
# তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ সংসদ সদস্যের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার
# কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বসে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত।
# দলত্যাগে সংসদ সদস্য পদ খারিজ হওয়া ঠেকাতে দুই–তৃতীয়াংশ সদস্য দরকার। বিদ্রোহীদের সেটা হয়ে গেছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পরিষদীয় দলের মতো লোকসভায়ও ভেঙে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। আজ সোমবার লোকসভার ২০ জন সদস্য স্পিকার ওম বিড়লার অফিসে চিঠি দিয়ে আলাদা বসার আবেদন জানিয়েছেন বলে বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাঁরা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর সমর্থক ও শরিক হতে চেয়েছেন। লোকসভার এই বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বারাসাতের সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার।
কাকলি কিছুদিন আগেও তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার নেত্রী ছিলেন। সম্প্রতি তাঁকে সরিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেতা করা হয়েছিল। উপনেতা ছিলেন বীরভূমের সংসদ সদস্য অভিনেত্রী শতাব্দী রায়। বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের নতুন জোটের উপনেতাও তিনি।
কাকলি ও শতাব্দী ছাড়া বাকি ১৮ জন বিদ্রোহীর মধ্যে রয়েছেন—হাওড়া থেকে নির্বাচিত সাবেক ফুটবলার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরভূমের আরেক সংসদ সদস্য অসিত মাল, বারাকপুরের পার্থ ভৌমিক, মথুরাপুরের বাপি হালদার, কোচবিহারের জগদীশ বাসুনিয়া, বর্ধমানের শর্মিলা সরকার, ঝাড়গ্রামের কালীপদ সোরেন, বাঁকুড়ার অরূপ চক্রবর্তী, মুর্শিদাবাদের খলিলুর রহমান ও আবু তাহের, হুগলির সংসদ সদস্য অভিনেত্রী রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, মেদিনীপুরের সংসদ সদস্য অভিনেত্রী জুন মালিয়া।
আরও রয়েছেন মেদিনীপুরের ঘাটাল আসনের সংসদ সদস্য অভিনেতা দীপক (দেব) অধিকারী, বহরমপুরের সংসদ সদস্য ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠান। এই ২০ জনের মধ্যে রয়েছেন বলে বিক্ষুব্ধদের দাবি। বলা হচ্ছে, উলুবেড়িয়ার সাজদা আহমদ, জয়নগরের প্রতিভা মণ্ডল, আরামবাগের মিতালি বাগ ও আসানসোলের শত্রুঘ্ন সিনহাও ওই চিঠিতে সই করেছেন।
পরিষদীয় দলে ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে সংসদীয় দলেও ভাঙনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল কয়েক দিন ধরে। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, ১০ জুন সেই ভাঙন চূড়ান্ত হবে। কিন্তু আজ সোমবার বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক ছিল। সেই বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লি আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ঠিক হয়, ওই দিনেই তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন ধরানো হবে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও সোমবার দিল্লি চলে আসেন। আয়ুষ্মান ভারত কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গের সাড়ে ছয় কোটি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তারই মধ্যে সম্পূর্ণ হয় ভাঙনের প্রক্রিয়া।
আজ সোমবার সকালেই রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের বাড়ি গিয়ে সংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন তৃণমূলের বর্ষীয়ান সদস্য সুখেন্দু শেখর রায়। তিনি তৃণমূল কংগ্রেস থেকেও পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর গণমাধ্যমকে বলেন, দল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আরজিকর–কাণ্ডের পর বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলাম। চেয়েছিলাম দল ব্যবস্থা নিক। কিন্তু তা নেয়নি। ঘটনার দোষী ব্যক্তিদের আড়াল করে গেছে।
শুখেন্দু শেখর পদত্যাগ করার পর সোজা চলে যান লুটিয়েন্স দিল্লিতে মোতিলাল নেহরু মার্গে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সরকারি বাসভবনে। ভূপেন্দ্র যাদবই ছিলেন এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির নেতা। সেখানে ততক্ষণে একে একে হাজির হয়েছেন বিদ্রোহী তৃণমূল সংসদ সদস্যরা।
