অমিত শাহ ও রাহুল গান্ধী
অমিত শাহ ও রাহুল গান্ধী

অমিত শাহ কেন সংসদে আসছেন না, তবে কি তিনি ভয় পেয়েছেন

অমিত শক্তিধর ‘চাণক্য’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি তবে ভয় পেয়েছেন? ভীত বলেই কি তিনি সংসদ ভবন চত্বরে উপস্থিত থেকেও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ সংশোধনী বিল নিয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে অংশ নিলেন না? লোকসভা রাজ্যসভা কোনো কক্ষে উপস্থিত পর্যন্ত থাকলেন না?

বিরোধীরা বারবার অমিত শাহকে ‘অপরাধী’ ঠাওরাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের ওপর ছররা গুলি চালানো কিংবা একে–৪৭ রাইফেল থেকে গুলি ছোড়ার দায় চাপাচ্ছে, তা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে তুলকালাম ঘটছে, অথচ কোনো কক্ষে তিনি ঢুকছেন না, এমন ঘটনা গত ১২ বছরে একবারও ঘটেনি।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি অমিত শাহ ভয় পেয়েছেন? শঙ্কিত? তিনি কি বুঝতে পেরেছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পর শিক্ষার্থী সমাজের নজর এবার তাঁর ওপর? তাই, গা বাঁচিয়ে চলতে চাইছেন?

প্রশ্নগুলো নিয়ে চর্চা থামছে না। বরং বেড়ে চলেছে। যে সদর দিয়ে তিনি সংসদ ভবনে নিত্য প্রবেশ করেন, অধিবেশন শুরুর আগে নিয়ম করে সেখানে বিরোধীরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। বিরোধীদের এড়াতে কয়েক দিন ধরে তিনি ঘুরপথে ভিন্ন সদর দিয়ে প্রবেশ করছেন। শুধু বিরোধীরাই নয়, অমিত শাহ সন্তর্পণে এড়িয়ে যাচ্ছেন গণমাধ্যমকেও।

এ কারণে রাহুল গান্ধীসহ বিরোধীরা ছররা গুলি চালানোর দায় সরাসরি তাঁর ওপর চাপানো সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। কেন তিনি বিতর্ক চলাকালে কক্ষে নেই, লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিরোধীরা বারবার সেই প্রশ্ন তুললেও সরকার পক্ষ থেকে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য জবাব পাওয়া যায়নি।

আজ শুক্রবারও অমিত শাহকে দেখা যায়নি। কেন তিনি সংসদীয় অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না, শুক্রবার সকালে সংসদ ভবন চত্বরে সে নিয়ে বিক্ষোভ দেখায় বিরোধীরা। তাঁদের হাতে ছিল বিশাল এক পোস্টার। তাতে হিন্দিতে লেখা, অমিত শাহ কেন সংসদ থেকে উধাও? অমিত শাহকে যাবতীয় পুলিশি বর্বরতার জন্য দায়ী করার পাশাপাশি বিরোধীরা রাম মন্দিরের টাকা চুরির বিষয়টিও সামনে আনে।

স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সরকারকে কোণঠাসা করতে বিরোধীরা এবার অযোধ্যায় রাম মন্দিরের কোষাগার লুটের বিষয়টিকে হাতিয়ার করতে চাইছে। শুক্রবার এই নিয়েই লোকসভা ও রাজ্যসভা সারা দিনের মতো মুলতুবি হয়ে যায়।

কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে

লোকসভার পর রাজ্যসভায়ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুপস্থিত থাকায় রাজ্যসভার বিরোধী নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বৃহস্পতিবার বলতে বাধ্য হন, পুলিশি বর্বরতার জবাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিতেই হবে। নইলে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।

সংসদকে এড়ানোর পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘দায়’ এড়ানোর চেষ্টায় ক্ষুব্ধ কংগ্রেস সভাপতি এ কথাও বলেন, ‘উনি ঘরের দরজা বন্ধ করে লুকিয়ে রয়েছেন। ভাবছেন এভাবেই কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু আমরা তা হতে দেব না। ঘর থেকে টেনে বের করব।’

প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে সংশোধনী বিল পাস করাতে বিরোধীরা সম্মত হয়েছিল দুটি কারণে। প্রথমত, বিলটির বিরোধিতা করলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কাছে সরকার বলতে পারত, বিরোধীরা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার চায় না। তাই, বিল পাসে সহযোগিতা করছে না। এতে শিক্ষার্থী ও জনগণের কাছে বিরোধীদের ভাবমূর্তি নষ্ট হতো।

দ্বিতীয় কারণটি ছিল কৌশলগত। বিরোধীরা বিতর্কে রাজি হয়েছিল শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি অত্যাচারের অবতারণা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়বদ্ধতা প্রমাণ করতে পারবে বলে। তাঁকে জবাবদিহিতে বাধ্য করবে। কিন্তু সরকার সেই সুযোগ দিল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো কক্ষে গেলেনই না। বিলটা পেশ করেন কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং।

