
গেল জানুয়ারিতে ভারতে নজিরবিহীন এক বিক্ষোভ হয়েছে। দেশটির রেসলিং ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ও কোচদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন শীর্ষ পর্যায়ের অ্যাথলেটরা। এ ঘটনা কেন ভারতীয় ক্রীড়াজগতের জন্য যুগান্তকারী মুহূর্ত এবং সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা নিয়ে বিবিসিতে প্রতিবেদন লিখেছেন দিল্লিভিত্তিক সাংবাদিক রুদ্রনীল সেনগুপ্ত।
বিক্ষোভটি শুরু হয়েছিল গত ১৮ জানুয়ারি। সেদিন রাজধানী দিল্লিতে রেসলিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (ডব্লিউএফআই) কার্যালয়ের বাইরে ভারতের তারকাখ্যাত বেশ কয়েকজন কুস্তিগির সমবেত হয়েছিলেন সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে। ভারতের হয়ে অলিম্পিক ও কমনওয়েলথ গেমসে পদক বিজয়ীরাও সেখানে ছিলেন।
দুবারের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ পদক বিজয়ী ভিনেশ ফোগতের অভিযোগের পর বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তত ১০ জন নারী কুস্তিগির তাঁর কাছে ডব্লিউএফআইয়ের সভাপতি ব্রিজ ভূষণ সিংয়ের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে ব্রিজ ভূষণ এসব অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নাকচ করেছেন। গুটিকয় কয়েক ক্রীড়াবিদ ‘অন্য কোনো উদ্দেশ্য’ থেকে এ অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। ব্রিজ ভূষণ ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একজন এমপি।
তবে এর কয়েক দিন পরই ব্রিজ ভূষণকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ফেডারেশনের কার্যক্রম তদারক করতে প্যানেল গঠন করা হয়। পাশে যৌন হয়রানির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
যদিও বিক্ষোভ বন্ধ হয়েছে, তবু সমস্যাটি দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ, কুস্তিগিররা বলছেন, প্যানেল গঠনের আগে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফোগত বলেন, তিনি যৌন নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে ‘বেশি কিছু বলতে’ চান না। তবে তিনি বলেছেন, তাঁরা সঠিক সময়ে বিষয়টি নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের ক্রীড়াবিদদের এই একতা ক্রীড়াঙ্গনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য ক্রমবর্ধমান আন্দোলনকে ইঙ্গিত করে। ক্রীড়া সাংবাদিক শ্রদ্ধা উগরা বলেন, একটি খেলার শীর্ষস্থানীয় সব ক্রীড়াবিদ ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য এক হয়েছেন, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
এক দশকের বেশি সময় ধরে রেসলিং ফেডারেশনের নেতৃত্বে আছেন ব্রিজ ভূষণ। তাঁর বিরুদ্ধে এখনো চারটি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হত্যাচেষ্টার অভিযোগ। ২০২১ সালে তিনি মঞ্চে একজন কুস্তিগিরকে চড় মেরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। পরে তিনি বলেছিলেন, ওই কুস্তিগির একটি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য বয়স জালিয়াতি করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো ক্রীড়াজগতে যৌন নির্যাতনের ব্যাপক অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ভারতের সাবেক আন্তর্জাতিক টেনিস খেলোয়াড় মনীষা মালহোত্রা বলেন, ‘এটা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। আমার কাছে অনেক ক্রীড়াবিদ কোচদের হাতে হয়রানির শিকার হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। কিন্তু তারা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’ তাঁদের অভিযোগ না করার পেছনে নিজেদের খেলোয়াড়ি জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয় কাজ করেছে বলে মনে করেন মনীষা মালহোত্রা। তিনি বেসরকারি কোম্পানি জেএসডব্লিউ স্পোর্টস-এ স্পোর্টস এক্সিলেন্স এবং স্কাউটিংয়ের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটি বেশ কয়েকজন শীর্ষ ভারতীয় ক্রীড়াবিদকে আর্থিক সহায়তা ও কোচিং দেয়।
মনীষা মালহোত্রা মনে করেন, ভারতীয় ক্রীড়াজগতের যা প্রয়োজন, তা হলো ‘এর নিজস্ব #মি টু মুহূর্ত’, যুক্তরাষ্ট্রের জিমন্যাস্টরা যেভাবে ল্যারি নাসারকে নামিয়ে আনতে একত্র হয়েছিলেন, সে রকম কিছু।
