালীন ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে এবং এম এস গোলওয়ালকরসহ বহু নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে সরাসরি চক্রান্তের পর্যাপ্ত প্রমাণ না মেলায় ১৯৪৯ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

এত বিতর্কের পরও গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসেকে ‘দেশপ্রেমী বীর’ হিসেবে সম্মান করে অধিকাংশ কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কোনো দিনই গডসেকে সম্মান প্রদর্শনের নজির দেখা যায়নি।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের ফলে রাজ্যে বিজেপির শাসন কায়েম হওয়ার পরে গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীদের প্রায়ই নানা বিতর্কিত ইস্যু তুলে ধরতে দেখা যাচ্ছে। পূজামণ্ডপে স্বাধীনতা আন্দোলনের বীরদের মধ্যে গান্ধী হত্যাকারী গডসের অবস্থান সেই প্রবণতারই আরেক নমুনা, এমনই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।