
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা থেকে এক ব্যক্তিকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বুধবার তাঁকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ থানার গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বারিক নামের এক ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার, নথিপত্র বাজেয়াপ্তকরণ এবং পরবর্তী সময়ে রহস্যজনকভাবে গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ এনেছে তাঁর পরিবার। পরিবারের বক্তব্য, কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তাঁকে অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ বা ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এই অভিযোগ তোলা হয়েছে রায়গঞ্জ থানা এবং ভাতোল ফাঁড়ির পুলিশের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ সীমান্তে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠন ‘মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম)-এর সম্পাদক কিরীটি রায় বুধবার রাতে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি অবিলম্বে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে অনেককে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকের প্রসঙ্গে আদালত জানিয়েছে, তাঁরা ভারতের নাগরিক এবং তাঁদের এভাবে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠানোর কোনো যুক্তি নেই। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের ক্ষেত্রে কয়েকজনকে বাংলাদেশ থেকে খুঁজে বের করে ফিরিয়ে আনার কথাও বলেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। অনেক ক্ষেত্রেই এসব বিষয়কে সামনে এনেছে মানবাধিকার সংস্থা মাসুম।
বুধবার সামনে আসা এই ঘটনার সূত্রপাত গত ২ জুন। অভিযোগ অনুযায়ী, সেদিন দুপুর ১২টার দিকে রায়গঞ্জ থানা ও ভাতোল ফাঁড়ির একদল পুলিশ গোপালপুর মানুপাড়ার বাসিন্দা মৃত আব্দুল হাকিমের ছেলে আব্দুল বারিকের বাড়িতে যায়। পুলিশ পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে বারিক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পূর্ণ সহযোগিতা করেন বলে মানবাধিকার সংগঠনটিকে জানিয়েছে পরিবারটি। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ কোনো প্রকার জমার রসিদ বা ‘সিজার লিস্ট’ না দিয়েই তাঁর সমস্ত নথিপত্র কেড়ে নেয়। এর পরপরই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে আব্দুল বারিককে গ্রেপ্তার করে একটি পুলিশের গাড়িতে করে ভাতোল ফাঁড়ির উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তারের সময় কোনো ‘অ্যারেস্ট মেমো’ বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পরিবারকে দেওয়া হয়নি এবং গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট কারণও জানানো হয়নি বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
এরপর থেকেই বারিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশের কাছ থেকে সদুত্তর না পেয়ে গত বুধবার মাসুমের পক্ষ থেকে রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করা হয়। মাসুম জানায়, ওই কর্মকর্তা ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য চাওয়ার পরামর্শ দেন। কিরীটি রায় এক বিবৃতিতে বলেন, পরামর্শ অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে অফিশিয়াল ই-মেইল পাঠানো হলেও কোনো লিখিত জবাব পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া গত ২ জুনের সরকারি গ্রেপ্তারি তালিকা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেখানে আব্দুল বারিকের গ্রেপ্তারের কোনো নথি নেই।
আব্দুল বারিক পেশায় একজন মৎস্যজীবী ও জমিজমা থাকা স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁর আয়ের ওপর ২৩ জনের একটি পরিবার নির্ভরশীল। পরিবারের দাবি, ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে তাঁর ভারতীয় পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং আয়কর কার্ড রয়েছে। এমনকি তিনি ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেও নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
মাসুমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অবিলম্বে রায়গঞ্জ থানা ও ভাতোল ফাঁড়ির সিসিটিভি ফুটেজ, জেনারেল ডায়েরি (জিডি) ও স্টেশন ডায়েরি তলব করে আব্দুল বারিক কোথায় আছেন, তা পরিবারকে জানাতে হবে। তাঁকে যদি অন্যায়ভাবে সীমান্ত পার করা হয়ে থাকে, তবে তার সঠিক বিচার ও দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। মাসুমের ভাষ্য, দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় পুলিশের হেফাজত থেকে কোনো নাগরিকের এভাবে ‘উধাও’ হয়ে যাওয়া নাগরিক অধিকারের ওপর এক চরম আঘাত। এর কিছুদিন আগেও পিতা ও তাঁর তিন পুত্রের এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছিল মাসুম। ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলিম পরিবারের সদস্যদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার এ ধরনের ঘটনা নিয়ে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে শুরু করেছে।