ঘণ্টা দুয়েকের বৈঠকে ভূপেন্দ্রর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপির সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে ও ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব। সবাইকে অবাক করে সেখানেই বৈঠকে যোগ দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বেলা তিনটা নাগাদ ঠিক হয়, ২০ জন বিক্ষুব্ধ সংসদ সদস্য আলাদা পরিচিতি পেতে লোকসভার স্পিকারকে চিঠি দেবেন। তাঁরা বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থন করবেন।
লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের আসন ছিল ২৯। বসিরহাটের সংসদ সদস্য হাজি নুরুলের মৃত্যুর কারণে আসনটি খালি রয়েছে। দলত্যাগবিরোধী আইন বা সংসদ সদস্য পদ খারিজ হওয়া থেকে বাঁচতে বিদ্রোহীদের দুই–তৃতীয়াংশ সদস্য দরকার ছিল। সে জন্য বিক্ষুব্ধ সদস্যদের প্রয়োজন ছিল ১৯ জনের সমর্থন। সেখানে ২০ জন সই করেন। বিধিবদ্ধভাবে দলে ভাঙনের বিষয়টি স্বীকৃতি পেলে কাকলির নেতৃত্বে এঁরাই আসল তৃণমূল হিসেবে নিজেদের দাবি করবেন। ভবিষ্যতে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক জোড়া ঘাসফুলের দাবিদারও তাঁরা হতে পারবেন।
বিজেপির উদ্যোগে ঠিক এভাবেই মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও এনসিপি ভেঙে গিয়েছিল। দুই দলের নির্বাচনী প্রতীকের মালিক হয়েছিলেন বিদ্রোহী নেতৃত্ব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তৈরি দলের ভাগ্যও সম্ভবত তেমনই হতে চলেছে। দিল্লিতে তাঁর উপস্থিতিতেই বিজেপি তার ‘অপারেশন লোটাস’ কার্যকর করে ফেলল।
কিছুদিন আগে এভাবে রাজ্যসভায় আম আদমি পার্টিতেও (আপ) ভাঙন ধরানো হয়েছিল। রাঘব চাড্ডার নেতৃত্বে আপের সাতজন সংসদ বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। লোকসভার পর বিজেপি এবার নজর দেবে তৃণমূলের রাজ্যসভাতেও। সুখেন্দু শেখরের পদত্যাগের পর সেখানে এখন তৃণমূলের সদস্য থাকলেন ১২ জন।
ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় শর্মিলা সরকার বলেন, ক্ষোভ অনেক দিন ধরেই জমছিল। হুট করে কিছু হয়নি। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের দরুন কোনো কাজই করতে পারতাম না। কোনো প্রতিকারও ছিল না। এখন আমরা আলাদা ব্লক করতে চলেছি, যাতে এনডিএকে সমর্থন দিতে পারি।
তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের পর বিজেপির নজরে এবার রয়েছে তামিলনাড়ুর সাবেক শাসক দল ডিএমকে। নির্বাচনে ভরাডুবির পর ডিএমকের হাত ছেড়ে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা টিভিকে সরকারকে সমর্থন করেছে। এতে ডিএমকে ক্ষুব্ধ। কংগ্রেসকে তারা বিশ্বাসঘাতক বলেছে। ইন্ডিয়া জোটের শরিক থাকা সত্ত্বেও সোমবারের বৈঠকে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লোকসভায় ডিএমকের সদস্য রয়েছেন ২২ জন। বিজেপি চাইছে এবার তাদের সমর্থন আদায় করতে।
তৃণমূল ও ডিএমকের সমর্থন আদায় করলেও লোকসভায় এনডিএ দুই–তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না। তবে অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। সংবিধান সংশোধন বিল পাস করাতে দুই কক্ষে দুই–তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। রাজ্যসভায় সেই সংখ্যা আদায় করতে বিজেপিকে আগামী বছর উত্তর প্রদেশ বিধানসভা ভোট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
লোকসভায় ভাঙনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে রয়ে গেলেন আটজন। এঁরা হলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, মালা রায়, সায়নী ঘোষ, মহুয়া মৈত্র ও কীর্তি আজাদ। এত দিন ধরে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতৃত্ব নিয়ে কংগ্রেসের সমালোচনা করে আসা ও রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা যায় সোমবার ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে সোনিয়া গান্ধীর পাশে বসে থাকতে। কংগ্রেসই এখন তাঁর রাজনৈতিকভাবে বেঁচে থাকার সাহারা।