সূর্যাস্তের সময়টা বোধ হয় কারাবন্দীদের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে দিল্লির তিহার জেলের কারাকক্ষগুলো যখন খুলে দেওয়া হয় এবং বন্দীদের অন্ধকার নামা পর্যন্ত স্যাঁতস্যেঁতে উঠানে থাকতে হয়, তখন বন্দী নম্বর ৬২৬৭১৪-এর এমনটাই অনুভূতি হয়। তখন তাঁর মনে বন্দিজীবনের কষ্ট ও হতাশা আরও তীব্র হয়ে ধরা দেয়।
তিহার জেলে থাকা ৬২৬৭১৪ নম্বরের এ বন্দীর নাম উমর খালিদ। তিনি সম্প্রতি জানতে পেরেছেন, ভারত থেকে হাজার মাইল দূরের এক নির্বাসিত বন্দিশিবিরে থাকা আরেক রাজনৈতিক বন্দীও দেড় শতাব্দীর বেশি আগে ঠিক একই অনুভূতির কথা লিখে গিয়েছিলেন।
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খালিদ বলেন, ‘ফিওদর দস্তয়েভস্কিও তাঁর কারাজীবনের স্মৃতিকথায় সূর্যাস্তের সময় হওয়া এই মানসিক অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। আমার ধারণা, এমন অনুভূতি হওয়ার একটা কারণ আছে। তখন উপলব্ধি হতে থাকে, জীবনের আরেকটি দিন বন্দিদশায় কেটে গেল।’
২০২০ সালে কারাবন্দী হওয়ার পর খালিদ এই প্রথম কোনো সাংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিলেন।
ভারতে এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যাঁরা উমর খালিদের নাম শোনেননি। গত এক দশকে তিনি প্রথমে একজন সোচ্চার ও তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি পান। পরে ২০১৯ সালে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। ওই আন্দোলন ছিল নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে উমর খালিদকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দিল্লির প্রাণঘাতী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ‘প্রধান ষড়যন্ত্রকারীদের’ একজন হওয়া এবং ‘সহিংস উপায়ে সরকার পরিবর্তনের’ ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে উমর খালিদকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দিল্লির প্রাণঘাতী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ‘প্রধান ষড়যন্ত্রকারীদের’ একজন এবং ‘সহিংস উপায়ে সরকার পরিবর্তনের’ ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
আজও ভারতের হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টিপন্থী (বিজেপি) কিছু টেলিভিশন চ্যানেলের উপস্থাপকেরা রাতের সংবাদ অনুষ্ঠানে তাঁর নাম উল্লেখ করতে গিয়ে তাঁকে মুসলিম সন্ত্রাসী ও ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে আখ্যা দেন। অপর দিকে বামপন্থী কর্মী ও অধিকারকর্মীরা বিভিন্ন বিক্ষোভে তাঁর নাম উচ্চারণ করেন এবং তাঁর ছবিসংবলিত টি-শার্ট পরেন।
মানবাধিকার সংগঠন ও কর্মীদের কাছে উমর খালিদ এখন নরেন্দ্র মোদি সরকারের অধীনে ভিন্নমত দমনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাঁদের অভিযোগ, গত ১২ বছরে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
উমর খালিদ একজন মুসলিম ও বামপন্থী অধিকারকর্মী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থানের কড়া সমালোচক। তাঁর মতে, এ ধরনের মতাদর্শ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরের চেষ্টা করছে।
খালিদ অভিযোগ করেছেন, নরেন্দ্র মোদির সরকার দেশের প্রায় ২০ কোটি মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হয়রানি ও নিপীড়নের পরিবেশকে উৎসাহিত করেছে। তবে বিজেপি ধারাবাহিকভাবে এসব সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বিচার শুরু না করেই উমর খালিদকে প্রায় ছয় বছর কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে অন্যায় বলে উল্লেখ করেছে। সম্প্রতি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি তাঁর প্রতি সংহতি জানিয়ে একটি হাতে লেখা চিঠি পাঠিয়েছেন। এ ঘটনা ভারত সরকারের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
তবে বিজেপি দাবি করেছে, ভারতের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং খালিদের বিরুদ্ধে মামলার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।
কারাবন্দী অবস্থায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে দ্য গার্ডিয়ানের পক্ষে খালিদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে সরাসরি দেখা করা সম্ভব হয়নি। তাঁর পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের মাধ্যমে প্রশ্ন ও উত্তর আদান-প্রদান করে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে।
খালিদের সঙ্গে বিজেপি সরকারের সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ২০১৯ সালে। সে বছর সরকার একটি নাগরিকত্ব আইন পাস করে। সমালোচকদের দৃষ্টিতে ওই আইনটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ছিল। এই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে জেএনইউ ক্যাম্পাস।
সাক্ষাৎকারে ৩৮ বছর বয়সী উমর খালিদ স্বীকার করেছেন, বছরের পর বছর ধরে নানা অভিযোগ কাঁধে নিয়ে মনোবল ধরে রাখাটা তাঁর জন্য সহজ ছিল না।
খালিদ আরও বলেন, ‘যখন একজন মানুষকে কেবল একটি প্রতীকে পরিণত করা হয়, সেটি ইতিবাচক হোক বা নেতিবাচক—তখন নিজের মানবিক সত্তা, এমনকি কখনো কখনো মানসিক ভারসাম্যও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যাঁরা আমার প্রতি সহানুভূতি দেখান বা আমাকে আমার বাস্তব সত্তার চেয়ে বড় কিছু হিসেবে তুলে ধরেন, তাঁরাও প্রায়ই ভুলে যান, আমিও একজন মানুষ। আমারও দুর্বলতা, ভয় ও অপূর্ণতা রয়েছে। আর কারাগারে কাটানো এই দীর্ঘ বছরগুলো আমার মন ও শরীরের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমার ভেতরের উদ্বেগগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’
তবে কারাগারে কাটানো বছরগুলো মোদি সরকারের প্রতি তাঁর অবস্থানকে নরম করেনি। ভারতে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ যখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, তখন খালিদ ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং গণহত্যামূলক ভাষার স্বাভাবিকীকরণ ও মহিমান্বিতকরণ’ দেখে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন।
খালিদের আইনি মামলা বা তিহার জেলে তাঁর বন্দিজীবনের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল গার্ডিয়ান। তবে উমর স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন, তাঁর পক্ষে নীরব থাকা সম্ভব নয়।
তুখোড় এই ছাত্রনেতা বলেন, ‘যেসব সহবন্দীর সঙ্গে আপনি একসঙ্গে খাবার খেয়েছেন, তাদের মধ্য থেকেও কখনো কখনো নিজের সম্পর্কে ফিসফাস শুনতে পান। তারা আপনার পেছনে আপনাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে ডাকে। এই প্রচার-প্রচারণা মানুষের চোখে আমাকে অমানবিক করে তোলে। আমার মতো মানুষদের মানবিক মর্যাদা পাওয়ার অধিকারটুকুও যেন নেই।
‘নীরবতা এই শাসনব্যবস্থাকে আরও সাহসী করে তোলে’
দিল্লির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মুসলিম-অধ্যুষিত জামিয়ানগর এলাকায় বেড়ে উঠেছেন উমর খালিদ। তিনি বলেন, কীভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান সমাজকে ধর্মীয় বিভাজনের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং মুসলিমদের অধিকার ও মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তা তিনি নিজ চোখে দেখেছেন।
খালিদ বলেন, ‘আমি এমন এক সময়ে মুসলিম–অধ্যুষিত একটি এলাকায় বড় হয়েছি, যখন মুসলিমরা ক্রমাগত নিপীড়ন, প্রান্তিকীকরণ এবং অপপ্রচারের শিকার হচ্ছিল। একজন সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে এসব ঘটনা দেখে প্রভাবিত না হওয়াটা সম্ভব নয়।’
খালিদের মতে, এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার ও সম–অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করেছে।
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করার সময় উমর খালিদ বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী আন্দোলন, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও বিতর্কের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জেএনইউ উগ্র ডানপন্থী হিন্দুত্ব মতাদর্শীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার পর তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান।
২০১৬ সালে জেএনইউতে একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর খালিদকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় ভারতের বিভক্ত ও বিজেপিপন্থী গণমাধ্যম তাঁকে ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ব্যাপক প্রচার চালায়। খালিদের ভাষায়, সে মুহূর্ত থেকেই তাঁর জীবন ওলটপালট হয়ে গেছে।
পরবর্তী সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উমর খালিদের পিএইচডি গবেষণাপত্র জমা দেওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল। তবে তিনি উচ্চ আদালতে সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে সফল হন। তাঁর গবেষণার ভিত্তিতে লেখা প্রথম বই ‘ফ্র্যাকচার্ড কমিউনিটিজ’ চলতি মাসেই প্রকাশ হওয়ার কথা।
খালিদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ২০১৯ সালে। সে বছর সরকার একটি নাগরিকত্ব আইন পাস করে। সমালোচকদের দৃষ্টিতে ওই আইনটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ছিল।
এই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে জেএনইউ ক্যাম্পাস। পরে ভারতের বিভিন্ন শহর ও জনপদে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন, যা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
খালিদ ছিলেন ওই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ও সংগঠক। এক সময় বহুল আলোচিত হয়ে ওঠা এক ভাষণে তিনি জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমরা সহিংসতার জবাবে সহিংসতা করব না। ঘৃণার জবাবে ঘৃণা ছড়াব না। তারা যদি ঘৃণা ছড়ায়, আমরা তার জবাব দেব ভালোবাসা দিয়ে।’
তবে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর। সমালোচকদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিক্ষোভ দমনে পুলিশি সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এবং বিজেপি-সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি মুসলিমবিরোধী ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।