যুক্তরাষ্ট্রের জিমন্যাস্ট দলের চিকিৎসক ছিলেন ল্যারি নাসার। তাঁর বিরুদ্ধে ১৫০ জনের বেশি জিমন্যাস্ট যৌন নির্যাতনের সাক্ষ্য দিলে ২০১৮ সালে তাঁকে ১৭৫ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।
কিন্তু ভারতের ক্রীড়াবিদেরা বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তথ্য অধিকার আইনে করা একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জানা যায়, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (এসএআই) পক্ষ থেকে কোচ ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ৪৫টি যৌন অসদাচরণের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। আবেদনকারী ওই সরকারি বিভাগ বিভিন্ন বয়সের সামনের কাতারের ক্রীড়াবিদদের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও ক্যাম্প পরিচালনা করে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচজন কোচের বেতন কাটা হয়েছিল; একজনকে সাময়িক বরখাস্ত করে পরে পুনর্বহাল করা হয়েছিল এবং অন্য দুজনের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছিল। আর বাকি অভিযোগগুলো খারিজ হয়ে যায়।
তবে এখানে কিছু কিছু বিষয়ের পরিবর্তন ঘটছে, সেই লক্ষণ আছে। গত বছর একজন বিখ্যাত ট্র্যাক কোচের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনেছিলেন সাতজন ক্রীড়াবিদ। এরপর সেই কোচকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখন মামলা চলছে।
এ বছর একজন নারী সাইক্লিস্টের করা অভিযোগ তদন্তের পরে তাঁর প্রধান সাইক্লিং কোচকে বরখাস্ত করে এসএআই। এই নারীর অভিযোগ ছিল, ওই কোচ বিদেশে ক্যাম্প চলাকালে তাকে তাঁর (কোচ) সঙ্গে এক ঘরে রাত কাটাতে বাধ্য করেন এবং যৌন সম্পর্ক করেন।
মনীষা মালহোত্রা বলেন, অ্যাথলেটদের সমর্থন জোগাতে ভারতীয় ক্রীড়া ইকোসিস্টেমকে আরও বেশি কিছু করা দরকার। তিনি বলেন, যাঁরা বিভিন্ন ফেডারেশনের নেতৃত্বস্থানে আছেন, তাঁরা পদাধিকারবলে অনেক ক্ষমতাশালী। এটা অ্যাথলেটদের সত্য বলাটাকে কঠিন করে তোলে।
আইনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও ভারতের বেশির ভাগ ক্রীড়া ফেডারেশনেরও যৌন হয়রানির অভিযোগ খতিয়ে দেখার মতো কমিটি নেই। ৫৬টি স্বীকৃত ক্রীড়া সংস্থার মধ্যে ১০টির কম সংস্থার এ ধরনের কমিটি আছে।
২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এসএআইয়ের প্রধান ছিলেন জিজি থমসন। তিনি বলেন, তাঁর মেয়াদে তিনি যৌন হয়রানির অনেক অভিযোগের কথা শুনেছেন। ‘কিন্তু আনুষ্ঠানিক অভিযোগ যাওয়া যায়নি। যখনই আমরা তদন্ত করতে যেতাম, ক্রীড়াবিদেরা পিছিয়ে যেত।’
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য এসএআই কর্তৃপক্ষকে ই–মেইল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেয়নি।
প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ক্রীড়াবিদ, যাঁদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যন্ত এলাকা থেকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এসেছেন, তাঁদের কাছে এসএআই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাওয়া তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা গ্লোবাল অবজারভেটরি ফর জেন্ডার ইকুয়ালিটি অ্যান্ড স্পোর্ট-এর সিইও পায়োশনি মিত্র বলেছেন, ‘স্পোর্টস হোস্টেল সিস্টেম অল্প বয়সী মেয়েদের জন্য ভালো সুযোগ। কারণ, তারা যদি বাড়িতে থাকে, তাহলে পরিবার তাদের বিয়ে দিতে পারে।’ তবে অ্যাথলেটরা বলছেন, এখানেও অনেক সমস্যা রয়েছে।
সাবেক একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অ্যাথলেট নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। এসএআই হোস্টেলে এক দশকের বেশি সময় কাটানো ওই অ্যাথলেট বলেন, ন্যাশনাল ক্যাম্পে তাঁকে প্রথম যে জিনিসটি শেখানো হয়েছিল, তা হলো কোচ ও কর্মকর্তারা যা বলবেন, তার ‘সবকিছু মানতে হবে’। তখন তাঁর বয়স ছিল ১০ বছরের মতো। তিনি বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই তাঁদের ভয় করতে শিখেছি। আমি দেখেছি যখন যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন বা মানসিক নির্যাতন হয়, তখন কী হয়। আপনি যদি এটি বন্ধ করতে চান, তবে কথা বলতে হবে। কিন্তু সবাই আপনাকে বলবে, তোমার ক্রীড়াজীবনের ভবিষ্যৎ আছে। হয় তুমি এটা চালিয়ে যাও, অথবা লড়াইয়ে নেমে সবকিছু হারাতে পারো। এ ঝুঁকি কে নিতে চায়?’