
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী ভোটে ‘নীল সুনামি’ বয়ে যাওয়ার পর ভারতে বয়ে চলেছে ঠাট্টা–ইয়ার্কি–কৌতুক ও উপহাসের বন্যা। প্রত্যাশিতভাবেই সেই বন্যায় ভেসে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাঁকে যিনি ‘মাই ফ্রেন্ড’ বলে সম্বোধন করে এসেছেন সেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অবশ্যই রাজনীতিক না হয়েও ভারতের রাজনীতি যাঁকে ঘিরে এই মুহূর্তে বনবন করে ঘুরে চলেছে, সেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ‘পোস্ট’–এ গতকাল বুধবার থেকে চলেছে তুমুল তামাশা। হা–হুতাশ। কেউ বলছেন, আহা, জ্ঞানেশ থাকলে ট্রাম্পকে এই অবস্থায় পড়তে হতো না। ট্রাম্পের কাছে কেউ জানতে চাইছেন, জ্ঞানেশের ফোন নম্বর পাঠাবেন কি না, কেউ প্রধানমন্ত্রী মোদির ছবি সেঁটে কৌতুক করে লিখেছেন, ‘ফ্রান্ড, ডোনাল্ড নিডস জ্ঞানু’।
ভুললে চলবে না, সিইসি জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই কিছুদিন আগেই ভারতের নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ঠাট্টা–ইয়ার্কির বন্যা কখন কীভাবে শুরু, সেই ময়নাতদন্তে না গিয়ে দেখা যাক পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিতরা কে কীভাবে রাজনৈতিক শোধ নিচ্ছেন। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকে. শান্তি ভঙ্গ করবেন না বলে মুচলেকা দিয়ে যিনি আপাতত কিছুটা স্তিমিত, কৌতুকপূর্ণ তীর্যক এক পোস্টে লিখেছেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার থাকলে ট্রাম্পের সঙ্গে এমনটা কিছুতেই হতে দিতেন না।’
দিপকে কোনো ‘মিম’ পোস্ট করেননি। স্রেফ ওই লাইন লিখেছেন। কিন্তু তাঁর মতো অতটা নিরামিষ নন পশ্চিমবঙ্গের ডাকাবুকো তৃণমূল নেত্রী মহুয়া মৈত্র। করমর্দনরত মোদি ও ট্রাম্পের একটি ছবি দিয়েছেন তিনি। তাতে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পকে মোদি কিছু একটা বলছেন। দুজনের ছবির গায়ে লেখা সেই জিজ্ঞাসায় মোদি জানতে চাইছেন, ‘জ্ঞানেশের নম্বর পাঠাব কি?’ একেবারে ওপরে লেখা তাঁর মন্তব্য, ‘ফ্রান্ড ডোলান্ড নিডস জ্ঞানু।’
ককরোচদের মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী মোদি যখন প্রথম ইনস্টাগ্রামের সহায়তা নিলেন, তখন ‘মিত্রোঁ’ বা ‘ভাইয়ো অর বহেনো’ সম্বোধন না করে জেন–জিদের ফ্রেন্ড বলে সম্বোধন করেছিলেন, যা তাঁর উচ্চারণে ‘ফ্রান্ড’ শুনিয়েছিল। মহুয়াও তাই ‘ফ্রেন্ড’ না লিখে ‘ফ্রান্ড’ লিখে ঠাট্টা করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট গত আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ভারতের নির্বাচন পরিচালনব্যবস্থার প্রশংসা করেছিলেন। সেই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, জ্ঞানেশ কুমার মার্কিন প্রশাসনের একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া আপনারা ভোট করান কী করে?