অমিত শাহ কেন সভায় নেই জানতে চাইলে লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান দুজনই জানিয়ে দেন, বিল উত্থাপক মন্ত্রী রয়েছেন। জবাব তিনিই দেবেন। ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যেমন ১২ বছরে একবারের জন্যও জবাবদিহিতে বাধ্য করা যায়নি, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি অত্যাচার নিয়েও তেমন অমিত শাহকে জবাবদিহিতে বাধ্য করাতে পারলেন না বিরোধী নেতারা।

কিন্তু তার অর্থ এই নয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সমালোচনা এড়াতে পারছেন। লোকসভায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে বলেছিলেন, অত্যাচারের নির্দেশ অমিত শাহরই দেওয়া। তাঁর সম্মতি ছাড়া ছররা গুলি চলতে পারে না।

রাহুল আরও বলেছিলেন, যদি অমিত শাহ বলেন নির্দেশ দেননি, তাঁর নির্দেশ ছাড়াই গুলি চলেছে, তা হলে তিনি অপদার্থ। সেই কারণেও তাঁর পদত্যাগ করা দরকার। গত বুধবার লোকসভায় রাহুলের ওই যুক্তি অমিত শাহর কাছে ছিল শাঁখের করাত।

বিজেপি নেতা সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর অবশ্য রাহুলের বিরুদ্ধে অধিকারভঙ্গের নোটিশ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, শাহ যে নির্দেশ দিয়েছেন, রাহুল তা প্রমাণ করুন। নয়তো ক্ষমা চান। রাজ্যসভায় খাড়গেকেও ক্ষমা চাইতে বলেছেন বিজেপি নেতারা। তাঁরা মনে করেন, অমিত শাহকে ‘ঘর থেকে টেনে বের’ করে আনার কথা বলে খাড়গে হিংসায় উসকানি দিয়েছেন।

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। ১৭ জুলাই ২০২৬, নয়াদিল্লি

ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণের পর শিক্ষার্থীদের নজরে যে অমিত শাহ, সিজেপি নেতাদের কথাতেও তা স্পষ্ট। রাহুল গান্ধীর সুরে সুর মিলিয়ে সিজেপি নেতারাও বলতে শুরু করেছেন, অমিত শাহর নির্দেশ ছাড়া পুলিশ, র‍্যাফ ও সিআরপিএফ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভাঙতে এভাবে অত্যাচার করতে পারত না। অত্যাচারের নির্দেশ অমিত শাহরই দেওয়া। ইস্তফা তাঁর দেওয়া উচিত।

সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বুধবার রাহুলের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। বৃহস্পতিবার সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও রাহুলকে সমর্থন জানিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ২০ জুলাই যেভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়েছে, পেলেট গান থেকে ছররা গুলি ছোড়া হয়েছে, বিহারে একে–৪৭ থেকে গুলি চালানো হয়েছে, তা অমিত শাহর নির্দেশ ছাড়া হতে পারে না। এ জন্য অমিত শাহর পদত্যাগ করা উচিত।

অভিজিৎ বলেন, দিল্লি পুলিশ অমিত শাহর অধীন। র‍্যাফ, সব আধা–সামরিক বাহিনী তাঁর অধীনে। তাঁর নির্দেশ ছাড়া কী করে তারা এমন বলপ্রয়োগ করতে পারে? ওই অত্যাচারের দায় পুরোপুরি তাঁরই। তিনি কিছুতেই দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। রাহুল গান্ধী ঠিকই বলেছেন।

সিজেপি বিদেশি অনুদান পাচ্ছে বলে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছে। সেই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে অভিজিৎ বলেন, ‘সেটাও তো তাহলে অমিত শাহর আরেক ব্যর্থতা। আমরা বিদেশি অনুদান পেলে তা আটকানো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ। তিনি তাহলে সে কাজেও ব্যর্থ। বিদেশি অনুদান রুখতে পারছেন না। সেই জন্যও তাঁর ইস্তফা দেওয়া উচিত।’

তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য মহুয়া মৈত্রও বলেছেন, সব দায় অমিত শাহরই। দিল্লি পুলিশ তাঁর অধীন। আধা–সামরিক বাহিনী তাঁর অধীন। র‍্যাফ তাঁর অধীন। তাহলে দায় কেন তাঁর নয়?

পুলিশি অত্যাচার, ছররা গুলি চালানো নিয়ে পুলিশি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে মহুয়া বলেন, অমিত শাহ কিছুতেই দায় এড়িয়ে থাকতে পারবেন না। কারণ, যাঁরা ছররা গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই অমিত শাহর অধীনে। দায়িত্ব তাঁকে নিতেই হবে।

এভাবে অমিত শাহ কত দিন সংসদ এড়িয়ে থাকতে পারবেন, রাজনৈতিক মহলের চর্চা এখন তা নিয়েই।