বিক্ষোভের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর উচ্ছ্বসিত ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকেরা। নয়াদিল্লি, ভারত, ২৫ জুলাই
বিক্ষোভের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর উচ্ছ্বসিত ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকেরা। নয়াদিল্লি, ভারত, ২৫ জুলাই

‘ককরোচ’ আন্দোলনে কটূক্তিকারীদের পথভ্রষ্ট বলছেন মোদি, জবাবে কী বলছেন শিক্ষার্থীরা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, গত মাসে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের সময় তাঁর উদ্দেশে কটূক্তি করা শিক্ষার্থীদের তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাঁদের ‘বিভ্রান্ত সন্তান’ আখ্যা দিয়ে মোদি বলেন, শাস্তি নয়, তাঁদের ‘সঠিক পথ’ দেখানো উচিত।

মোদির তৃতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয় তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। গত মে মাসে গুরুত্বপূর্ণ এক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা বাতিল করা হয়। এতে ২০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীকে পরের মাসে আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শুরু হয় সিজেপির আন্দোলন, যা পরে দেশজুড়ে গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণ ও আন্দোলনকারীদের ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করার পর বিক্ষোভকারীরা নিজেদের নাম দেন ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’। এ পরিচয় দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ শুরু করেন। মিম বা হাস্যরস, ব্যঙ্গ, বিদ্রূপের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবি ওঠে। পরে নয়াদিল্লিতে কয়েক হাজার মানুষের সমাবেশের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন শহরেও ছড়িয়ে পড়ে এ আন্দোলন।

শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সব দাবি মেনে নেয় মোদি সরকার। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করা হয় এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা না করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।

তবে সে প্রতিশ্রুতির পরও বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যে শত শত আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে আপত্তিকর স্লোগান দিয়েছিলেন।

মোদির কট্টর ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী বিক্ষোভকারীদের, এমনকি কিশোরীদেরও ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ফাঁস করার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

গত শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মোদি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এরা পথভ্রষ্ট সন্তান। তাদের সঠিক পথ দেখানো আমাদের দায়িত্ব। শাস্তি দেওয়া, আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘোরানো বা সমাজে হয়রানি করে পরিস্থিতির পরিবর্তন আনা যাবে না।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, বিক্ষোভের সময় তাঁর ও তাঁর প্রয়াত মায়ের উদ্দেশে জঘন্য ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মেয়েরা কীভাবে এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারে, তা আমাদের সংস্কৃতির জন্য একটি বড় ধাক্কা।...আমি তাদের ক্ষমা করে দিতে চাই।’

গত মাসে আন্দোলন চলাকালে নয়াদিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। সংসদের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করলে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ছররা গুলি ছোড়ার পাশাপাশি লাঠিপেটা করে পুলিশ।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাধিকা কুমার আল–জাজিরাকে বলেন, ‘রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো দমন–পীড়ন নিয়ে মোদি নীরব। অথচ ইনস্টাগ্রামে এসে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরছেন। বছরের পর বছর এই সরকারের সমর্থকেরা অনলাইনে নারীদের গালিগালাজ করেছে, ভয় দেখিয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রী নৈতিকতার দোহাই দিয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন।’

আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে গত ২৭ জুলাই অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বিভিন্ন রাজ্যে ‘শত শত’ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে।

আন্দোলনের সময় ‘দেশ নয়, চা বিক্রি করুন’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে সিজেপির এক সমর্থক। নয়াদিল্লি, ভারত, ২২ জুলাই

শিক্ষার্থীদের ওপর দমন–পীড়নের ঘটনায় বিরোধী দলগুলো দিল্লির আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে।

বিক্ষোভের পর সরকার সরকারি পরীক্ষাব্যবস্থা–সংক্রান্ত আইন সংশোধনের একটি বিল সংসদে উত্থাপন করেছে। এতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য আরও বেশি শাস্তি এবং বেশি অঙ্কের জরিমানার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত শুক্রবার বলেছেন, ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হায়দরাবাদে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার (মেটা ইন্ডিয়া) প্রধান অরুণ শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে মোদিকে নিয়ে আপত্তিকর ও অবমাননাকর একাধিক ভিডিও পোস্ট করার অভিযোগে পুলিশ এ মামলা করেছে।

মেটার এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি এবং বিষয়টির সমাধানে সহযোগিতা করছি।’

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আদালত বা সরকারের নির্দেশে চিহ্নিত বেআইনি কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোকে তিন ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হচ্ছে। আগে এ সময়সীমা ছিল ৩৬ ঘণ্টা।