আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ও যোগী আদিত্যনাথ
আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ও যোগী আদিত্যনাথ

রামমন্দিরে অর্থ আত্মসাতে কোনো মুসলিম জড়িত থাকলে যোগী সরকার এতক্ষণে এনকাউন্টারে হত্যা করত: ওয়াইসি

রামমন্দির নির্মাণের জন্য ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি রুপি অনুদানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় এবার উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি।

গতকাল সোমবার উত্তর প্রদেশের পশ্চিমের বিজনৌর জেলায় এক জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে হায়দরাবাদের এই আইনপ্রণেতা ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘রামমন্দির ট্রাস্টে যদি কোনো মুসলিম থাকতেন, তাহলে এতক্ষণে সরকার তাঁকে এনকাউন্টারে হত্যা করত এবং তাঁর বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিত।’

অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে ‘বিলম্ব’ হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ওয়াইসি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বহুল আলোচিত এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পুলিশ এমনকি হেফাজতে নেওয়ার আবেদনও করছে না।

এ নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে ওয়াইসি বলেন, ‘ট্রাস্টে একজন মুসলিমকে রাখলেই হতো। তারপর তাঁকে এনকাউন্টারে হত্যা করে এবং তাঁর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে মামলাটি শেষ করে দেওয়া যেত। কিন্তু এখন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’

এ সময় উপস্থিত জনতা জোরালো করতালির মাধ্যমে ওয়াইসির এ বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।

সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবের জনসমক্ষে তোলা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে যে বিষয়টি শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠনের মাধ্যমে তদন্তে রূপ নেয়। এরপর অভিযুক্তদের বাসভবনে তল্লাশি চালানো হয়, অপ্রদর্শিত নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয় এবং মন্দিরের কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

অযোধ্যায় বিতর্কিত ভূমিতে রামমন্দির নির্মাণের পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় আসার পর ২০২০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়। এই ট্রাস্ট মন্দির নির্মাণকাজ দেখভালের দায়িত্ব পায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রামমন্দির তৈরির কাজ উদ্বোধন করেন। মন্দির নির্মাণের জন্য ভক্তরা কোটি কোটি রুপি আর্থিক অনুদান ও গয়না দান করেন।

মোদির মন্দির নির্মাণকাজ উদ্বোধনের আড়াই বছর পর এখন সেই অনুদানের কোটি কোটি রুপি নয়–ছয় ও আত্মসাতের অভিযোগে ভারতজুড়ে তোলপাড় চলছে।

মন্দির অছি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই পদত্যাগ করেছেন

অনুদানের অর্থ চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর রামমন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই পদত্যাগ করেছেন।

ওয়াইসি এ নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ সুরে বলেন, ‘চম্পত তো দিব্যি সুখে আছেন।’

কয়েক দিন আগেও ওয়াইসি উত্তর প্রদেশ সরকারকে একই প্রশ্ন করেছিলেন। সেবার তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এ মামলার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি গুলি চালানো হবে বা তাদের বাড়ির ওপর কি বুলডোজার চালানো হবে—যেমনটি রাজ্যটিতে মুসলিমদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।’

জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করে এমন যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করবে।
যোগী আদিত্যনাথ, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী

রামমন্দিরের অনুদানের অর্থ চুরির ঘটনা ভারতজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং তা বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলো যোগী আদিত্যনাথ সরকারকে তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলেছে।

সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবের জনসমক্ষে তোলা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে যে বিষয়টি শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠনের মাধ্যমে তদন্তে রূপ নেয়। এরপর কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির বাসভবনে তল্লাশি চালানো হয়, অপ্রদর্শিত নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয় এবং মন্দিরের কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে, অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এই বিতর্ক রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে এবং মন্দিরের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে ব্যাপক সংস্কারের দাবিও জোরদার করেছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রামমন্দির উদ্বোধন করেন

চম্পত রাইয়ের পদত্যাগের পর ট্রাস্টি অনিল মিশ্রও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

গত ২৫ জুন ট্রাস্টের সদস্য কৃষ্ণ মোহনের অভিযোগের ভিত্তিতে এ ঘটনায় প্রথম এফআইআর দায়ের করা হয়। এফআইআরে আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁরা হলেন—অবিনাশ শুক্লা, অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, মনীশ কুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে, রামাশঙ্কর মিশ্র, সুভাষ শ্রীবাস্তব ও রাম শঙ্কর যাদব (টিন্নু নামেও পরিচিত)।

তাঁদের সবাই রামমন্দিরের অনুদান গণনার কাজে যুক্ত কর্মী। তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া এফআইআরএ আরও কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নামও এতে নেই।

২৬ জুন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেন, জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করে এমন যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করবে।

অনুদানের ঠিক কী পরিমাণ অর্থ চুরি গেছে তার সঠিক পরিমাণ এখনো জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, মন্দিরের হিসাব থেকে প্রায় ৭ বা সাড়ে ৭ কোটি রুপি নগদ অর্থের হিসাব মিলছে না। এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রায় ৮০ লাখ রুপি উদ্ধার করেছে পুলিশ।