ভারতের অনুষ্ঠিত এআই সম্মেলনে খালি গায়ে যুব কংগ্রেসের কর্মীদের বিক্ষোভ
ভারতের অনুষ্ঠিত এআই সম্মেলনে খালি গায়ে যুব কংগ্রেসের কর্মীদের বিক্ষোভ

এআই সম্মেলনে খালি গায়ে বিক্ষোভ, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমেছে বিজেপি

সদ্য সমাপ্ত আন্তর্জাতিক এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সম্মেলনে ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের মুখ পুড়েছিল। দেশের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চীনের তৈরি রোবট কুকুর নিজেদের আবিষ্কার বলে দাবি করে সম্মেলন থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল। সেই আন্তর্জাতিক বিড়ম্বনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি এবং ‘এপস্টিন’ ফাইল ঘিরে গড়ে ওঠা বিতর্ক আড়াল করতেই কি বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারপ্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কোমর কষে নেমেছে? প্রশ্নটি উঠেছে, কারণ, ওই সম্মেলনস্থলে খালি শরীরে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য যুব কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ যেসব অভিযোগ এনেছে, তা থেকে আশু মুক্তিলাভ কঠিন হতে পারে।

ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জামিন না দিয়ে পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন পাটিয়ালা হাউস (নিম্ন) আদালত। দীর্ঘ জেরার পর গত মঙ্গলবার সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেস সভাপতি উদয়ভাণু চিবকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের দাবি, সম্মেলনস্থলে খালি গায়ে বিক্ষোভ দেখানোর ছক তাঁরই কষা।

ওই বিক্ষোভ দেখানোর অভিযোগে মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা বাধানোর চক্রান্তসহ এমন সব অভিযোগ আনা হয়েছে, যাতে স্পষ্ট—খুব সহজে মুক্তি পাওয়া কঠিন। যেমন দিল্লি পুলিশ বলেছে, আন্দোলনকারীরা বৃহত্তর চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা নেপালের ‘জেন–জি’ দ্বারা অনুপ্রাণিত। লাদাখের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুককে গ্রেপ্তারের সময়েও এ ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। আপাতত তিনি ‘ইউএপিএ’ আইনে বন্দী। এই আইনে বিনা বিচারে এক বছর বন্দী করে রাখা যায়।

এআই সম্মেলনে দেখানো বিক্ষোভকে বিজেপি ‘বিশ্বের কাছে দেশের সম্মানহানির জন্য কংগ্রেসের রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বলে প্রচার শুরু করে দিয়েছে। কোনো কোনো নেতা এ কথাও বলছেন, মূল চক্রী লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী স্বয়ং। তাঁরা ওই ঘটনাকে দেশদ্রোহিতার সমতুল্য বলেও প্রচার করছেন। যদিও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এখনো দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুব কংগ্রেসের বিক্ষোভ ‘ন্যক্কারজনক’ ও ‘নির্লজ্জতার নিকৃষ্টতম উদাহরণ’ বলে জানিয়েছেন, ওই ঘটনা পৃথিবীর কাছে দেশের মাথা হেঁট করে দেওয়ার অপচেষ্টা। কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘গোটা দেশ জানে আপনারা নগ্ন। নতুন করে জামা খোলার তাই দরকারই ছিল না।’

রাহুল যদিও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যুব কংগ্রেসের বিক্ষোভকারীদের ‘বব্বর শের’ (ভয়ংকর সাহসী সিংহ) অভিহিত করে বলেছেন, ‘তাঁদের জন্য আমি গর্বিত। নির্ভয়ে তাঁরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন সেই প্রধানমন্ত্রীর কৃতকর্মের বিরুদ্ধে, যিনি আমেরিকার কাছে দেশকে বিক্রি করে দিয়েছেন। দেশের কৃষকদের স্বার্থ বিলিয়ে দিয়েছেন।’ যুব কংগ্রেসিদের পাশে দাঁড়িয়ে এক্স হ্যান্ডলে রাহুল লিখেছেন, শাসকের কাছে সত্যের আয়না ধরা কোনো অপরাধ নয়। এটাই দেশপ্রেম।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘ন্যক্কারজনক ও লজ্জাজনক’ মন্তব্যের জবাব দিতেও রাহুল দেরি করেননি। এক্স হ্যান্ডলে তিনি বলেন, ‘লজ্জাজনক সেটাই, যেটা আপনি করেছেন। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি। দেশকে বিক্রি করে দিয়েছেন। এমন এক চুক্তি করেছেন, যা দেশকে কিছুই দিতে পারেনি। আপনি আমাদের কৃষকদের শেষ করে দিয়েছেন। সব তথ্য (ডেটা) বেচে দিয়েছেন। বয়নশিল্পকে শেষ করে দিয়েছেন। এটাই লজ্জার।’

রাহুল ‘লজ্জার’ আরও নিদর্শন দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এপস্টিনের মতো এক যৌন অপরাধীর ফাইলে আপনার নাম রয়েছে। আপনার মন্ত্রী ও আপনার ঘনিষ্ঠ শিল্পপতির নাম রয়েছে। গাদা গাদা ই–মেইল রয়েছে।’ সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরবনের লেখা অপ্রকাশিত বইয়ের উল্লেখ করে রাহুল বলেন, ‘ওই কারণে যে আপনি সংসদে হাজিরা দেননি, তা নয়। আসল কারণ এপস্টিন ফাইল ও আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা। গোটা দেশ জানে, ওই মামলা আদানির বিরুদ্ধে নয়, মামলা বিজেপি ও আপনার অর্থনৈতিক স্থপতির বিরুদ্ধে। এটাই তৃতীয় লজ্জাজনক বিষয়।’

ঘটনা হলো, দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সহজে ছাড়তে নারাজ। এআই সম্মেলনে যুব কংগ্রেসের নেতারা মোদির ছবি ছাপানো টি–শার্ট পরে গিয়েছিলেন। সেই টি–শার্ট কোথায় তৈরি, দিল্লি পুলিশ সেটাও তদন্তের আওতায় এনেছে।

বিজেপি বিষয়টি নিয়ে গোটা দেশে রাজনৈতিক প্রচার শুরু করে দিয়েছে। নরবনের আত্মজীবনী, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি, এপস্টিন ফাইল নিয়ে বিরোধী প্রচারের তীব্রতা চাপা দিতে এই বিক্ষোভই এখন তাদের হাতিয়ার। তৃণমূল কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির মতো বিরোধী দল কংগ্রেসের ওই বিক্ষোভকে নিন্দা করায় বিজেপির পক্ষে আক্রমণাত্মক হওয়া সহজতর হয়েছে।