
উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) সরাসরি বিরোধিতায় নামলেন বিজেপির শরিক দল রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়ার (আরপিআই) নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আটওয়ালে। একেবারে সরাসরি তিনি জানিয়ে দিলেন, ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে যেকোনো উৎসবে যোগ দেওয়ার অধিকার প্রত্যেক ভারতীয়র আছে। ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুরে আজ বুধবার গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে রামদাস বলেন, দেশ সংবিধান অনুযায়ী চলে। সেই সংবিধান সব ধর্মের মানুষকে সুরক্ষা দেয়। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মাবলম্বীর উৎসবে যোগ দেবেন না, এমন অবস্থান সংবিধানবিরোধী।
সম্প্রতি মহারাষ্ট্রে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে ভিএইচপির জারি করা এক ফরমান। তাতে বলা হয়েছে, নবরাত্রিতে রাজ্যজুড়ে গরবা ও ডান্ডিয়া নাচের যে উৎসব হবে, তাতে অহিন্দুদের অংশ নিতে দেওয়া হবে না। এতে হিন্দুধর্মের পবিত্রতা নষ্ট হবে। ভিএইচপির যুগ্ম সম্পাদক ও মুখপাত্র শ্রীরাজ নায়ার কদিন আগে এই ফরমান জারি করে বলেছেন, গরবা ও ডান্ডিয়া সম্পূর্ণভাবে হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে কোনো অহিন্দুকে অংশ নিতে দেওয়া হবে না। উৎসব প্রাঙ্গণে অহিন্দুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের ঢুকতেও দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, এটা শুধু নাচগানের অনুষ্ঠান নয়। এটা এক ধর্মীয় উৎসব। হিন্দু সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা কিছুতেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
নবরাত্রি উপলক্ষে গরবা ও ডান্ডিয়া নাচের অনুষ্ঠানে বিপুল জনসমাগম হয়ে থাকে। হাজার হাজার দর্শক হাজির হয়। সেই দর্শকদের সবাই হিন্দু কি না, কী করে তাদের চেনা যাবে—এ প্রশ্নের উত্তরে শ্রীরাজ নায়ার বলেছিলেন, হিন্দুদের বলা হবে, সবার কপালে যেন লাল বা গেরুয়া তিলক কাটা থাকে। এমনকি দর্শকদের আধার কার্ডও সঙ্গে রাখতে বলা হবে, যাতে সন্দেহ হলেই প্রমাণ দেখানো যায়। ভিএইচপি এই মর্মে সর্বত্র আয়োজকদের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশও পাঠিয়ে দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) ঘনিষ্ঠ ও সংঘ পরিবারের অংশ ভিএইচপির এই ফরমান মহারাষ্ট্রে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। শাসক গোষ্ঠীতেও বিভাজন দেখা দিয়েছে। শুরু হয়েছে সমালোচনা। বিরোধীরা ওই ফরমান অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বলেছে, এতে সমাজের ক্ষতি হবে। বিজেপি নেতা ও রাজ্যের বন্দর উন্নয়নমন্ত্রী নীতেশ রানে প্রকাশ্যে এই ফরমানকে সমর্থন জানিয়েছেন। আবার বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশের স্ত্রী অমৃতা ফাডনবিশ নির্দেশের বিরোধিতা করে বলেছেন, উৎসব সবার। হিন্দু উৎসবে মুসলমান বা মুসলমানদের পরবে হিন্দুরা যোগ দিলে তাতে অন্যায় কিছু নেই। এ দেশে এটাই হয়ে আসছে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারা যদিও ওই যুক্তি মানতে নারাজ। তাঁরা জোর দিয়ে বলছেন, ধর্ম যার যার, উৎসব তার তার।
এই পরিস্থিতিতে মুখ খুললেন বিজেপির শরিক আরপিআই নেতা ও কেন্দ্রীয় সরকারের সামাজিক ন্যায়বিচারমন্ত্রী রামদাস আটওয়ালে। রামদাস মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা। হিন্দুদের উৎসব নিয়ে ভিএইচপির অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই মনোভাব একেবারেই ঠিক নয়। বাবাসাহেব আম্বেদকর যে সংবিধান রচনা করেছেন, তাতে সব ধর্মের মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের কথা বলা আছে। এই দেশে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পারসিসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করেন। এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই এ দেশের শক্তির আধার। ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে তাঁরা সবাই একে অন্যের ধর্মীয় উৎসবে যোগ দেন। সেই অধিকার সংবিধান সবাইকে দিয়েছে।
আটওয়ালে বলেন, মুসলমানরা গরবা–ডান্ডিয়ায় যোগ দিতে পারবেন না, অহিন্দুদের হিন্দু উৎসবে যোগ দেওয়া উচিত নয়—এমন কথা বলা ঠিক নয়। হিন্দু–মুসলমান সবার উচিত একসঙ্গে মিলেমিশে দেশের জন্য কাজ করা। আটওয়ালে এ প্রসঙ্গে মরু শহর রাজস্থানের আজমির শরিফের উল্লেখ করেন। বলেন, ‘সেখানে প্রতিদিন বহু হিন্দু পুণ্যার্থী যান। ভারত এমন এক দেশ, যেখানে সব ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের উৎসবে অংশ নেন। এর বিরুদ্ধ কোনো অবস্থান নেওয়া হলে আমরা তার বিরোধিতা করব। এমন আচরণ সংবিধানবিরোধী।’
আগামী ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে নবরাত্রি। টানা ৯ দিন ধরে এই উৎসব চলে। এই সময়েই মহারাষ্ট্র–গুজরাটে চলে গরবা ও ডান্ডিয়া নাচগান।