উত্তেজনা বাড়তে থাকলে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। অনলাইনে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজবের প্রভাবে সংঘাত আরও বেড়ে যায়।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু হিন্দু উগ্রপন্থী দল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়ে মসজিদ এবং মুসলিম নামধারী বা মুসলিম হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের নিশানায় পরিণত করে। কিছু মুসলিমও পাল্টা প্রতিরোধ ও হামলায় জড়িয়ে পড়ে। এই সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে এবং দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তিন দিন ধরে দাঙ্গা চলেছিল। এ ঘটনায় নিহত ৫৩ জনের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম। তবে তখন দিল্লি পুলিশের দাখিল করা অভিযোগপত্রে বিজেপি-সংশ্লিষ্ট উগ্র হিন্দুত্ববাদী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি। খুব অল্পসংখ্যক হিন্দু দাঙ্গাবাজদের নাম অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উল্টো, দাঙ্গার সময় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক হাজার মাইল দূরে অবস্থান করা খালিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
খালিদসহ এক ডজনের বেশি বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, তাঁরা ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিকল্পনাকারী ও পরিচালনাকারী’। তাঁরা ‘সশস্ত্র বিদ্রোহের’ মাধ্যমে ‘দেশের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হামলা’ চালানোর ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন।
সাত মাস পর দিল্লিতে পারিবারিক বাড়ি থেকে পুলিশ উমর খালিদকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের সবচেয়ে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা করা হয়।
এর পর থেকে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে দিল্লি দাঙ্গা-সংক্রান্ত মামলায় প্রমাণ জাল করা এবং সাক্ষীদের বয়ান বিকৃত বা তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ এসব অভিযোগের জবাব দেয়নি।
একই মামলায় অভিযুক্ত অন্য অনেকেই জামিন পেলেও উমর খালিদের মামলাটি এখনো ঝুলছে। তাঁর জামিনের আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকেরা বারবার শুনানি পিছিয়েছেন, মুলতবি করেছেন অথবা নিজেদের ওই মামলা থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকবারই তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ হয়েছে।
হিন্দুত্ববাদী বিজেপি খালিদের মামলায় নিজেদের কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে দলটির উগ্রপন্থী নেতারা প্রকাশ্যে তাঁর জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
জামিন পাওয়ার আশা বারবার ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতাকে খালিদ ‘অত্যন্ত হৃদয়বিদারক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ধীরে ধীরে আশা নিভে যেতে শুরু করেছে। আর আঁকড়ে ধরার মতো আশা না থাকলে কারাগারে টিকে থাকা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে। এটি মানসিক, আবেগপ্রবণ ও শারীরিকভাবে মানুষের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে।’
এখনো খালিদ কারাগারেই আছেন। পুলিশি তদন্ত চলমান থাকলেও তার শেষ কোথায়, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। পাশাপাশি মামলার বিচার শুরুর জন্যও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
উমর খালিদ বলেন, হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো রাজনৈতিক বন্দীদের অধিকারের প্রশ্নে যথেষ্ট সোচ্চার না হওয়ায় তিনি গভীর হতাশ। তাঁর মতে, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে কারাবন্দী রাজনৈতিক কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের সংখ্যা বেড়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজন কারাগারেই মারা গেছেন।
খালিদ আরও বলেন, ‘ছয় বছর পর এসে আমাকে বলতে হচ্ছে, আমি সত্যিই হতাশ। এমনকি নিজেকে অনেক সময় বিচ্ছিন্নও মনে হয়।’ তিনি বিরোধী দলগুলো, নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো এবং মানুষের আন্দোলনের ওপর ভর করে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তোলা কর্মীদের নীরবতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তবে রাতের সময়টুকুতে খালিদ কিছুটা শান্তি খুঁজে পান। কারাকক্ষে ফিরে যাওয়ার পর কারারক্ষীর চাবির ঝনঝন শব্দ মিলিয়ে গেলে তিনি নিজের দেয়ালে লেখা কিছু বাক্যের দিকে তাকান। এগুলো তাঁর ডায়েরিতে লেখা চিন্তা ও অনুভূতি থেকে তুলে আনা উদ্ধৃতি, যা তাঁকে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়।
ঔপনিবেশিকবিরোধী বিপ্লবী ভগৎ সিং-এর একটি ছবির পাশে খালিদ লিখে রেখেছেন তাঁর বিখ্যাত উক্তি: ‘আমি সেই উন্মাদ আত্মা, যে বন্দিদশাতেও মুক্ত।’