ট্রাম্প লিখেছেন, শেষ নির্বাচনে ভারতে ভোট দিয়েছেন ৬৪ কোটি মানুষ। এঁদের মধ্যে ই–মেইলে ভোট দিয়েছেন এক শতাংশের কম। সব ভোটারের কাছে বৈধ পরিচয়পত্র ছিল। বৈধ পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোটদানের প্রক্রিয়াটি বেশ ভালো।
ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রেও ওই ধরনের আইন চালু করতে চান। সে কথা মনে করিয়ে কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা এক্স হ্যান্ডলে তাই উপদেশ দিয়ে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প সাহেব, জ্ঞানেশকে সঙ্গে নিলে আজকের দিনটা আপনাকে দেখতে হতো না।’
ট্রাম্পের মুখে জ্ঞানেশবন্দনার কথা জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও ভোলেননি। জ্ঞানেশবিরোধী অভিযানে শামিল হওয়ার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তড়িঘড়ি দেশ ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর বিরুদ্ধে পুরোনো এক মামলার সমন নতুনভাবে জারি করা হয়েছে।
তাতে না দমে ধ্রুব রাঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজিৎ দিপকের পোস্ট ও মার্কিন নির্বাচন নিয়ে এক ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরের শিরোনাম জুড়ে লিখেছেন, ‘ভুলে যাবেন না, ট্রাম্প কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারের প্রশংসা করেছিলেন।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আন্দোলনকর্মী প্রশান্ত ভূষণ এক পোস্টে মোদি ও ট্রাম্পের কাল্পনিক কথাবার্তা তুলে উপহাস করেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পকে মোদি বলছেন, ‘ফ্রান্ড, জ্ঞানেশকে আমি তোমার কাছে পাঠাতে পারিনি বলে দুঃখিত। আমাকে তো আগে আমার ঘর সামলাতে হবে। তবে কী জানো, লোকজন এখন তাকে (জ্ঞানেশ) গৃহবন্দী করে ফেলেছে। সে বেচারা এখন আমাকেও সাহায্য করতে পারছে না।’
চেনা–পরিচিতদের মতো অচেনা মানুষেরাও ট্রাম্প–মোদি–জ্ঞানেশকে উপহাসের পাত্র করে ছেড়েছেন। ‘পানস্টারএক্স’ হ্যান্ডলে একজন লিখেছেন, ‘দুঃখের কথা, ট্রাম্পের একজন জ্ঞানেশ কুমার ছিলেন না।’
উর্দুভাষী এক হ্যান্ডলে লেখা, ‘ভোটের খেলায় ট্রাম্প এখনো অপেশাদার।’ সহাস্য জ্ঞানেশের ছবি দিয়েছেন একজন। সেই ছবির ওপরে লেখা, ট্রাম্পকে জ্ঞানেশ হিন্দিতে বলছেন, ‘তোমার টেকনিকই ভুল ছিল।’
যশ ভূষণ নামের এক ভারতীয়র কটাক্ষ, ‘মধ্যবর্তী ভোটে হারার পর ট্রাম্প রামলীলা ময়দানে আসছেন ভোট চুরির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে।’
বিদেশেও উপহাসের ছড়াছড়ি। ‘ইরান অন ইন্ডিয়া’ নামের এক্স হ্যান্ডলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে তৈরি এক ভিডিও ক্লিপিংয়ে দেখা যাচ্ছে, হোয়াইট হাউস থেকে কয়েকজন ট্রাম্পকে চ্যাংদোলা করে বাইরে এনে একটি ময়লা ফেলার পাত্রে ফেলে ঢাকনা দিয়ে দিচ্ছেন। সেই পাত্রের গায়ে লেখা ‘বিপজ্জনক বর্জ্য’।
এআইয়ের সাহায্যে তৈরি আরেক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ভারতের রাস্তায় ট্রাম্প ছাতুর শরবত বিক্রি করছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডানা ছাঁটার পর ভারতে সরকার ও বিরোধী পক্ষের উতোর–চাপান নতুভাবে শুরু হয়েছে। আম আদমি পার্টি ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দেওয়া প্রিয়াঙ্কা কক্কর এক পোস্টে লিখেছেন, ‘টুডে পোটাস, টুমরো লোটাস।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘পোটাস’ ও ‘লোটাস’ বা পদ্মফুল বিজেপি প্রতীক।
জবাবে বিজেপি মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারী লিখেছেন, ‘পোটাস আসবে–যাবে, লোটাস চিরস্থায়ী।’ কংগ্রেসের কে সি বেণুগোপাল কিন্তু পরিবর্তনের ছোঁয়া দেখছেন। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘বাতাসে পরিবর্তনের হাওয়া।’