কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী
কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী

রাহুলের অভিযোগ

ভোট চুরির পর বিক্ষোভস্থল চুরি করেছে মোদি সরকার

সফল সুপ্রিম কোর্ট অভিযানের পর ‘ইন্ডিয়া’ জোট জানিয়ে দিল, ভোট চুরির পাশাপাশি সরকার এবার বিক্ষোভের স্থানটাও চুরি করতে চলেছে। এর বিরুদ্ধেও একজোট হয়ে লড়াই করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সরকারি বাসভবনে চা–চক্রের পর ইন্ডিয়া জোটের নেতারা সবাই এই আন্দোলনে শামিল হওয়ার কথা জানিয়ে দিলেন।

রাহুল গান্ধী বলেন, ‘এই লড়াই একটাই। সবাই একজোট হয়ে একটাই লড়াইয়ে নেমেছি। এখানে কোনো সমান্তরাল লড়াই হচ্ছে না। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একটাই—গণতন্ত্র রক্ষা। সংবিধান অক্ষত রাখা। গণতান্ত্রিক অধিকার অটুট রাখা। তিনি বলেন, বিরুদ্ধ স্বর দমাতে ভোট চুরির পর সরকার এবার বিক্ষোভের স্থানটাও চুরি করে নিচ্ছে। এটা আমরা হতে দেব না। চ্যালেঞ্জ জানাব।’

তবে তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিয়ে রাহুল বিস্তারে কিছু বলতে চাননি। শুধু বলেন, আমরা লক্ষ্য পূরণ করে থামব। কীভাবে তা করা হবে, সেই চমকটুকু আপাতত গোপন থাকুক।

এই লড়াই তাঁরা যে একজোট হয়ে লড়তে চাইছেন, মঙ্গলবার সকালেই রাহুল তার ইঙ্গিত দেন। ‘এক্স’ বার্তায় তিনি বলেন, আজ চায়ের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিরোধী নেতাদের, ছাত্রসংগঠনদের, নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনদেরও। গণতন্ত্র রক্ষায় এই গণ–আন্দোলনে আমরা সবাই এক। এই আন্দোলনও নিরলস চলবে। সব বিক্ষোভ এক।

মঙ্গলবার চা–চক্রে ইন্ডিয়া জোটের নেতা–প্রতিনিধিদের পাশে তাই উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী প্রমান্ত ভূষণ, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন ‘আইসা’ নেত্রী নেহা বোরাসহ অন্যরা। শুধু তাই নয়, চা–চক্রের পর সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল অংশগ্রহণকারী সবাইকে তাঁদের বক্তব্য পেশের সুযোগ দেন।

সেই সুযোগে বিহারের আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব বলেন, ‘অপরাধীদের প্রত্যেককে জবাবদিহিতে বাধ্য করা হবে। প্রত্যেককে শাস্তি পেতে হবে। যেকোনো মূল্যে গণতন্ত্র রক্ষা করব।’

আইসা নেত্রী নেতা বোরা গত সোমবার সুপ্রিম কোর্ট অভিযানে সারাক্ষণ রাহুলদের সঙ্গে ছিলেন। চা–চক্রের পর তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এক। আমাদের সবার শত্রু একটাই, বিজেপি। শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মন্ত্র একটাই, একতা।’

সমাজবাদী পার্টির ইক্রা হাসান বলেন, ‘সোমবারের জনসমাগমই বুঝিয়ে দিয়েছে জনতার সমর্থন কাদের দিকে। এই লড়াই জারি থাকবে।’ ওই দলেরই নেতা পুষ্পেন্দ্র সরোজ বলেন, ‘পোষা তোতাকে আড়াল করতে রাজা চেষ্টার ত্রুটি রাখছেন না। কিন্তু গণতন্ত্রের রক্ষায় সেই পোষা তোতাকে পদত্যাগ করাতে আমরা বাধ্য করব।’

