
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ৯ মে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরে নানা পদক্ষেপ নেওয়ায় রাজ্য উত্তাল হয়ে উঠেছে। একদিকে কলকাতার দক্ষিণ অংশে একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর পরে ওই অঞ্চলে বুলডোজার দিয়ে কথিত বেআইনি স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করা হয়েছে। অঞ্চলটি মুসলমানপ্রধান। এ ঘটনার জেরে সেখানে মানুষ বিক্ষোভ দেখান।
পাশাপাশি শহরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। ফলে হাওড়া, শিয়ালদহ, আসানসোল রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন অঞ্চলে বহু দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার জেরে বহু জায়গায় প্রতিবাদ করেন হকাররা, পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। অনেকে আহত হয়েছেন। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এসবের পাশাপাশি মে মাসের শেষ সপ্তাহে মুসলিম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার আগে রাজ্যজুড়ে গরুর মাংস কাটা, কেনাবেচা করার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিজেপির সদ্য নির্বাচিত এমএলএরা রাস্তায় নেমে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। কলকাতায় গরুর মাংস প্রায় পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ, এই নিষেধাজ্ঞার জেরে কাজ হারিয়েছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।
তপসিয়া-তিলজালা অঞ্চলে উত্তেজনা
দক্ষিণ কলকাতার তপসিয়া অঞ্চলে একটি কারখানায় আগুন লেগে এক সপ্তাহ আগে দুজন শ্রমিক নিহত হন, আহত হন আরও তিনজন। এ ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুলডোজার চালিয়ে কথিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়। মুসলিমপ্রধান অঞ্চলটিতে দীর্ঘদিন বসবাসকারী মধ্য ও উচ্চবিত্ত সমাজের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, কোনো নোটিশ ছাড়াই উচ্ছেদকারী দল বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
বাড়ির মালিকেরা বলেন, ফায়ার সার্ভিস (দমকল) বিভাগের ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ ছাড়া তাদের কাছে বাকি সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল।
এরপর কলকাতা হাইকোর্ট গত বৃহস্পতিবার উচ্ছেদের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করেন। তবে বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি। বিষয়টি ঘিরে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বাসিন্দাদের পক্ষ নিয়ে প্রতিবাদ জানায় দুটি রাজনৈতিক দল— সিপিআইএম এবং ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট।
বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হচ্ছে দোকান
উত্তর ভারতে যেভাবে বুলডোজার দিয়ে কথিত অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, সেই একই কায়দায় কয়েক দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রেলস্টেশন এবং পার্ক সার্কাস অঞ্চলে হকারদের দোকান ভাঙা হচ্ছে।
বুলডোজার চালিয়ে উচ্ছেদ করা অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে—হাওড়া, আসানসোল, শিয়ালদহসহ বিভিন্ন জংশন, রেলস্টেশন-সংলগ্ন এলাকা। হকার ইউনিয়নের তরফে বলা হয়েছে, উচ্ছেদ অভিযান চালানোর আগে তাদের কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি।
বিজেপির মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেছেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই সরকারি জমি দখল বরদাশত করা হবে না।
মুসলিমপ্রধান পার্ক সার্কাস অঞ্চলে একইভাবে বুলডোজার চালিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এর জেরে গতকাল রোববার ওই অঞ্চলে পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ বিক্ষোভ করেন। পুলিশ লাঠি চালায়। উত্তেজিত জনতা পুলিশের গাড়ি ও পুলিশ কর্মীদের লক্ষ্য করে ইট ছোড়ে।
পুলিশের দাবি, এতে তাদের কয়েক সদস্য আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, লাঠিপেটায় আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী। বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে রোববার মধ্য কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চল কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।
গরুর ‘জন্মসনদ’ প্রয়োজন
ঈদুল আজহারের আগে পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস বেচাকেনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো গবাদিপশু জবাই করা যাবে না। গবাদিপশু জবাই করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অথবা পশ্চিমবঙ্গের প্রাণিসম্পদ দপ্তরের আগাম লিখিত অনুমতি নিতে হবে।
এই নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমবঙ্গে কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে গরু বেচাকেনা। গরুর মাংস বা মাংস দিয়ে তৈরি খাবারদাবার পাওয়া যাচ্ছে না কলকাতার রেস্তোরাঁগুলোয়।
সরকারি এই নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত জেলাগুলোয় অস্থিরতা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। তবে শুধু সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নয়, এই নির্দেশিকায় ক্ষতি হচ্ছে হিন্দুদেরও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক হিন্দু গরুর খামারি ও ব্যবসায়ীকে বলতে শোনা গেছে, বছরের এ সময়ে গরু বিক্রি করে তাঁরা ভালো রোজগার করেন। সারা বছরের আয়ের বড় অংশই তাঁরা এ সময়ে গরু বেচে বাজার থেকে তুলে নেন। হঠাৎ জারি করা নিষেধাজ্ঞা তাঁদের ব্যবসা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
বিজেপির এমএলএরা রাস্তায় গবাদিপশুর গাড়ি দাঁড় করিয়ে গরুর ‘জন্মসনদ’ দেখতে চাইছেন বলে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হিঙ্গলগঞ্জ থেকে করা এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে। একটি স্থানীয় পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার হিঙ্গলগঞ্জ এলাকার লেবুখালীতে একটি গবাদিপশুবাহী গাড়ি আটক করেন হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি এমএলএ রেখা পাত্র।
বিজেপির এই বিধায়কের বক্তব্য ছিল, রাজ্য সরকার ১৪ বছরের কম বয়সী গরু জবাইয়ের ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। অতএব গরুগুলোর জন্মের নথি বা ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ দেখালে তবেই সেগুলোকে নিয়ে যেতে দেওয়া হবে। গরুর ‘জন্মসনদ’ দেখাতে না পারলে সেগুলোকে ছাড়া হবে না।
তৃণমূল কংগ্রেসের এমএলএ কুনাল ঘোষ এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘আমরা বিধায়কের কাছে অনুরোধ করব, বিজেপিশাসিত কোনো রাজ্যের অন্তত একটি গরুর ‘জন্মসনদ’ আমাদের দেখান, তাহলে বিষয়টি আমাদের রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে।’
গরু না খাওয়ার আবেদন নাখোদা মসজিদের ইমামের
কলকাতার অন্যতম প্রভাবশালী নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহম্মদ শফিক কাসেমি অবশ্য প্রচারমাধ্যমে এক বিবৃতিতে বলেছেন, আইনের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার গরু বেচাকেনার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সেই আইনটি চালু হয়েছিল ১৯৫০ সালে। সেটি বিজেপি তৈরি করেনি।
কাসেমি বলেন, এই আইনে যেসব শর্তের কথা বলা হয়েছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গে গরু কোরবানি করা আগামী দিনে কঠিন হবে। এ ছাড়া উৎসবের সময় ছাড়া অন্য সময়েও গরু জবাই করাও ভবিষ্যতে বেশ কষ্টকর হবে।
কাসেমি বলেন, ‘আমি সব মুসলিমের কাছে আবেদন করব, শুধু গরু কোরবানি নয়, আপনারা গরুর মাংস খাওয়াও চিরতরে বন্ধ করে দিন।’
মুসলিমপ্রধান জেলা মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে একটি চিঠিতে বলেছেন, মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা না ছড়ানোই কাম্য। বিষয়টি মাথায় রেখে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করে দেওয়া প্রয়োজন, যেখানে মানুষ তাদের প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে পারবেন। এর ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন থাকবে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে কয়েক দিন ধরে একধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এ অস্থিরতার সাময়িক না ধারাবাহিক—তা নিয়ে আপাতত উদ্বেগে রয়েছেন রাজ্যের মানুষ।