
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ক্রমেই চাপ বাড়িয়ে চলেছে বিরোধীরা। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করার পর এবার বিরোধীদের নিশানা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার। ‘ইমপিচমেন্ট’ বা অভিশংসনের মাধ্যমে তাঁকে পদ থেকে সরাতে সংসদের উভয় কক্ষেই নোটিশ জমা দিয়েছে বিরোধী দলগুলো। গত শুক্রবার লোকসভা ও রাজ্যসভায় ওই নোটিশ জমা দেওয়া হয়।
সংসদীয় ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবিতে অভিশংসন নোটিশ পেশ করা হলো। সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের অপসারণে যে অভিশংসন প্রক্রিয়া রয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনের অন্য দুই সদস্যকে অপসারণ করতে হলে সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হবে।
সংবাদমাধ্যম পিটিআই বিরোধী সূত্র উল্লেখ করে জানিয়েছে, ওই নোটিশে লোকসভার ১৩০ ও রাজ্যসভার ৬৩ জন বিরোধী সদস্য মিলে মোট ১৯৩ জন সই করেছেন। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’–এর সব দলের সদস্য ছাড়াও জোটের বাইরে থাকা আম আদমি পার্টি (আপ) ওই নোটিশে সই করেছে। সই করেছেন বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র সদস্যও।
নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের অভিশংসন প্রস্তাব পেশ করতে হলে লোকসভার ১০০ ও রাজ্যসভার ৫০ সদস্যের সম্মতি দরকার। নোটিশে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মোট সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে। সবচেয়ে বড় ও মূল অভিযোগ এক বিশেষ রাজনৈতিক দলের (বিজেপি) হয়ে পক্ষপাতিত্বের। এ ছাড়া যেভাবে তাঁর নির্দেশে প্রথমে বিহার ও পরে অন্যান্য রাজ্যে ভোটের প্রাক্কালে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন করা হচ্ছে, বিরোধীরা তা বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্বাচনী জালিয়াতির তদন্তে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাদান এবং ব্যাপক হারে ভোটাধিকার বঞ্চিত করার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিরোধীদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের ভোটদানের অধিকার দেওয়া। তা না করে জ্ঞানেশ কুমার বিজেপির সুবিধা করে দিতে যথাসম্ভব মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছেন। জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে অভিশংসন নোটিশ জমা দেওয়ার মূল উদ্যোগী তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে তড়িঘড়ি যেভাবে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে হাত দেওয়া হয়েছে, যেভাবে তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে ৬০ লাখ ভোটারকে ‘বিবেচনাধীন’ করে রাখা হয়েছে, সেই কাজে ইসি বেছে বেছে সংখ্যালঘু, দলিত, উপজাতি, অনগ্রসরদের চিহ্নিত করেছে, যাঁরা ঐতিহ্যগতভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক, এর প্রতিবাদে মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি কলকাতায় পাঁচ দিন ধরনায় বসেছিলেন। কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলাও করেছেন তিনি।
অভিশংসন নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে কংগ্রেস। সেই সমর্থনের কারণে লোকসভায় তৃণমূল সদস্যরাও স্পিকার অপসারণের নোটিশে সম্মতি দেন। বিতর্কে অংশও নেন। রাজনৈতিক দিক থেকে এই দুই বিষয় অনেক দিন পর বিরোধীদেরও এককাট্টা করে দিয়েছে। এমনকি এ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র সদস্যদের সমর্থনও বিরোধীরা পাচ্ছেন।
যদিও সেই সমর্থনে ভর দিয়ে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ করা সম্ভব হবে না। নিয়ম অনুযায়ী, বিতর্ক শেষে প্রস্তাব পাস করাতে দুই–তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন। তা সম্ভব নয় জেনেও বিরোধীরা প্রস্তাব এনেছে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য। বিরোধীরা এর মধ্য দিয়ে ইসিবিরোধী জনমত গঠনে সচেষ্ট। পাশাপাশি এই উদ্যোগ বিরোধীদের সবাইকেই এক আসনে বসাতে পেরেছে।
ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি, এপস্টিন ফাইল, ইরানে হামলার পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে বিজেপি ও সরকার এই মুহূর্তে যথেষ্ট চাপে রয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনার কোনো সুযোগই দিতে তারা নারাজ। এরই মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেল ও গ্যাসের সংকট সরকারের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। সিইসিকে অভিশংসনের নোটিশ দিয়ে সেই চাপ আরও বৃদ্ধি করাই লক্ষ্য।