সিপিআই নেতা ডি রাজা, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী সাগরিকা ঘোষসহ সবাই জোটবদ্ধ আন্দোলনের ওপর জোর দেন। শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে ‘মাফিয়া’ উল্লেখ করে বলেন, সাংবিধানিক পদে থেকে তিনি গোটা নির্বাচনব্যবস্থার অপরাধীকরণ করে ফেলেছেন।

সোমবারের উত্তেজনার পর মঙ্গলবারের দিল্লি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেকটাই স্তিমিত। তেমন কোনো আন্দোলনের কর্মসূচি কোথাও কারও ছিল না। গতকাল সকালে কাউকে টের পেতে না দিয়ে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্ক শিন্ডেরা যন্তর মন্তরের লোহার গেট টপকে ঢুকে পড়েন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ১০ থেকে ১২ জন সমর্থক। তাঁদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। তাঁদের মুখে ছিল জ্ঞানেশ ও বিজেপিবিরোধী ধ্বনি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রহরারত পুলিশ তাঁদের ধরে ফেলে। সিজেপি নেতাদের সন্ধ্যা পর্যন্ত মুক্তি দেওয়া হয়নি। অভিযোগ, তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। আইনজীবীদের সঙ্গেও তাঁদের কথা বলতে দেওয়া হয়নি।

যন্তর মন্তর অভিযান ঠেকাতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগ উঠেছে দিল্লি পুলিশ, সরকার ও মেট্রো কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। কিন্তু মঙ্গলবার সেই শুনানি সম্ভব হয়নি প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর বেঞ্চের অন্যতম বিচারপতি ভি মোহনার অসুস্থতার দরুন। বৃহস্পতিবার সেই মামলার শুনানি হবে। দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন রাজধানী দিল্লির ব্যবসায়ী মহল। তাঁদের দাবি, এই আন্দোলনের জন্য তাঁদের ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার কোটি রুপি। মামলার আবেদনকারীদের দাবি, সরকার বিক্ষোভ–আন্দোলনের জন্য যে নতুন স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট বিধি তৈরি করা হোক। তা মানা হোক।

জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে সিজেপি ও ইন্ডিয়া জোট আলাদা আলাদাভাবে আন্দোলন করছে। দুই দলই যদিও জানাচ্ছে তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে মঙ্গলবার সেই বিষয়ে এক বার্তায় বলেছেন, সরকারই জনতার মধ্যে এই ভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাদের এই ছক জনতাকে বুঝতে হবে।

‘এক্স’ বার্তায় অভিজিৎ বলেছেন, সিজেপিকে যখন বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল তখন প্রচার হয় আমরা বিজেপির ‘বি টিম’। তারাই আমাদের খাড়া করেছে। গতকাল (সোমবার) ইন্ডিয়া জোট বিশাল অভিযান করল। কিন্তু ১০ অক্টোবর আমাদের ওপর যেভাবে আক্রমণ হয় ওদের ওপর তা করা হলো না। এভাবেই সরকার একজনের সঙ্গে অন্যদের লড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন আন্দোলনের মোকাবিলা বিভিন্নভাবে করে। এভাবে সরকার জনতার মনে সন্দেহের বীজ বুনে দেয়। অথচ দুই দলই এক লক্ষ্যে লড়ছে।

দিপকে লিখেছেন, আমার একটাই অনুরোধ, এই কৌশলটা সবাই বুঝুক। আজ সরকার এক দলকে বিক্ষোভ করাতে দিয়ে অন্যদের ধ্বংস করতে চাইছে। কাল উল্টোটা করবে। সরকার চায় তাদের প্রশ্ন না করে আমরা এভাবে একে অপরকে সন্দেহ করে যাই। এই চক্রান্ততত্ত্ব সফল হতে দেবেন না, যা আমাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে। নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার ফাঁদে দয়া করে পা দেবেন না। আমাদের একজোট হয়ে লড়াই করা দরকার।

দিপকে লিখেছেন, লড়াইটা জ্ঞানেশ কুমার ও তাঁর রক্ষাকর্তাদের বিরুদ্ধে। লক্ষ্যভ্রষ্ট কেউ যেন না হয়।