বিজেপিবিরোধীরা বুঝতে পারছেন, নির্বাচন কমিশনে কলহ ও জ্ঞানেশ কুমারের ‘স্বৈরাচারী আচরণ’ তাঁদের হাতে এক মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিয়েছে। কিন্তু কীভাবে তা ব্যবহার করা উচিত হবে, সে বিষয়ে সবাই একমত নন। এ পরিস্থিতিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সবাই। তাঁরা মনে করছেন, সবাই মিলে আলোচনায় বসলে মোকাবিলার পন্থা বেরিয়ে আসবে। আগামী সপ্তাহে, খুব সম্ভবত বুধবারে সেই বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা।
বৈঠকের জন্য সবাই তাকিয়ে আছেন কংগ্রেস নেতৃত্বের দিকে। ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক দ্রুত ডাকার দাবি জানিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর সিপিএম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি সব বিরোধী নেতাকে চিঠি লিখেছিলেন। আশ্চর্য কাণ্ড, পত্রপাঠ প্রত্যুত্তর দেওয়া ছাড়াও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীত ভুলে ফোন করেন কেরলমের সিপিএম নেতাকে। যে দলের সঙ্গে রাজনৈতিক বার্তালাপ এতকাল বন্ধ ছিল, বিজেপিকে ঠেকাতে এই সেদিন পর্যন্তও যাদের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার প্রয়োজন বোধ করেননি, পশ্চিমবঙ্গে চিরকাল যাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন, সেই দলকেই তৃণমূল নেত্রী এখন কাছে টানতে ব্যগ্র। মমতা কথা বলেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও। প্রধানত ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক ডাকার জন্য। বেবিকে সে কথা চিঠিতে জানাতেও তিনি ভোলেননি।
তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএমসহ পুরো বামপন্থী জোট—দুই পক্ষই আজ পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলম হাতছাড়া করে সর্বহারা। সর্বগ্রাসী বিজেপির আগ্রাসন রুখতে তাদের কাছাকাছি আসা যতটা সময়ের দাবি, তার চেয়ে বেশি তাদের পারস্পরিক তাগিদ। সংকটকালে হাত ধরাধরি করেই বাঁচতে হয়।
এ পরিস্থিতিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) বিরোধীদের কাছে নতুন এক প্রস্তাব রেখেছে। জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তীব্র বিরোধিতা করা, তাদের ‘ভোট চোর’ আখ্যা দিয়েও তাদেরই তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। কেননা, এর মধ্য দিয়ে বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের তদারকিতে হওয়া নির্বাচনকেই বৈধতা দিচ্ছে। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে তাই প্রস্তাব করেছেন, এসআইআর, ভোট চুরি, গণতন্ত্র হত্যা ও বিজেপি–ইসির যুগলবন্দীর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে হলে বিরোধীদের ভোট বয়কট করা দরকার। দিপকে বলেছেন, নির্বাচন কমিশন ভোটের প্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করেছে। দিনদুপুরে ডাকাতি করার মতো নির্লজ্জভাবে বিরোধী দল ও ভোটারদের সঙ্গে তারা প্রতারণা করছে। এ সত্ত্বেও বিরোধীরা যদি সেই ভোটে অংশ নেয়, তা হলে প্রতারণামূলক নির্বাচন একধরনের বৈধতা পেয়ে যায়। ক্রিকেটের ম্যাচ ফিক্সিংয়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জেনেশুনেও ফিক্সড ম্যাচে অংশগ্রহণের অর্থ তাকে মান্যতা দেওয়া। এ দ্বিচারিতা বন্ধ হওয়া দরকার।
ককরোচ জনতা পার্টির এ প্রস্তাবকে যুক্তিযুক্ত মনে করলেও বিরোধীদের অনেকেই তা মেনে নিতে পারছে না। ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের মধ্যে এ বিষয়ে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলো মনে করছে, এখনই এ সিদ্ধান্ত নিলে তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। বিজেপি ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে তাদের ইচ্ছা ও আদর্শমতো সংবিধান সংশোধন করে ফেলবে। বিরোধীরাও সংসদকে হাতিয়ার করে লড়ার অধিকার হারাবে। তা ছাড়া মাঠপর্যায়ে যেসব কর্মী বিজেপির মোকাবিলা করে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করে চলেছেন, তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
তামিলনাড়ুর ডিএমকে কিছুকাল আগেও ইন্ডিয়া জোটের সদস্য ছিল। গত বিধানসভা ভোটের পর কংগ্রেস ও বামপন্থীরা তাদের ছেড়ে টিভিকে–কে সরকার গড়তে সমর্থন দেওয়ায় ডিএমকে ইন্ডিয়া জোট থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। যদিও এখনো তারা বিজেপিবিরোধিতার লাইন ছাড়েনি। এ দলের নেতারা মনে করছেন, সিজেপির নিদান মেনে ভোট বয়কট করলে জনগণের কাছে এমন বার্তা যেতে পারে যে বিরোধীরা বিজেপিকে ভয় পাচ্ছে। তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামতে চাইছে না। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি হতে পারে।
জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে তেলাপোকারা অনড়। সিজেপি নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই তাঁদের আন্দোলন কর্মসূচি জানিয়ে দিয়েছেন। জ্ঞানেশ ইস্তফা না দিলে আগামী ২ অক্টোবর গান্ধীজয়ন্তীর দিন থেকে তাঁরা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ শুরু করবেন জানিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সিপিএম ও তৃণমূল কংগ্রেস দুই দলই চাইছে বিজেপিবিরোধিতা তীব্র করতে সিজেপি, টিভিকে, আম আদমি পার্টি ও ডিএমকের মতো দলকে কাছে টানতে। মমতা ও এম এ বেবি চাইছেন, সবাই মিলে জোটবদ্ধ হয়ে এই ইস্যুতে বিজেপিবিরোধী আন্দোলন জোরদার করে তুলুক। আগামী সপ্তাহে ইন্ডিয়া জোটের সম্ভাব্য বৈঠকে প্রসঙ্গটি অবশ্যই আলোচিত হবে।
ইন্ডিয়া শরিকেরা, বিশেষ করে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, আরজেডি, সমাজবাদী পার্টি ও বামপন্থীরা বিজেপির শরিকদের মনোভাব বোঝারও চেষ্টা করছে। বিজেপির শরিকদের কেউ এখনো প্রবলভাবে জ্ঞানেশ কুমার বা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধাচরণ করেনি। চার শরিক, বিহারের লোকজনশক্তি পার্টি (এলজেপি), অন্ধ্র প্রদেশের টিডিপি, উত্তর প্রদেশের রাষ্ট্রীয় লোক মঞ্চ ও মহারাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়া মনে করে, মানুষের মনে যখন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে সন্দেহ ও সংশয় দেখা দিয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তখন নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রকাশ্যে এসে সব প্রশ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া। সব সংশয় দূর করা।
এলজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসোয়ান, সরকারের সবচেয়ে বড় শরিক টিডিপির লোকসভার দলনেতা শ্রীকৃষ্ণ দেভারায়ালু, রাষ্ট্রীয় লোকমঞ্চের উপেন্দ্র কুশাওয়া ও আরপিআইয়ের রামদাস আটওয়ালের এ ধরনের মন্তব্য বিজেপিকে কিঞ্চিৎ চিন্তিত রেখেছে। কমিশনবিরোধী প্রচার এনডিএ শরিকদের কতটা প্রভাবিত করছে, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব আপাতত তা বোঝার চেষ্টা করছে। বিজেপি এ–ও দেখছে, শরিক নয় অথচ নানাভাবে সরকারকে সাহায্য করে আসা ওয়াইএসআর কংগ্রেস নেতা জগনমোহন রেড্ডির কণ্ঠেও ভিন্নসুর। জগনমোহন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা বজায় থাকার পাশাপাশি এমন বিশ্বাসও জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি যে স্বচ্ছতা বজায় রয়েছে। বিজেপিকে তিনি মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি, ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নিযুক্তির জন্য যে আইন পাস করতে তাঁরা সাহায্য করেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। সেই আইনেই ইসি সদস্যদের মনোনয়নের দায়িত্ব থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে সেই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত আরও এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে রাখার কথা বলা হয়েছিল। কমিটির তৃতীয় সদস্য লোকসভার বিরোধী দলনেতা। এ আইনের ফলে সরকারপক্ষ যাঁকে ঠিক করবে, তিনিই সিইসি ও ইসি সদস্য হিসেবে মনোনীত হবেন। বিরোধী নেতা কিছুই করতে পারবেন না।
জ্ঞানেশ প্রশ্নে শরিক ও সমমনা দলগুলোর মনোভাব শেষ পর্যন্ত কেমন হয়, বিজেপি এখন তা বোঝার চেষ্টা করছে। জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সরকার রাজি নয়। বিজেপির এক শীর্ষ নেতার কথায়, জল কতদূর গড়ায়, তা না দেখে কোনো ব্যবস্থা নয়। তিনি মনে করিয়ে দেন, নরেন্দ্র মোদি কখনো হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরানোর সিদ্ধান্তও অনেক ভাবনাচিন্তার পর নেওয়া। এ ক্ষেত্রে প্রশ্নটি সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানকে নিয়ে। বিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা, নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা ও জনগণের প্রতিক্রিয়া দেখেই সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে।