লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক
লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক

সুপ্রিম কোর্টের মনোভাব বুঝতে পেরেই কি কেন্দ্রীয় সরকার মুক্তি দিচ্ছে লাদাখের সোনমকে

ভারতের যোধপুর কারাগারে দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস বন্দী থাকার পর মুক্তি পেতে চলেছেন লাদাখের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুক। আজ শনিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক সোনম ওয়াংচুককে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে লাদাখের রাজধানী লেহ থেকে বিশিষ্ট এই গান্ধীবাদী শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। লাদাখ থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় যোধপুরের কেন্দ্রীয় কারাগারে। ওয়াংচুকের মুক্তির দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমো। সুপ্রিম কোর্টের রায় আসার আগেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, লাদাখের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতেই সোনম ওয়াংচুককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সরকার চায় লাদাখে শান্তি থাকুক। লাদাখ স্থিতিশীল থাকুক। পারস্পরিক সমঝোতার পরিবেশ বিরাজ করুক। তাহলেই কেবল সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা সম্ভব। সেই লক্ষে৵ এগোনোর জন্য সব দিক বিবেচনা করে সোনম ওয়াংচুককে আটক রাখার আদেশ প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে—বন্‌ধ, বিক্ষোভ যেকোনো শান্তিপূর্ণ সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর। লাদাখের সমাজ, পর্যটন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান সব ক্ষেত্রেই তা বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। জম্মু–কাশ্মীর থেকে লাদাখকে বিচ্ছিন্ন করে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরি করা হয়েছিল ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে। সেই সিদ্ধান্তকে তখন স্বাগত জানিয়েছিলেন লাদাখের জনগণ। পরবর্তী সময়ে তাঁরা পৃথক রাজ্য গঠনের ওপর জোর দেন। কেন্দ্র সেই দাবি নাকচ করে দেয়।

লাদাখের বৌদ্ধ ও মুসলিমরা পৃথক রাজ্য ও সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ক্রমেই ওয়াংচুক হয়ে ওঠেন সেই আন্দোলনের প্রধান মুখ। তাঁকে কেন্দ্র করেই মুসলিমপ্রধান কারগিল ও বৌদ্ধপ্রধান লেহ একজোট হয়ে আন্দোলনে শামিল হয়।

ওয়াংচুক বোঝান, লাদাখের ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষায় লাগামহীন উন্নয়ন বন্ধ হওয়া জরুরি। জলবায়ু আন্দোলনে শামিল হয়ে লাদাখের পরিবেশ রক্ষা করতে না পারলে গোটা দেশই রসাতলে যাবে। সেই কারণে লাদাখের জমির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত তাই একান্তই প্রয়োজনীয়। কারণ, ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত এলাকার জমির অধিকার শুধু সেখানকার বাসিন্দাদের।

এই আন্দোলনের ফলে লাদাখে বিজেপি একঘরে হয়ে পড়ে। পরপর দুবার জেতা লোকসভার একমাত্র আসনটি ২০২৪ সালের ভোটে বিজেপি হেরে যায়। সোনমের নেতৃত্বে নতুন শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গান্ধীবাদী হওয়ায় সোনম ওয়াচুক কখনো হিংসাকে বরদাস্ত করেননি; কিন্তু ২০২৫ সালের নভেম্বরে লেহ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। বিজেপি অফিসে আগুন জ্বলে। পুলিশ আক্রান্ত হয়। গুলিতে ৪ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন।

সহিংসতার প্রতিবাদে অনশন প্রত্যাহার করে বাড়ি ফিরে গেলেও পুলিশ সোনমকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে সহিংসতায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। বলা হয়, নেপাল ও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ‘জেন জি’–এর সর্বাত্মক আন্দোলনের মতো লাদাখি তরুণদেরও সক্রিয় হতে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় জাতীয় নিরাপত্তা আইনে। এই আইনে বিনা বিচারে এক বছর পর্যন্ত বন্দী রাখা যায়।

সোনমের গ্রেপ্তার চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি। অভিযোগ, বক্তৃতার ভুল ব্যাখ্যা করে সোনমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেই মামলায় সোনমের হয়ে দাঁড়ান বিশিষ্ট আইনজীবী কপিল সিব্বাল। মামলার শুনানির সময় বিচারপতিরাও কেন্দ্রের কাছে নানান ব্যাখ্যা চান। সোনমের ভাষণ সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী অনুবাদ করা হয়েছে বলেও বিচারপতিরা সন্দেহ প্রকাশ করেন। সুপ্রিম কোর্টের রায় বিপক্ষে যেতে পারে বুঝেই সম্ভবত কেন্দ্রীয় সরকার সোনম ওয়াংচুককে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কংগ্রেস নেতা শশী থারুর কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। আজ শনিবার ‘এক্স’ হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, ‘১৬৯ দিন পর সোনম ওয়াংচুকের মুক্তির নির্দেশ নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক; কিন্তু সুপ্রিম কোর্টকে ঠিক করা দরকার, একজন মানুষকে কত দিন বিনা বিচারে এভাবে আটকে রাখা যেতে পারে। অনির্দিষ্টকাল ধরে আটক রাখা ঔপনিবেশিক আমলের অগণতান্ত্রিক রীতি। সভ্য ও পরিণত গণতন্ত্রে এর স্থান হতে পারে না।’