
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সময় ভারত থেকে হাজারো চালানে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৫৯৬টি চালানে অস্ত্র, গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় এসব সরঞ্জাম ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ভারত রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থাটি গতকাল বৃহস্পতিবার ‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব ওয়েপনস অ্যান্ড অ্যামুনিশন টু ইসরায়েল’ শীর্ষক ৪২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের চালানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
হিন্দুত্ববাদী বিজেপিদলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত ইসরায়েলের অন্যতম শক্তিশালী মিত্র হয়ে উঠেছে। এটি দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। কারণ, ঐতিহাসিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাহিনী যখন বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাচ্ছিল, সেই সময়ে অস্ত্র রপ্তানির মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ইসরায়েলের সহযোগী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
প্রতিবেদনে ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি এমন সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ইসরায়েলি কোম্পানি ও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি লেনদেন বা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময়ে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতে অন্তত ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫১৬টি সামরিক মানের ছোট অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭০টি বিস্ফোরক অস্ত্রের উপাদান, যার মধ্যে ড্রোনের ওয়ারহেড ও আর্টিলারি শেলের খোল রয়েছে এবং ২৯৮টি সামরিক যানবাহনের উপাদান সরবরাহ করেছে। তবে বেসামরিক ব্যবহারের সম্ভাব্য চালান কিংবা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরঞ্জাম এ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।
অ্যামনেস্টির দাবি, ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাশিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও লাভজনক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য জাতিগত নিধনের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়ার পরও ভারত অস্ত্র রপ্তানিতে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেনি; বরং দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করেছে।
অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, ‘গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপের আদেশ দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলতে পারে না, তারা জানত না অস্ত্র সরবরাহ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ‘গুরুতর কাঠামোগত ত্রুটি’ রয়েছে। এর মধ্যে আছে সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির অনুমোদনের আগে মানবাধিকারসংক্রান্ত যথাযথ যাচাই–বাছাইয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা না থাকা ও রপ্তানিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার অভাব। পাশাপাশি অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তিতে (এটিটি) ভারত এখনো যোগ দেয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভারত সরকারকে অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ও নিজেদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে পাঠানো চালানের উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে ইসরায়েলের তিনটি বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান—এলবিট সিস্টেমস, ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএআই) ও রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের কাছে। এ সময় সরবরাহ করা সামগ্রীর মধ্যে ছিল মেশিনগানের যন্ত্রাংশ, ১৫৫ মিলিমিটার উচ্চ ক্ষমতার আর্টিলারি শেলের উপাদান, স্কাইস্ট্রাইকার লয়টারিং মিউনিশনের বিস্ফোরক ওয়ারহেড ও সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ।
ক্যালামার্ড বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যখন ফিলিস্তিনিদের ওপর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল, তখন অস্ত্র সরবরাহ করে ভারতীয় কোম্পানিগুলো মুনাফা করেছে।
ইসরায়েল বরাবরের মতোই গাজায় জাতিগত নিধনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যে জাতিগত নিধনের অভিযোগ তুলেছে, তা ‘মিথ্যা’ ও ‘চরম বিকৃত’ বলে দাবি করেছে দেশটি।
ভারত ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলের মোট অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ২৯ শতাংশই গেছে ভারতে। অন্যদিকে ভারতও ইসরায়েলের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বার ইসরায়েল সফরে যান। এ সময় দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘শান্তি, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করেছে। ওই সফরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত বছরের নভেম্বরে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা–সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারকও সই করেছে।
প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের মে মাসের একটি ঘটনারও উল্লেখ করা হয়েছে। সে সময় ভারতের চেন্নাই থেকে ইসরায়েলের হাইফা বন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়া অস্ত্রবাহী একটি জাহাজকে স্পেনের কার্তাগেনা বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। জাহাজটিতে ২০ টন রকেট ইঞ্জিন, সাড়ে ১২ টন বিস্ফোরকযুক্ত রকেট ও ১ হাজার ৫০০ কেজি বিশেষ ধরনের বিস্ফোরক ছিল।
স্পেনের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেছিলেন, ‘আমরা এই প্রথম এমন পদক্ষেপ নিলাম। কারণ, এই প্রথম আমরা ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে অস্ত্রবাহী এমন কোনো জাহাজের সন্ধান পেয়েছি, যা স্পেনের কোনো বন্দরে নোঙর করতে চাইছে।’
মধ্যপ্রাচ্যের প্রয়োজন অস্ত্র নয়; বরং শান্তি উল্লেখ করে হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস আরও বলেছিলেন, ইসরায়েলে অস্ত্র বহনকারী যেসব জাহাজ স্পেনের বন্দরে নোঙর করতে চাইবে, তাদের সবার ক্ষেত্রেই এই নীতি মেনে চলা হবে। একটি সুস্পষ্ট কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের যাত্রাবিরতির অনুরোধ নিয়মিতভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।
এর এক মাস পর গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরের একটি স্কুলে ইসরায়েলি হামলার পর ধ্বংসস্তূপে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ লেখা অস্ত্রের অংশ পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হামলায় ৩৩ ফিলিস্তিনি নিহত হন।