জনসভায় বক্তৃতা করছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী, বাংলাদেশ ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের জন্য সমালোচিত আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ৭ এপ্রিল ২০২৬, আসাম
জনসভায় বক্তৃতা করছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী, বাংলাদেশ ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের জন্য সমালোচিত আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ৭ এপ্রিল ২০২৬, আসাম

হিমন্ত–গৌরব বাতচিত আসামের ভোটে এবার কতটা প্রভাব ফেলবে, আপার আসাম এবার কোন দিকে

প্রচারের শেষ বেলায় তিক্ততার জোয়ার ভারতের আসাম রাজ্যকে এভাবে প্লাবিত করবে, কেউ কি ভেবেছিল? তুষের আগুনের মতো হিমন্ত বনাম গৌরবের রাজনৈতিক বৈরিতা ধিকিধিকি জ্বলছিল ঠিকই। কিন্তু আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও তাঁর কংগ্রেসি চ্যালেঞ্জার গৌরব গগৈয়ের রেষারেষি হুট করে এমন দাউ দাউ জ্বলে উঠবে, বোঝা যায়নি। সেই বহ্নিশিখা আগামীকাল বিধানসভার ভোটে কার ঘর কতটা পোড়াবে, সেটাই মূল আগ্রহ।

যদিও সাবপ্লট হিসেবে মাথা তুলেছে অন্য এক প্রশ্ন। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় মুখপাত্র পবন খেরা এবারেও কি পারবেন আসাম পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেয়ে সম্ভাব্য জেলযাত্রা ঠেকাতে?

রেষারেষির প্রসঙ্গটা অল্প কথায় একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। হিমন্ত বেশ কিছুদিন ধরেই গৌরব ও তাঁর স্ত্রী এলিজাবেথ ক্লেয়ার গগৈয়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সংস্রবের অভিযোগে মুখর। ‘লিড পাকিস্তান’ নামের পাকিস্তানের এক ‘এনজিও’, যারা জলবায়ু আন্দোলন নিয়ে কাজ করে, তার প্রধান আলী তওকির শেখের সঙ্গে এলিজাবেথের নাকি খুব দহরম। সেই সুবাদে এলিজাবেথ নাকি পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তের এই অভিযোগের পর আসাম পুলিশ তওকির শেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে এফআইআর দাখিল করে। গৌরবকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করতে হিমন্ত এ কথাগুলো ভোটের প্রচারে বলে চলছিলেন।

গৌরব যদিও বারবার বলেছেন, প্রতিটি অভিযোগই অসাড় ও কাল্পনিক। হিমন্ত ও গৌরবের এই আকচা–আকচি, ক্রমেই যা বিজেপি ও কংগ্রেসের তীব্র রেষারেষিতে পরিণত, তাতে ঘৃতাহুতি দেন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় মুখপাত্র পবন খেরা।

আসামের কংগ্রেস রাজ্য সভাপতি গৌরব গগৈয়

দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে তিন দিন আগে পবন বলেন, হিমন্তের স্ত্রী রিনিকি ভূইয়া শর্মার নামে তিনটি দেশে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল। দেশ তিনটি হলো মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অ্যান্টিগা ও বারমুডা। পবন খেরা ওখানেই থামেননি। তাঁর অভিযোগ, হিমন্ত পরিবার ৫২ হাজার কোটি রুপির ব্যবসাও আড়াল করেছে।

সব গাছ ছাড়িয়ে তালগাছের আকাশে উঁকি মারার মতোই ভোটবাজারে সব ইস্যু ছাপিয়ে এই আকচা–আকচিই আসামে গমগম করছে। পবন খেরার বিরুদ্ধে রাতারাতি এফআইআর করেন রিনিকি। সঙ্গে সঙ্গে সব কাজ ফেলে খেরাকে ধরতে দিল্লি চলে আসে আসাম পুলিশের একটি দল। গত মঙ্গলবার দিল্লিতে খেরার বাড়ি ঘিরে তারা তল্লাশি চালায়। তাদের সহযোগিতা করে দিল্লি পুলিশ। খেরাকে যদিও বাড়িতে পাওয়া যায়নি। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বলেছেন, খেরা হায়দরাবাদে গা ঢাকা দিয়েছেন। ধরা তাঁকে হবেই।

পবন খেরার সঙ্গে হিমন্তের ‘শত্রুতা’ নতুন নয়। ২০২৩ সালেও দিল্লি বিমানবন্দরে রায়পুরগামী বিমান থেকে খেরাকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করেছিল আসাম পুলিশ। অভিযোগ ছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাবার নাম নিয়ে খেরা বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এভাবে তিনি সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাইছেন। খেরার বিরুদ্ধে আসামের হাফলংয়ে সেই অভিযোগে মামলা হয়েছিল। এফআইআর করা হয় আরও রাজ্যে। খেরা অবশ্য সেদিনই সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পেয়েছিলেন।

