বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের এয়ার ইন্ডিয়ার এআই২০৩০ উড়োজাহাজটি বুধবার ভারতের রাজস্থানের জয়পুরের বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে
বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের এয়ার ইন্ডিয়ার এআই২০৩০ উড়োজাহাজটি বুধবার ভারতের রাজস্থানের জয়পুরের বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে

‘ছিনতাই’ সন্দেহে দিল্লির বদলে জয়পুরে নামল উড়োজাহাজটি, এরপর যা হলো

এয়ার ইন্ডিয়ার একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ভারতের দিল্লি আসছিল। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। ভারতের আকাশসীমায় আসার পর হঠাৎ পাইলট ঘোষণা দেন, ‘নিরাপত্তার কারণে’ উড়োজাহাজটি নির্ধারিত সময়ে দিল্লিতে অবতরণ করবে না। অন্য একটি শহরে জরুরি অবতরণ করবে। এতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এ ঘটনা ঘটেছে গতকাল বুধবার সকালে। পরবর্তী সময়ে ভারতের রাজস্থানের জয়পুরের বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটি জরুরি অবতরণ করানো হয়। বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের এয়ার ইন্ডিয়ার এআই২০৩০ উড়োজাহাজটিতে ২৯৩ জন যাত্রী ও ১৩ জন ক্রু ছিলেন।

যাত্রীরা জানান, তখন সকাল সোয়া ৯টা। হঠাৎ করে পাইলট জানান, দিল্লিতে অবতরণের কথা থাকলেও উড়োজাহাজটি জয়পুরে অবতরণ করবে। যদিও পরে সেটি দিল্লিতে ফেরে। বেলা ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে উড়োজাহাজটি দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ৩-এ অবতরণ করে।

জয়পুরে নিরাপত্তা তল্লাশি

উড়োজাহাজটিতে যাত্রী ছিলেন ৪০ বছর বয়সী গুরজিৎ সিং খালসা। ভারতীয় বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিক তিনি। এ বিষয়ে গুরজিৎ বলেন, সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ উড়োজাহাজটি জয়পুরে অবতরণ করে। এর আগে ঘণ্টা দুয়েক যাত্রীদের উড়োজাহাজটির ভেতরেই কাটাতে হয়।

গুরজিৎ হিন্দুস্তান টাইমসকে আরও বলেন, ‘জয়পুরে নামার পর আমাদের বলা হয়, নিরাপত্তা তল্লাশি করা হবে। বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ক্যাপ্টেন আমাদের উড়োজাহাজ থেকে নেমে আসতে বলেন। নামার পর দেখি, অনেক নিরাপত্তাকর্মী। তখন তাঁরা আমাদের পাসপোর্ট দেখাতে বলেন।’

অভিযোগ জানিয়ে গুরজিৎ বলেন, নামের কারণে তাঁকে বাড়তি তল্লাশি মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার নামের কারণে আমাকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। তাই এ ঘটনা আমার কাছে নতুন কিছু নয়।’

ওই সময় নিরাপত্তাকর্মীরা সব যাত্রীকে অপেক্ষা করতে বলেন। তাঁদের লাগেজ স্ক্যান করা হয়। ঘণ্টা দুয়েক অপেক্ষা করার পর যাত্রীরা আবার উড়োজাহাজে ওঠেন। এরপর সেটি দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়, জানান গুরজিৎ।

গুরজিৎ বলেন, জয়পুরের একজন কর্মকর্তা তাঁকে জানিয়েছেন, সেখানে ‘বোমার হুমকির মতো পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছিল।

‘ভেবেছিলাম ইঞ্জিন বিকল হয়েছে’

এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজটিতে ছিলেন ২৫ বছরের জানিস। মেডিক্যাল শিক্ষার্থী তিনি। সঙ্গীর সঙ্গে ছুটি কাটাতে দিল্লি যাচ্ছিলেন এ তরুণ। বলেন, উড়োজাহাজটি নেমে আসার সময় ক্রুরা গন্তব্য পরিবর্তনের কথা জানান।

হিন্দুস্তান টাইমসকে জানিস বলেন, উড়োজাহাজটি নিচে নামার সময় ক্রুরা জানান, নিরাপত্তার কারণে এটি জয়পুরে নেওয়া হচ্ছে।

জানিস আরও বলেন, ‘অবতরণের পর আমরা যখন উড়োজাহাজ থেকে নামলাম, তখন অনেক অগ্নিনির্বাপণকর্মী দেখতে পাই। মনে হয়েছিল, হয়তো উড়োজাহাজের ইঞ্জিনে কোনো সমস্যা হয়েছে। পরে অন্য ধরনের পোশাক পরা লোকজন দেখে মনে হলো, সত্যিই হয়তো কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’

জানিসের সঙ্গীর মা তাঁদের কাছে একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠান। ভিডিওতে, উড়োজাহাজটি ‘ছিনতাই’ হওয়ার খবর ছিল। এ খবর দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। জানিস বলেন, ‘তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। আমরা তাঁকে জানাই, আমরা ভালো আছি। এরপর সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা পেশাদারত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি সামলেছেন।’

উড়োজাহাজ থেকেই ‘ছিনতাইয়ের’ সংকেত

সংশ্লিষ্টরা জানান, উড়োজাহাজটি ট্রান্সপন্ডারে ৭৫০০ সংকেত পাঠাচ্ছিল। ছিনতাই বা বেআইনি হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এ সংকেত ব্যবহার করা হয়। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সংকেতটি পাওয়ার পর উড়োজাহাজটির মুখ জয়পুরের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়।

কী কারণে ‘৭৫০০’ সংকেত পাঠানো হয়েছিল, সেটা তদন্ত করবে ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তর (ডিজিসিএ)। ধারণা করা হচ্ছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে সমস্যাটি উড়োজাহাজে নাকি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থায় ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বোমার হুমকি নিয়ে গুজব

জার্মানিতে থাকেন সুনীতা রানি। বয়স ৪৩ বছর। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজটিতে দিল্লিতে আসছিলেন তিনি। বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে ঝামেলার বিষয়টি ক্রুরা যাত্রীদের বিশদ জানাননি। তবে আতঙ্কিত হতে মানা করেছিলেন।

হিন্দুস্তান টাইমসকে সুনীতা বলেন, ‘যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ুক—ক্রুরা হয়তো তা চাননি। পরে শুনেছি, বোমার হুমকি নিয়ে গুজব ছড়িয়েছিল। আমাদের শুধু বলা হয়েছিল, নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য জয়পুরে অবতরণ করতে হবে। এর বাইরে আর কিছু জানানো হয়নি।’

যা বলল এয়ার ইন্ডিয়া

এয়ার ইন্ডিয়া এ ঘটনা নিয়ে গতকাল একটি বিবৃতি দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে দিল্লিগামী উড়োজাহাজটি জয়পুরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে নিরাপদে অবতরণ করে সেটি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জয়পুরে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় তল্লাশি চালিয়ে উড়োজাহাজ ও ক্রুদের নিরাপদ ঘোষণা করে। সব যাত্রী উড়োজাহাজ থেকে নেমে নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে যান। এরপর তাঁরা আবার উড়োজাহাজে উঠে দিল্লিতে যান।