আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় ‘বিশ্ব হিন্দু বার্তা’র স্টল
আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় ‘বিশ্ব হিন্দু বার্তা’র স্টল

কলকাতা বইমেলায় মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ সংখ্যালঘু কমিশনের

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতার ৪৯তম আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলায় মুসলিম ও খ্রিষ্টান সমাজের বিরুদ্ধে ‘অকথ্য ভাষায় লিখিত বিদ্বেষপূর্ণ ও ইতিহাস বিকৃত করা পুস্তকাবলি’ বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান আহমেদ হাসান ইমরান বইমেলার আয়োজক পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের সভাপতি সুধাংশু শেখর দের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁকে বিষয়টি সম্পর্কে জানিয়েছেন। আহমেদ হাসান সম্পাদিত সংবাদপত্রে এ বিষয়ে একটি খবর প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে বৈঠকের ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে।

আহমেদ হাসান ইমরান সম্পাদিত সংবাদপত্রটির নাম ‘পুবের কলম’। তিনি পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যানও বটে। তাঁর পত্রিকায় আজ শুক্রবার লেখা হয়েছে, বইমেলা কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড দুই বছর ধরে ‘বিশ্ব হিন্দু বার্তা’ নামে একটি সংস্থাকে বইমেলা প্রাঙ্গণে বই বিক্রির অনুমতি দিচ্ছে।

পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘এখানে দেদার বিক্রি হচ্ছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও অন্যান্য গেরুয়া সংগঠনের ঘৃণা ছড়ানো ও বিদ্বেষ বার্তা বহন করা পুস্তক। ইংরেজি, বাংলা ও হিন্দি ভাষার পুস্তক। সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে অকথ্য ভাষায় লিখিত ও বিদ্বেষপূর্ণ ইতিহাস বিকৃত করা পুস্তকাবলি এখানে বিক্রি করা হচ্ছে।’

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সরেজমিন দেখা যায় , আজ শুক্রবার বিশ্ব হিন্দু বার্তার স্থলে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রচণ্ড ভিড়। ভারতের প্রধান হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) একাধিক পুস্তক সেখানে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে আরএসএসের সম্পর্ক নিয়েও একটি পুস্তিকা রয়েছে।

পত্রিকার প্রতিবেদন অনুসারে, আহমেদ হাসান গিল্ডের সভাপতি সুধাংশু শেখর দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি জানান। পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, ‘গিল্ড সভাপতি প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এখানে বিভিন্ন স্টল বিভিন্ন বই বিক্রি করবে। এতে আমরা কী করতে পারি। তাঁকে বলা হয়, বিশ্ব হিন্দু বার্তার স্টল থেকে বিদ্বেষ ও বিভাজন ছড়ানো হচ্ছে, এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তখন সুধাংশু শেখর বলেন, এর জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আলাদা সেল আছে, পুলিশ আছে, আপনারা তাদের কাছে গিয়ে অভিযোগ করতে পারেন। এরপর সুধাংশুকে জানানো হয়, এই বইমেলার আয়োজক হচ্ছে বুক সেলার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স গিল্ড, কাজেই তাদের অনুমোদন ছাড়া বই বিক্রিও প্রদর্শনী হতে পারে না। তখন তিনি বলেন, আপনারা লিখিত অভিযোগ করুন।’

পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, সুধাংশু শেখর সংখ্যালঘু কমিশনের দলটিকে জানান, এই বইমেলার প্রকৃত আয়োজক পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক প্রকাশক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়। এরপর পত্রিকার তরফে চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গিল্ডকে লিখিতভাবে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন।

পত্রিকার খবরে বলা হয়, এরপর এ বিষয়ে গিল্ড অফিসে কমিশনের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি সুধাংশু শেখরকে তাদের বক্তব্য কমিশনকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বইমেলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বইমেলায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একাধিক স্টল রয়েছে। সেসব স্টল থেকে বিক্রি করা হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীর লেখা বই। বিরাট আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিবারই এই বইমেলা উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। এবারও করেছেন।

পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের দুই শীর্ষ কর্তা সুধাংশু শেখর এবং ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। একই রকম ঘনিষ্ঠ ‘পুবের কলম’ সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং রাজ্য সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান আহমেদ হাসান ইমরানও। তিনি অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্যও ছিলেন।

তবে হিন্দুত্ববাদী প্রকাশনাকে কেন্দ্র করে মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছুটা সংঘাত বাঁধল। পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড বিষয়টি নিয়ে কমিশনকে কী ব্যাখ্যা দেয়, সেটাই এখন দেখার।