তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

তৃণমূলের হারের পর নবান্ন থেকে সচিবালয় ফিরছে রাইটার্সে, আরও যেসব পরিবর্তন শুরু

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। বিপুল ব্যবধানে বিজেপির জয়ের পর শুধু সরকার পরিবর্তনই নয়, প্রশাসনিক কাঠামোতেও আসতে চলেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রদবদল। তার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত—বর্তমান সচিবালয় ‘নবান্ন’ থেকে প্রশাসনের কেন্দ্রকে আবার ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ। এ ছাড়া মমতার দুই উপদেষ্টার পদত্যাগের কথা জানা গেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে থেকে বিশেষ নিরাপত্তা পাহারাও উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।

রাজ্যের ২৯৪টি আসনের নির্বাচন গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় অনুষ্ঠিত হয়। ফল ঘোষণা হয় ৪ মে। এই নির্বাচনে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পায় ৮০টি আসন। সুন্দরবন অঞ্চলের একটি আসনে ভোট কারচুপির অভিযোগে ২১ মে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি ২৯৩টি আসনের ফলাফলের ভিত্তিতেই নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এখনো শপথ গ্রহণের নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা হয়নি। তবে বিজেপি সূত্রে জানা গেছে, ৯ মে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকীর দিন নতুন সরকারের শপথ হতে পারে। সেই প্রস্তুতিতেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কলকাতা সফরের সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। তিনি আজই কলকাতা আসতে পারেন।

অন্যদিকে নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, বিপুলসংখ্যক আসনে কারচুপি হয়েছে এবং তিনি পদত্যাগ করবেন না। এমনকি রাজ্যপালের দপ্তরেও যাবেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই অবস্থান রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ৭ মে তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা, ফলে এরপর প্রশাসনিক পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বিজেপি ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক কিছু বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম—রাজ্য সচিবালয়কে বর্তমান নবান্ন ভবন থেকে সরিয়ে কলকাতার ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফিরিয়ে নেওয়া। হাওড়ার মন্দিরতলা-শিবপুরে অবস্থিত ১৪ তলা এইচআরবিসি ভবন। এটিই ‘নবান্ন’ নামে পরিচিত। ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহাকরণ থেকে স্থানান্তর করেছিলেন।

রাইটার্স বিল্ডিং ‘মহাকরণ’ নামেও পরিচিত। এ ভবন কলকাতার প্রশাসনিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। ডালহৌসি স্কয়ার (বর্তমান বি বি ডি বাগ) এলাকার লালদিঘির পাড়ে অবস্থিত এই ভবনের নির্মাণ শুরু হয় ১৭৭৭ সালে এবং উদ্বোধন হয় ১৭৮০ সালে। স্থপতি টমাস লিয়নের নকশায় তৈরি এই ভবন পরবর্তীকালে সম্প্রসারিত হয়ে বিশাল প্রশাসনিক কমপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে রাইটার্স বিল্ডিং সংস্কারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বিজেপি নেতৃত্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় এলে দ্রুত প্রশাসনিক দপ্তরগুলো সেখানে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর আবার রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ফিরে আসতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী মহাকরণ।

পদত্যাগ আলাপন ও হরিকৃষ্ণর

রাজ্য সচিবালয় পরিবর্তনের আলোচনার মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্য উপদেষ্টা পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন দুই অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী। দুজনই একসময় রাজ্যের মুখ্যসচিব পদে ছিলেন। অবসরের পরে ওই দুই আমলাকে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সচিবের পদ থেকে সাবেক আমলা মনোজ পন্থর পদত্যাগের কথাও শোনা যাচ্ছে।

মমতা ও অভিষেকের বিশেষ নিরাপত্তা উধাও

পশ্চিমবঙ্গের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির দিকে যাওয়ার মুখে ‘সিজারস ব্যারিকেড’ তুলে নিয়েছে কলকাতা পুলিশ। মমতার বাড়ির দিকে রাস্তায় যাওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ছিল এত দিন। এ এলাকার অন্য অধিবাসীদেরও বের হওয়ার সময় পকেটে কিংবা ব্যাগে আধার কার্ড নিতে হতো বলে জানা গেছে। গতকাল থেকে বিশেষ নিরাপত্তা তুলে নেওয়ায় মানুষ এখন স্বচ্ছন্দে ওই এলাকা দিয়ে আসা–যাওয়া করতে পারছেন।

এদিকে মমতার ভাইপো ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটের দপ্তরের সামনে থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে পুলিশি পাহারা। গতকাল দুপুরে ওই এলাকা থেকে হঠাৎই পুলিশ পাহারা তুলে নেওয়া হয়। এলাকাটি পড়েছে কলকাতা নগরীর শেক্‌সপিয়ার সরণি থানার অধীন।

তৃণমূল সরকারের আমলে কড়া পুলিশি নিরাপত্তা থাকত ক্যামাক স্ট্রিট এলাকায়।