তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

তৃণমূল কংগ্রেসে সংকট, বিজেপির নজরে এখন সংসদীয় দল

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসে ‘ফাটল ধরানোর’ পর বিজেপির নজর এখন ভারতের সংসদে। লোকসভা ও রাজ্যসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল সদস্যদের কীভাবে ও কত দ্রুত ‘সরকারপন্থী’ করে তোলা যায়, দলের শীর্ষ নেতারা এখন সেই চিন্তায় মগ্ন।

সরকার বাঁচানো নয়, বিজেপির তাগিদ সংসদের দুই কক্ষে দুই–তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা আদায় করা, যাতে গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধন বিলগুলো পাস করানো সহজতর হয়। যাতে মহিলা আসন সংরক্ষণ বিল পাস না হওয়ার মতো অবস্থায় সরকারকে পড়তে না হয়।

লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্যসংখ্যা ২৮, রাজ্যসভায় ১৩।

শুধু তৃণমূল কংগ্রেসই নয়, বিজেপির নজর রয়েছে তামিলনাড়ুর সাবেক শাসক দল ডিএমকের ওপরও। লোকসভায় তাদের ২২ জন সদস্য রয়েছেন। দুই–তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার অর্থ লোকসভায় এনডিএকে অন্তত ৩৬২ জনের সমর্থন জোগাড় করতে হবে। ‘মহিলা সংরক্ষণ বিল’ পরাস্ত হয়েছিল, কারণ, নিম্নকক্ষে এনডিএর ঘাটতি ছিল ৭০টি। তৃণমূল কংগ্রেস ও ডিএমকেতে ভাঙন ধরানো গেলে ওই ঘাটতি অনেকটাই কমে যাবে।

বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব ও প্রতিপত্তি দ্রুত কমে যাচ্ছে। এক মাসের মধ্যে পরিষদীয় দলে এমন ভাঙন ধরবে, তা ভাবা যায়নি। বিজেপি অবশ্যই সে কারণে উৎফুল্ল। তাদের খুশি হওয়ার আরও এক কারণ, তৃণমূল ভেঙে সরকারকে অস্থিতিশীল করার কোনো চাপ নেই বলে। মহারাষ্ট্রে সরকার গড়তে যে দায় ছিল, পশ্চিমবঙ্গে সেই তাগিদ নেই। তারা খুশি প্রথমত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হীনবল করা গেছে। দ্বিতীয়ত, তৃণমূলকে ‘চোরের দল’ বলে প্রতিপন্ন করতে পেরেছে। তৃতীয়ত, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘ভিলেন’ বানানো গেছে। চতুর্থত, তৃণমূল পরিষদীয় দলে ভাঙন ধরিয়ে এক ‘অনুগত বিরোধী পক্ষ’ সৃষ্টি করতে পেরেছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আমলে জাতীয় পার্টি যেভাবে ‘সরকারি বিরোধী পক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত ছিল, বিজেপি মনে করছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গড়ে তোলা নতুন তৃণমূল দলকে সেভাবেই পরিচালিত করতে পারবে। অর্থাৎ সরকার তাদের, বিরোধীরাও তাদের।

রাজ্যে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা না থাকলেও কেন্দ্রে বিজেপির পরিস্থিতি ভিন্ন। তারা চাইছে, পরিষদীয় দলের মতো তৃণমূল সংসদীয় দলেও বিভাজন সৃষ্টি হোক। লোকসভার ভোট হতে এখনো তিন বছর বাকি। তার আগে বিজেপি চায় ‘এক দেশ এক ভোট’ ও পাস না হওয়া ‘মহিলা আসন সংরক্ষণ বিলটি’ নতুন আকারে নিয়ে আসতে। যেকোনো সংবিধান সংশোধন বিল পাস করাতে গেলে দুই–তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা প্রয়োজন। লোকসভা ও রাজ্যসভা কোনো কক্ষেই বিজেপি ও এনডিএর তা নেই। বিরোধীরা জোটবদ্ধ থাকলে তা পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। মহিলা আসন সংরক্ষণ বিলের মুখ থুবড়ে পড়া তারই প্রমাণ। তৃণমূলে ভাঙন ধরানো গেলে এবং হতমান ডিএমকের সমর্থন আদায় করা গেলে সেই ফারাক অনেকটাই কমে যাবে।

তৃণমূল সংসদীয় দলে ভাঙন ধরাতে বিজেপি তাই আগ্রহী। এমন নয় যে দলত্যাগ করে তাদের বিজেপিতে যোগ দিতে হবে। বিরোধী পক্ষে অবস্থান করে সরকারের ‘সমর্থক’ হলেও চলবে। তা ছাড়া তৃণমূলত্যাগীদের বিজেপি যাতে দলে আশ্রয় না দেয়, সে জন্য জনতার প্রবল চাপও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় এ নিয়ে নিরন্তর প্রচার চলছে।

তৃণমূল কংগ্রেস ও ডিএমকের দুর্বল হওয়া ইন্ডিয়া জোটের ওপরও প্রভাব ফেলবে। সেটাও বিজেপির সন্তুষ্টির একটা বড় কারণ। হীনবল ও হতমান মমতা এখন ‘ইন্ডিয়া’ জোটে প্রাসঙ্গিক হতে চাইছেন। সেই কারণে এত দিন গুরুত্ব না দেওয়া জোটকে হারের পর দিন থেকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছেন। ৮ জুনের সম্মেলনে হাজির থাকার কথা বারবার জানাচ্ছেন। ডিএমকে নেতা এম কে স্ট্যালিন অবশ্য ‘ইন্ডিয়া’ নিয়ে এখনই তেমন একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ৮ তারিখের সম্মেলনে আসছেনও না। বিজেপি এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাইছে। চাইছে যদি স্ট্যালিনকে কাছাকাছি আনা যায়। স্ট্যালিন কী করবেন, এখনো কোনো ইঙ্গিত দেননি। তবে সংসদের আসন বাড়িয়ে মহিলা সংরক্ষণ ও ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতিকে সমর্থন করা তাঁর পক্ষে কঠিন। বিশেষ করে যখন রাজ্যের শাসক দল টিভিকে যখন বিজেপি-বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছে।

তৃণমূল পরিষদীয় দলে ভাঙন ধরানোর নেতৃত্ব দিয়েছেন ঋতব্রত। সংসদীয় দলে কে সেই ভূমিকা নেবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তৃণমূলের সংখ্যালঘুসহ বেশ কিছু সংসদ সদস্য ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু ‘ইন্ডিয়া’র স্বার্থে কংগ্রেস এখনই দলত্যাগীদের উৎসাহ দিতে চায় না। তৃণমূলের সংসদীয় দলে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন কাকলি ঘোষদস্তিদার। তাঁকে কেন্দ্র করে সংসদীয় দল ভাঙে কি না, এখনো স্পষ্ট নয়।