
কলকাতার নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের পাঁচতলা একটি ভবনে আবাসিক হোটেল পরিচালনার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবাসিক ব্যবহারের জায়গায় কীভাবে হোটেল চালানোর অনুমতি দেওয়া হলো, সেই প্রশ্ন তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তাঁর অভিযোগ, নিয়ম না মেনে আবাসিক ভবনগুলোতে একের পর এক হোটেল গড়ে উঠেছে।
কলকাতার শিখা ইন নামের ওই হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আজ ৯ জনের মৃত্যু হওয়ার পর এ নিয়ে তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই ৯ জনের মধ্যে ৫ জন বাংলাদেশের নাগরিক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আজ বুধবার দুপুরে কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশনার মোহাম্মদ খালেদ প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
মির্জা গালিব স্ট্রিটের ১৫এইচ নম্বর ভবনে বুধবার ভোররাতের দিকে আগুন লাগে। পাঁচতলা ভবনটিতে বিভিন্ন নামে একাধিক হোটেল পরিচালিত হচ্ছিল। কলকাতা পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। প্রায় ৮০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল প্রশ্ন তুলেছেন, আবাসিক ভবনে কীভাবে হোটেল পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হলো? তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি আবাসিক হোটেল পরিচালনার জন্য পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্সের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও দমকল বিভাগের প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকা জরুরি। এখন তদন্ত করে দেখা হবে, নিয়ম না মেনে গড়ে ওঠা এসব হোটেল কীভাবে ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি পেল।
মন্ত্রী আরও বলেন, নিউমার্কেট এলাকার অনেক আবাসিক ভবনকে অর্থের বিনিময়ে হোটেল হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনার সঙ্গে কারও অনিয়ম বা গাফিলতি থাকলে তা খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতা পুলিশ বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করেছে। আগুন কীভাবে লেগেছে, ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং হোটেল পরিচালনার অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্ত করা হবে। হোটেলটির মালিক ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁকে খুঁজছে পুলিশ।
প্রাথমিকভাবে আগুনের সূত্রপাত ও ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানা গেছে। ভবনটির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথও সরু ছিল। অনেক কক্ষে জানালা না থাকায় ধোঁয়া বের হওয়ার সুযোগ কম ছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েকটি দমকলের গাড়ি কাজ করে এবং পরে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়।
হোটেলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, আগুন লাগার সময় ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি। ঘটনাস্থলে ইতিমধ্যে ফরেনসিক দল গিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। আগুনের কারণ বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, নাকি অন্য কোনো কারণ, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনাস্থলটি কলকাতা দমকল বাহিনীর সদর দপ্তরের কাছেই। ফলে এত কাছাকাছি দমকল বাহিনীর সদর দপ্তর থাকার পরও কীভাবে এত বড় প্রাণহানি ঘটল, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
নিউমার্কেট ও মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকায় কম খরচের আবাসিক হোটেলের সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া অনেক মানুষও এ এলাকার হোটেলগুলোতে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা কার্যক্রম বাড়ার পর নিউমার্কেট এলাকায় আবার বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসাপ্রার্থীদের আনাগোনা বেড়েছে।
এর মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে আবাসিক হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মাত্র কয়েক দিন আগে বীরভূমের তারাপীঠে একটি আবাসিক হোটেলে আগুনে ৯ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় হোটেলটির মালিক ও তাঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরপর দুটি ঘটনায় রাজ্যের হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ও অনুমোদন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মির্জা গালিব স্ট্রিট ও নিউমার্কেট এলাকার অনেক হোটেলেরই দমকল বিভাগের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই। আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে বা ভবনের বিভিন্ন অংশে অনিয়ম করে এসব হোটেল পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং কোন কোন হোটেল বৈধ অনুমোদন নিয়ে চলছে, তা এসআইটির তদন্তে স্পষ্ট হবে।
ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।