আগামীকাল বৃহস্পতিবারের ভোটের আগে আসামে উত্তেজনার খই ফুটছে এসব নিয়েই। গতবারের চেয়ে এবার আরও বেশি আসনে দলের জয় নিয়ে ‘নিশ্চিত’ হিমন্তের হাবভাব বোঝাচ্ছে, নতুন সরকার গড়ে প্রথমেই তিনি এই ‘কাদা–ছোড়াছুড়ির’ হেস্তনেস্ত করবেন। ওটাই তাঁর ‘প্রায়োরিটি’।

জয় কি অতটা সহজ হবে

রাজ্য বিধানসভার ১২৬ আসনের মধ্যে গতবার বিজেপি জিতেছিল ৬০ আসনে, তাদের জোট পেয়েছিল আরও ১৫টি। তুলনায় কংগ্রেস (২৯) ও তাদের মহাজোট জিতেছিল ৫০টি আসন।

হিমন্তের ঘোষণা, এবার তাঁরা ৯০ আসন ছেঁকে তুলবেন। সে জন্য চেষ্টার অন্ত রাখেননি। মুসলিমদের কোণঠাসা করার যাবতীয় চেষ্টার পাশাপাশি কংগ্রেস ভাঙিয়ে তিনি দলে এনেছেন প্রদ্যুত বরদলুই, ভূপেন বরা, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, শশীকান্ত দাস, বসন্ত দাসদের মতো প্রথম শ্রেণির নেতাদের।

বিজেপির টিকিটও পেয়েছেন ৩০ জন দলবদল করা নেতা, যাঁদের অধিকাংশই সাবেক কংগ্রেসি। এ নিয়ে রাজ্যে আদি ও নব্য বিজেপির মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। তাতে কী। হিমন্ত নিজের শক্তিতে বলীয়ান। ধর্মীয় মেরুকরণ তাঁর প্রধান অস্ত্র।

বারবার প্রচারে এসে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরাও হুংকার দিয়েছেন, আসামকে তাঁরা পুরোপুরি বাংলাদেশি ‘ঘুষপেটিয়ামুক্ত’ করে তুলবেন। আসামের ভোট বরাবরই ‘আলী–কুলি–বাঙালির’। চিরকালীন গুরুত্ব এই তিন সম্প্রদায়ের। আলী মানে মুসলিম। জনসংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ। কুলি মানে বিস্তীর্ণ চা–বাগানের শ্রমিকেরা। তাঁরাও সংখ্যায় প্রায় ২০ শতাংশ। আর রয়েছে হিন্দু বাঙালি। বহু বছর এই তিন সম্প্রদায়ই ছিল কংগ্রেসের বড় ভরসা। তিন ঘরে সিঁধ কেটে কংগ্রেসকে ডুবিয়ে সাবেক কংগ্রেসি হিমন্ত বিজেপিকে এতটাই ভাসিয়ে রেখেছেন যে গোটা উত্তর–পূর্বাঞ্চলে তিনিই এক, অদ্বিতীয় ও অজেয়।

হিমন্তের ছকে দেওয়া পরিকল্পনাতেই নির্বাচন কমিশন এবার আসামে ‘এসআইআর’ করায়নি। যুক্তি হলো, ওই রাজ্যে এনআরসি আগেই করা হয়েছিল। এবার তাই করা হয়েছে ভোটার তালিকার স্রেফ বিশেষ সংশোধন। যথারীতি তাতে বাদ পড়েছেন মুসলিমরাই।

অস্বস্তির খচখচে কাঁটা আপার আসাম ও জুবিন

আসামে ভোটের দায়িত্ব কংগ্রেস এবার তুলে দিয়েছে প্রিয়াঙ্কার হাতে। প্রচারে তিনি ও তাঁর বড় ভাই রাহুল বারবার টেনে এনেছেন অহমিয়াদের নয়নের মণি ও অস্মিতার প্রতীক অকালপ্রয়াত গায়ক–নায়ক জুবিন গর্গকে। কংগ্রেসের ইশতেহারে লেখা হয়েছে, ক্ষমতায় এলে লোক দেখানো নয়, ‘নিরপেক্ষ’ তদন্তের মধ্য দিয়ে ১০০ দিনের মধ্যে উদ্‌ঘাটন করা হবে জুবিনের মৃত্যুরহস্য।

বিজেপির ‘ভ্রান্ত’ নীতির সমালোচনায় জুবিন মুখর ছিলেন। সিএএ, এনআরসির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন। সিঙ্গাপুরে মৃত্যুর সময় সেখানে বিজেপি–ঘনিষ্ঠদের উপস্থিতি নিয়ে অনেক কথা উঠেছে।

শাসক দলের কাছে জুবিন–কাঁটা অবশ্যই খচখচে। এই প্রথম আসাম নববর্ষে জুবিনহীন বোহাগ বা রঙালি বিহু উদ্‌যাপিত হবে। ভোট হচ্ছে, তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে।

জুবিনের ছায়ায় ‘জেন–জি’ প্রজন্মের তরুণদেরও কাছে টানতে চাইছে কংগ্রেস। ৭৩ লাখ ‘জেন–জি’ ভোটারের সমর্থন পাওয়া কম কথা নয়।

রাজ্যের যে এলাকাকে বিজেপি নিজেদের ঘর মনে করে, সেই আপার আসাম বা উত্তর আসাম এবার হিমন্তের বলিরেখা গাঢ় করে তুলতে পারে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে যোরহাট থেকে গৌরবের জয় (দেড় লাখ ভোটের ব্যবধানে) সেই উদ্বেগের কারণ। সেই ভোটে ১০টির মধ্যে ৯টি বিধানসভায় কংগ্রেস এগিয়েছিল।

গৌরবকে এবার কংগ্রেস সেখান থেকে বিধানসভায় প্রার্থী করেছে। ইঙ্গিত স্পষ্ট, সরকার গড়লে লোকসভার ডেপুটি লিডার গৌরবই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। গৌরবের স্ত্রীকে পাকিস্তানি এজেন্টের তকমা দেওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ এ থেকেই স্পষ্ট। হিমন্ত চান না, তাঁর কুসুমকমল পথে কাঁটা বিছানোর মতো কেউ থাকুন।

আপার আসামই রাজ্যের নার্ভ সেন্টার ও অর্থনৈতিক রাজধানী। গোপীনাথ বরদলুই, বিমল চালিহা, হিতেশ্বর শইকিয়া, তরুণ গগৈয়ের মতো কংগ্রেস নেতারা আপার আসামেরই ভূমিপুত্র ও অহম জাত্যভিমানের ধারক। তেলের খনি কিংবা চা–বাগানের উপস্থিতিও এই তল্লাটে।

অহম রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল ওখানেই। শিবসাগর, যোরহাট, তিনসুকিয়া, ডিব্রুগড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় গৌরব সেই অহম জাত্যভিমান জাগানোর স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন। রাজ্যের ১২৬ আসনের মধ্যে এখানেই রয়েছে ৪১টি। তার মধ্যে গতবার বিরোধীরা পেয়েছিল মাত্র ৪টি। এবারও তার পুনরাবৃত্তি করতে মরিয়া হয়ে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছেন হিমন্ত। গৌরব অবতীর্ণ তাঁর সেই পাকা ধানে মই দিতে। টক্করটা তাই জমে গেছে।

কংগ্রেস এবার ১০১ আসনে লড়ছে। নতুনভাবে তারা জোট বেঁধেছে সিএএ–বিরোধী আন্দোলনের পুরোধায় থাকা অসম জাতীয় পরিষদ (এজেপি) অখিল গগৈয়ের রাইজর দলের সঙ্গে। জোটে রয়েছে অল পার্টি হিল লিডার্স কনফারেন্স ও বামপন্থীরাও। ২৫ আসন এদের জন্যই ছাড়া। বিজেপিকে হারাতে কংগ্রেস এবার ত্যাগ করেছে বদরুদ্দিন আজমলের দল এআইইউডিএফকে। কংগ্রেসের কাছে তারা বিজেপির ‘বি’ টিম।

এবং অনগ্রসর ও তফসিলেরা

কংগ্রেসের ইশতেহারে বড় করে জায়গা পেয়েছে রাজ্যের ৬ অন্য অনগ্রসর জাতি বা ওবিসি সমাজ। বহু বছর ধরে তারা তফসিল উপজাতির মর্যাদা চেয়ে আসছে, কিন্তু পাচ্ছে না। তাই–অহম, মোরান, মটক, চুতিয়া, কোচ–রাজবংশী ও চা উপজাতি/আদিবাসীদের সেই মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কংগ্রেস এবার তাদের ইশতেহারে দিয়েছে। এরা প্রায় সবাই আপার আসাম ও ব্রহ্মপুত্রের উত্তর পারের বাসিন্দা।

এই ৬ ওবিসির দাবি, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এত বছরেও মানেনি। বিপদ বুঝে হিমন্তও তাদের মন জিততে ইশতেহারে ‘বিবেচনার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। হিমন্ত ও গৌরব দুজনেই কানছোঁয়া হাসি হাসতে চেয়ে রয়েছেন আপার আসামের দিকে। তাঁদের ভাসানো–ডোবানোর চাবিকাঠি ওখানেই। কাল ভোট হলেও ফল প্রকাশ ৪ মে।