
শিক্ষাবিদ হিসেবে দেশে তো বটেই সারা পৃথিবীতে তিনি পরিচিত। পরিবেশ আন্দোলনকর্মী হিসেবেও বিশ্বজোড়া পরিচিত। ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত লাদাখের সেই কৃতী সন্তানকে নিয়ে ‘থ্রি ইডিয়টস’ নামের একটি জনপ্রিয় সিনেমাও হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর তৈরি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রশাসিত লাদাখ প্রশাসন।
কেন ওই নির্দেশ, তা বুঝতে দেরি হয়নি সোনম ওয়াংচুকের। সরাসরিই অভিযোগ করেছেন, লাদাখের স্বীকৃতির জন্য কেন্দ্রের সঙ্গে যে লড়াই তিনি চালাচ্ছেন, সেটাই স্কুলের জমি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির কারণ। লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবিই শুধু নয়, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ককরোচদের আন্দোলনকে সমর্থন, সে জন্য আমরণ অনশন শুরু করা, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিকে সমর্থন জানিয়ে সোনম ওয়াংচুক ক্রমেই নিজেকে কেন্দ্রীয় সরকারের চক্ষুশূল করে তুলেছেন। তাঁর ধারণা, সেই কারণেই কেন্দ্রশাসিত লাদাখি প্রশাসনের ওই নির্দেশ। লাদাখি প্রশাসন জানিয়েছে, হাইকোর্টের মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সোমন প্রতিষ্ঠিত ডেজার্ট ফ্লাওয়ার স্কুলের সব কাজকর্ম বন্ধ রাখতে হবে। প্রশাসনের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই স্কুলটি চালানো হচ্ছে।
সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমোকে গত মঙ্গলবার ওই নোটিশ পাঠিয়েছেন লাদাখের রাজধানী লেহ্–র মহকুমা শাসক বা তহসিলদার। গীতাঞ্জলি হলেন সোনম ওয়াংচুক প্রতিষ্ঠিত হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অলটারনেটিভস, লাদাখের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। নোটিশে বলা হয়েছে, সংগঠনের যে জমির মামলা জম্মু–কাশ্মীর–লাদাখ হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে, তাতে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন কিছু করা যাবে না।
গত ২২ সেপ্টেম্বর লেহ্ ডেপুটি কমিশনারকে গীতাঞ্জলি আংমো এক চিঠি লিখেছিলেন। তাতে তিনি ওই স্কুলের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের জন্য এক ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ বা অনাপত্তিপত্র চেয়েছিলেন। লাদাখ প্রশাসনের দাবি, সেই ছাড়পত্র আসার আগেই স্কুলের ক্লাস ও অন্যান্য কাজকর্ম শুরু করে দেওয়া হয়েছে। তা বন্ধেই ওই নির্দেশ। নোটিশে বলা হয়, এমন কিছু করা যাবে না, যাতে বিচারাধীন মামলায় তার প্রভাব পড়ে।
২০১৮ সালের মে মাসে লাদাখের ফিয়াং থাং এলাকায় হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অলটারনেটিভসের জন্য ১৩৪ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল। সেই জমিতে হিমালয় পার্বত্য এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নসংক্রান্ত শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থে এক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করার কথা। শর্তসাপেক্ষে ৪০ বছরের ‘লিজ’ বা ইজারায় ওই জমি বরাদ্দ করা হয়। তখনে জম্মু–কাশ্মীর রাজ্য বিভাজিত হয়নি। সৃষ্টি হয়নি দুই পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সেই বিভাজন ঘটে। সেই সিদ্ধান্তের জন্য সোমন ওয়াংচুকসহ লাদাখের জনগণ তখন কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপিকে প্রবলভাবে সমর্থন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের হতাশা ক্রমেই বেড়ে যায়। বিধানসভাসহ স্বশাসন না পাওয়া, ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত হওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় তাঁরা ক্ষুব্ধ হন। শুরু হয় আন্দোলন। উন্নয়নের কথা বলে অনুগত শিল্পপতিদের হাতে লাদাখের খনি অঞ্চল তুলে দেওয়ার প্রতিবাদেও সোনম ওয়াংচুক জনমত গঠন করেন। বলেন, ওই উন্নয়ন লাদাখের ভঙ্গুর পরিবেশকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেবে। হিমালয় অঞ্চলজুড়ে বিপর্যয় দেখা দেবে। ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট লাদাখ সরকার ওই জমি বরাদ্দ বাতিল করে দেয়। বলা হয়, ইজারাসংক্রান্ত নীতিনিয়ম পালিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
জমির বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টে মামলা করে হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অলটারনেটিভস। বিচারাধীন অবস্থায় লাদাখ প্রশাসন গত অক্টোবরে হলফনামা দিয়ে জানায়, জমি বরাদ্দের বিষয়টি বাতিল হয়েছিল ২০১৯ সালের মে মাসেই। কারণ, এক বছরের মধ্যে ইজারা বাবদ চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। জমির টাকাও জমা পড়েনি। তা ছাড়া হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অলটারনেটিভস কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ও নয়। তাদের পাঠ্যক্রমও বিধিবদ্ধভাবে অনুমোদিত নয়।
প্রশাসনের এই দাবির বিরুদ্ধে সোনম ও তাঁর স্ত্রী আদালতে তাঁদের যুক্তি পেশ করেছেন। জানিয়েছেন, ইজারা পাওয়ার পর কীভাবে জম্মু–কাশ্মীরের চরিত্র বদলে গেছে, কীভাবে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, কোভিডের কারণে কাজকর্ম স্তব্ধ হয়ে গেছে। পূর্ণ রাজ্য থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হওয়ার ফলে সরকারি কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছে। বারবার আবেদন সত্ত্বেও কাজ এগোয়নি। তাঁরা বলেন, প্রশাসন বলেছিল, সরকারি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটলেও তাঁরা নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে পারেন।
সোনম ওয়াংচুক গণমাধ্যমকে বলেছেন, কেন হঠাৎ লাদাখ প্রশাসনের এই স্কুল বন্ধের নির্দেশ, বিরূপ মনোভাব, তা সহজেই অনুমান করা যায়। পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা কিংবা বিধানসভাসহ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন, লাদাখকে ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত করার দাবিতে তাঁরা নিরলস আন্দোলন করে চলেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্যই এসব পছন্দ করছে না। তাই এমন নোটিশ। হাইকোর্টের মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাই এই কাজ বন্ধের নির্দেশ। ডেজার্ট ফ্লাওয়ার স্কুল ওই বিতর্কিত জমিতেই। সেই স্কুলের কার্যক্রম মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার নোটিশ দিয়েছে লাদাখ প্রশাসন, যা পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে।