
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের মতো তাঁর মেয়েও চলে এসেছেন খবরের শিরোনামে। বাবার মতো বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন উত্তর প্রদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলা গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলা শাসক (ডিএম) মেধা রুপম। মশা মারতে কামান দাগার অপরাধে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণের অর্থ এবার তাঁর বেতন থেকে কাটা হবে।
শুধু তাই নয়, অন্যায়ভাবে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের (এনএসএ) প্রয়োগ করে কাউকে পাঁচ মাস বন্দী রাখার এই ব্যতিক্রমী ঘটনা নিয়ে আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণের বিষয়টি মেধা রুপমের চাকরিসংক্রান্ত রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশও হাইকোর্টের বিচারপতিরা দিয়েছেন। সরকারি আমলাদের বেতন থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ কাটার এই রায় অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন না হলেও নিশ্চিতভাবেই দৃষ্টান্তমূলক। আদালত মনে করেন, এর ফলে আমলাশাহি ও পুলিশ প্রশাসনের বেপরোয়া হয়ে ওঠা রোখা যাবে। তাঁদের আইন ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকতে বাধ্য করা যাবে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কিছুদিন ধরেই বিরোধীদের নিশানায় জ্বলজ্বল করছেন। সারা দেশে ভোটের তালিকা সংশোধনের নামে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ চালু করার মধ্য দিয়ে তিনি বিতর্কে জড়িয়েছেন। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যের ১০ কোটি ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ঠিক আগে এভাবে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল ১ কোটি। এখনো ২৭ লাখ ভোটারের নাম বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের বিবেচনাধীন। বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআরের নামে নির্বাচন কমিশন বেছে বেছে বিরোধী অনুগত ভোটারদের নাম বাদ দিচ্ছে। বিশেষ করে বাদ দেওয়া হচ্ছে সংখ্যালঘু মুসলমানদের নাম। এভাবে তিনি শাসকদল বিজেপির সুবিধা করে দিচ্ছেন। এর বিরুদ্ধে প্রতিকারের কোনো উপায়ও নেই, যেহেতু কেন্দ্রীয় আইন অনুযায়ী নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের মেয়ে মেধা রুপম। তিনি দিল্লির লাগোয়া উত্তর প্রদেশের গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলা শাসক। এই জেলা নয়ডা নামেই বেশি পরিচিত। ২০২৫ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তাঁর এত গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্বভার পাওয়া নিয়ে নানা কথা উঠেছিল। বাবার প্রভাব নিয়ে বেশ চর্চা হয়েছিল। এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হয়েছে, যেভাবে তাঁকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে এবং জরিমানার টাকা যেভাবে তাঁর বেতন থেকে কাটার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবেই তাঁর কর্মজীবনের কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। মাস কয়েক আগে দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত নয়ডার শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য সুবিধার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। আকৃতি সেই আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সেই শ্রমিক আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। উত্তর প্রদেশ পুলিশের অভিযোগ, শ্রমিক আন্দোলনকে হিংসাত্মক করে তোলার প্ররোচনা দিয়েছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি ছাত্রী আকৃতি চৌধুরী। সেই অভিযোগে আকৃতিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ করা হয়। ওই আইনে তাঁকে ৫ মাস বিনা বিচারে আটকও রাখা হয়। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলা রুজু করা হয়।
সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখে এলাহাবাদ হাইকোর্ট আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আনা মামলা বাতিল করার নির্দেশ দেন। বিচারপতি অতুল শ্রীধরন ও বিচারপতি অচল সচদেবের ডিভিশন বেঞ্চ এনএসএতে আনা মামলা খারিজ করে জানান, আকৃতিকে অন্যায়ভাবে আটক করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর একটাও পুলিশ প্রমাণ করতে পারেনি। এমন কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি যাতে প্রমাণিত হয় তিনি শ্রমিকদের সহিংস আচরণে প্ররোচনা জুগিয়েছেন। তা ছাড়া দেখা যাচ্ছে, শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হওয়ার আগেই আকৃতিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। দুই বিচারপতি তাঁদের রায়ে জেলা শাসিকা মেধা রুপমের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ এনে বলেছেন, সংবিধানের প্রতি অনুগত না থেকে তিনি রাজনৈতিক প্রশাসনের কাছে অনুগত থাকতে চেয়েছেন। দৃষ্টান্ত স্থাপনের তাগিদে তাই তিনি আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের ধারা প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছেন। বিচারপতিরা বলেন, পুলিশ ও আমলাদের মনে রাখা উচিত তাঁরা সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ। অন্য কারও প্রতি নন। তাঁদের এমন আচরণ করা উচিত নয় যাতে মনে হয় যে তাঁরা ব্রিটিশ আমলের মতো দমনপীড়নের বাহকে পরিণত হয়েছেন।
বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’–এর উল্লেখ করে বিচারপতিরা কড়া ভাষায় বলেছেন, এভাবে চললে উত্তর প্রদেশ ক্রমেই ‘অরওয়েলীয় দুঃসহ সমাজব্যবস্থায়’ পরিণত হবে। রাজ্যটা পরিণত হবে ‘সম্পূর্ণভাবে জীবনগ্রাসী রাষ্ট্রে’।
শুধু এনএসএতে আনা মামলা খারিজ করেই বিচারপতিরা ক্ষান্ত হননি, আকৃতিকে তাঁরা ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, জেলা শাসিকা মেধা রুপম মতপ্রকাশের অধিকারে বাধা সৃষ্টি করে তাঁর সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা লঙ্ঘন করেছেন। একই অপরাধ করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। আকৃতিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে ৫ লাখ রুপি দেওয়া হবে, তা মেধা ও অন্য কর্মকর্তাদের বেতন থেকে কাটতে হবে। জরিমানার অর্থ রাষ্ট্র দেবে না। সেই সঙ্গে আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ মেধার কর্মজীবনের রিপোর্ট ও রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা মেধা দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। জাতীয় স্তরের সাবেক শুটারও ছিলেন তিনি। তিনিই নয়ডার প্রথম নারী জেলা শাসক। বাবার মতো তিনিও বিতর্কে জড়ালেন। আইন অনুযায়ী জ্ঞানেশ কুমার আইন আদালতের ঊর্ধ্বে হলেও কন্যা মেধা আদালতের রোষ থেকে বাঁচতে পারলেন না। বরং এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় তাঁর কর্মজীবনের রেকর্ডভুক্ত হয়ে রইল।