
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) ফলে বাদ পড়া ভোটারদের দায়ের করা একটি রিট পিটিশন আজ সোমবার খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। তবে তাঁদের আবেদনের মাধ্যমে প্রতিকারের পথ খোলা রাখা হয়েছে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ এই আবেদন খারিজ করেন।
আবেদনকারীদের আপিল মঞ্জুর হলে আইনগতভাবে ‘প্রয়োজনীয় ফলাফল অনুসরণ করা হবে’ বলেও দুই সদস্যের বেঞ্চ জানিয়েছেন।
এর অর্থ, রাজ্যস্তরের ট্রাইব্যুনাল আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের মামলাগুলো না শোনেন, তাহলে এসআইআরে পশ্চিমবঙ্গের বাদ পড়া প্রায় ৯১ লাখ ভোটার নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন না। যাঁদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে করা আবেদন আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে, সে-সংক্রান্ত মামলারই শুনানি করেছেন সুপ্রিম কোর্ট।
একই সঙ্গে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী চলমান এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের আপিল বিবেচনার জন্য একটি ‘শক্তিশালী আপিল ব্যবস্থা’ থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বিচারপতি বাগচী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ভারতের নির্বাচন কমিশন অন্যান্য রাজ্যের প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (যৌক্তিক অসংগতি) নামক একটি নতুন বিভাগ চালু করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন বিহারের এসআইআর-সংক্রান্ত বিষয়ের অবস্থান থেকেও বিচ্যুত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের নতুন করে নথি আপলোড করার প্রয়োজন নেই।
‘বিচার বিভাগীয় যেসব কর্মকর্তা এই যাচাই-প্রক্রিয়ায় আছেন, প্রচণ্ড চাপের মধ্যে তাঁদের কাছ থেকে শতভাগ নির্ভুলতা আশা করা যায় না’ বলে মন্তব্য করে বিচারপতি বাগচী বলেন, যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দিনে এক হাজারের বেশি নথি পরীক্ষা করেন, তখন ৭০ শতাংশ নির্ভুলতাকেও ‘চমৎকার’ বলে গণ্য করা হয়। এ কারণেই একটি শক্তিশালী আপিল ব্যবস্থার প্রয়োজন।
বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, নির্বাচনে জয়ের ব্যবধান বাদ যাওয়া ভোটারদের সংখ্যার চেয়ে কম হলে তা উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। তিনি বলেন, ‘প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণের অন্যায্য অস্বীকৃতি একটি নির্বাচন বাতিলের ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু ভোট দেওয়ার অধিকারের ক্ষেত্রে, যতক্ষণ পর্যন্ত না এটি বিশালসংখ্যক ভোটারের বিষয় হচ্ছে...(ততক্ষণ তা) নির্বাচন বাতিলের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য হয় না।
বিচারপতি বলেন, ১০ শতাংশ ভোটার ভোট না দিলে এবং জয়ের ব্যবধান ১০ শতাংশের বেশি হলে তবে কী করা হবে? ধরা যাক, ব্যবধান ২ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ ভোটার যাঁরা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, কিন্তু ভোট দিতে পারেননি, তবে হয়তো...আমরা কোনো মতামত দিচ্ছি না। কিন্তু আমাদের অবশ্যই এটি খতিয়ে দেখতে হবে। মনে রাখবেন, একজন সচেতন ভোটার যার নাম তালিকায় সঠিকভাবে বা ভুলবশত নেই, আমাদের উদ্বেগ শুধু তাদের নিয়ে নয়।’
আবেদনকারীরা অনুরোধ করেছিলেন, ভোটার তালিকা স্থগিত বা বন্ধ করার তারিখটি যেন বৃদ্ধি করা হয়, যাতে তাঁদের আপিল মঞ্জুর হলে তাঁরা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন। ভোটার তালিকা ৯ এপ্রিল বন্ধ করা হয়েছে, এটিকে এখন আর খোলা হবে না।
আবেদনকারীরা জোর দিয়ে বলেছেন, তাঁরা ২০০২ সালের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র আধার কার্ড ও পাসপোর্ট রয়েছে। আবেদনকারীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রউফ রহিম আবেদন দাখিল করেন। আইনজীবী বলছেন, নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ না করে আপিল ট্রাইব্যুনালকে সহযোগিতা করছে না।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু বলেন, এ ধরনের ব্যক্তিদের ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকার প্রমাণ ছাড়া অন্য কোনো নথি আপলোড করার প্রয়োজন নেই।
এরপর বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘যদি তা-ই হয়, তবে অনুগ্রহ করে বিহার মামলার আপনার লিখিত দাখিলগুলো দেখুন। এটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এমন নয়, সব ভোটারের নথি আপলোড করতে হবে। আপনি আপনার মূল যুক্তি থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন।’
তবে নানা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুললেও শেষ পর্যন্ত আবেদনটি খারিজ করে দেন বিচারপতিরা।