বিগত এক দশকে ভারতে গণপিটুনির মতো সামাজিক হিংসা এক নতুন ও আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। এ সময় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১৫৯ ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে মুসলিম ৩৭২ জন ও হিন্দু ৭৮৭ জন।
সম্প্রতি নয়াদিল্লির প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়ায় মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটসের (এপিসিআর) প্রকাশিত ‘মব লিঞ্চিং ইন ইন্ডিয়া: আ রেকর্ড ২০১৪–২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। মোট ৭৪৪ পাতার এই গবেষণা প্রতিবেদন সম্পাদনা করেছেন দিল্লি সংখ্যালঘু কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান তথা প্রবীণ সাংবাদিক জাফরুল ইসলাম খান। প্রকাশিত এই সংকলনে ১০ বছরে ১ হাজার ৭৪৩টি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত হওয়ায় এই পরিসংখ্যানকে পূর্ণাঙ্গ দাবি করা না হলেও তা দেশে দানা বাঁধতে থাকা হিংস্রতার গতিপ্রকৃতি স্পষ্ট করে দেয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগে পশ্চিমবঙ্গ, গোয়া বা উত্তর–পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোয় সংঘবদ্ধ সহিংসতা বা উগ্র গোষ্ঠীভিত্তিক গণপিটুনির মতো ঘটনা বিরল ছিল। কিন্তু এখন এসব অঞ্চলেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও এ ধরনের আক্রমণকে সাধারণত স্বঘোষিত গোরক্ষক বা উগ্রপন্থী দলের দ্বারা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে চালানো আক্রমণ হিসেবে দেখা হয়, তবে বাস্তবে এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। তথ্য বলছে, গোমাংস রাখা বা গোহত্যার সন্দেহে ৫৩টি এবং কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ৮৯টি ঘটনা ঘটেছে। তবে গণপিটুনির শিকার কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীই নয়, রাস্তাঘাটের সাধারণ তুচ্ছ বিবাদ বা ঝগড়া থেকেও রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৫৭১টি। এ ছাড়া আন্তধর্মীয় সম্পর্ক ও বিবাহসংক্রান্ত কারণে অন্তত ১৪১টি ক্ষেত্রে গণপিটুনির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
এই সামগ্রিক পরিসংখ্যানে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে চালিত সহিংসতায় মুসলিমরা যেমন সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, তেমনই রাস্তাঘাটের মারামারি, ব্যক্তিগত শত্রুতা ও অন্যান্য বিবাদে বহু হিন্দু পুণ্যার্থী বা সাধারণ মানুষও প্রাণ হারিয়েছেন।
এর পাশাপাশ দলিত সম্প্রদায়ের ওপরও নির্মম অত্যাচারের একাধিক নজির মিলেছে, যেখানে অন্তত ৮৫ জন দলিত প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১১৫ জন মারাত্মক আহত হয়েছেন। গুজরাটে বিয়ের অনুষ্ঠানে ঘোড়ায় চড়া কিংবা রাজস্থানে পানীয় জলের পাত্র স্পর্শ করার অপরাধে দলিতদের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ কেবল বর্ণবৈষম্য নয়; বরং সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই চিহ্নিত করে।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিচারে উত্তর প্রদেশে সবচেয়ে বেশি ৪২২টি সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এরপরই রয়েছে দিল্লি, বিহার ও হরিয়ানা। যদিও আশ্চর্যজনকভাবে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উত্তর প্রদেশসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে এ ধরনের নথিবদ্ধ ঘটনার সংখ্যা একধাক্কায় অনেকটাই কমেছে। অন্যদিকে মিজোরাম ও সিকিমে একটি ঘটনা না ঘটলেও গোয়া, আসাম ও নাগাল্যান্ডের মতো রাজ্যেও রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে।