
পুলিশের ভিডিওগুলো দেখলে মনে হবে যেন আগে থেকে লেখা কোনো চিত্রনাট্য, অন্ধকারে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন পায়ে গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তি, আর পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে পুলিশ প্রায় একই কায়দায় শত শত সন্দেহভাজনের ওপর গুলি চালিয়েছে। এসব বন্দুকযুদ্ধের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন গরু পাচারের অভিযোগ ওঠা মুসলিমরা। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি গরু সুরক্ষা আইনের সঙ্গে এই অপরাধ গভীরভাবে জড়িত।
অপরাধ দমনের এক বড় অভিযানের অংশ হিসেবে পুলিশ এসব গোলাগুলির কথা প্রচার করেছে। তারা এগুলোকে আত্মরক্ষার খাতিরে করা হয়েছে বলে দাবি করেছে।
তবে অধিকারকর্মী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং স্থানীয় বিচারকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, এই সহিংসতা মূলত বিচারবহির্ভূত শাস্তি এবং ভয় দেখানোর শামিল। এটি ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সেই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম এই গণতান্ত্রিক দেশে আইনের শাসনকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।
দিল্লির মানবাধিকার আইনজীবী মঙ্গলা ভার্মা বলেন, ‘এটি এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। এটি এখন পুলিশের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।’
মঙ্গল ভার্মা বলেন, ‘তদন্ত করার বদলে পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে হত্যা বা আহত করছে, আর এভাবেই যেন বিচার শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘দ্য সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ একটি তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেখানে দেখা যায়, ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশ পুলিশের গুলিতে গরু পাচারে জড়িত অভিযোগে প্রায় ৬৫০ জন সন্দেহভাজন গুলিতে আহত হয়েছেন।
এসব তথ্য শুধু বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া হয়েছিল। এরপর এপি স্বাধীনভাবে প্রায় ২০০টি ঘটনার নমুনা যাচাই করে দেখেছে।
এসব ঘটনার বিশাল অংশজুড়ে রয়েছেন মুসলিমরা।
একের পর এক ঘটনায় দেখা গেছে, সন্দেহভাজনদের শরীরের ঠিক একই জায়গায় গুলি লেগেছে। জায়গাটি হলো পা, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা হাঁটুর নিচে।
পুলিশ কেবল যেসব ঘটনা নিজেরাই প্রকাশ করেছে, প্রতিবেদনটি সেসব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা। তাই প্রকৃত সংখ্যা যে আরও অনেক বেশি, তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
উত্তর প্রদেশের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা অমিতাভ যশ এপিকে বলেন, পুলিশকে কেবল আত্মরক্ষার্থে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের তুলনায় তাঁর রাজ্যের পুলিশ মাথাপিছু হিসাবে অনেক কম সন্দেহভাজনকে হত্যা বা আহত করেছে।
অমিতাভ যশ দাবি করেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পায়ে গুলি করার কোনো নির্দেশ নেই। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে উপযুক্ত কোনো অভিযোগ দায়ের করা হলে তাঁরা একইভাবে আহত হওয়ার এই ধরন তদন্ত করে দেখবেন।
অমিতাভ বলেন, ‘পুলিশের প্রতিটি কাজের জন্যই তাদের জবাবদিহি করতে হবে। সেটা মৃত্যু হোক বা আহত হওয়ার ঘটনা হোক, প্রতিটি কাজই যাচাই-বাছাইয়ের জন্য উন্মুক্ত।’
‘গত এক বছরে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়ার মতো কোনো কারণ ঘটেনি।’
ছড়িয়ে পড়ছে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’
গুলি করে আহত করার এই কৌশল স্থানীয়ভাবে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ বা ‘অপারেশন লেম’ নামে পরিচিত। এটি এখন পুরো উত্তর প্রদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
গরু পাচারে জড়িত সন্দেহভাজনদের পাশাপাশি চুরি ও ধর্ষণের মতো অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে।
ভারতে গবাদিপশু পাচার অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। সেখানে হিন্দুরা গরুকে ভক্তি করে এবং গরু সুরক্ষার বিষয়টি রাজনীতিতেও অনেক প্রভাব ফেলে থাকে।
তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ভারতের। এসব ঘটনায় পুলিশ প্রায়ই সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে সন্দেহভাজনদের গুলি করে হত্যা করে।
কিছু অধিকারকর্মী মনে করেন, পুলিশ এখন তাদের কৌশল পাল্টেছে। জনগণের ক্ষোভ এড়াতে তারা হত্যার বদলে গুলি করে আহত করছে। স্থানীয়ভাবে এটি ‘হাফ এনকাউন্টার (অর্ধেক বন্দুকযুদ্ধ)’ নামে পরিচিত।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং উত্তর প্রদেশে তাঁর মিত্রদের কঠোর পুলিশি ব্যবস্থায় এই সহিংসতা শুরু হয়েছে। অপরাধীদের মনে ভয় ঢোকাতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাঁরা অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতা)’ নীতি প্রচার করেছেন।
উত্তর প্রদেশের নেতৃত্বে আছেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথ। তিনি হিন্দু সন্ন্যাসী থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হয়েছেন। তিনি মোদির বিজেপি দলের একজন শীর্ষস্থানীয় সদস্য।
২০১৭ সালের মার্চ মাসে আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। বার্তা সংস্থা এপির পাওয়া পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় থেকে এ বছরের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ৩১৬ জন সন্দেহভাজন ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১১০ জনই ছিলেন মুসলিম।
এই হার রাজ্যের মোট মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি। ওই রাজ্যে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন মুসলিম।
একই সময়ে ১২ হাজার ৮৯০ জন সন্দেহভাজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে দায়িত্ব পালনকালে ১৮ জন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ১ হাজার ৯৫৩ জন আহত হয়েছেন।
পুলিশের গুলিতে আহত সন্দেহভাজনদের ধর্মের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বছরের শুরুতে উত্তর প্রদেশ পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, জিরো টলারেন্স নীতিটি ‘অপরাধীদের মনে ভয় বাড়িয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি জোরদার করেছে’।
পুলিশ বিবৃতিতে বলেছে, ‘এ কারণেই জাতীয় পর্যায়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার প্রশংসা করা হচ্ছে।’
অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই চর্চা এখন বিজেপিশাসিত আশপাশের রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে হরিয়ানা, বিহার, উত্তরাখণ্ড এবং দেশের রাজধানী দিল্লির সীমান্তবর্তী এলাকা।
গোলাগুলিতে একই ধরন
পুলিশের প্রকাশ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলোতে কর্মকর্তারা প্রায় একই রকম দৃশ্য বর্ণনা করেন। তাঁরা বলেন, সন্দেহভাজনেরা পালাচ্ছে, পুলিশের ওপর গুলি চালানো হচ্ছে এবং পুলিশ হত্যা না করে অচল করার জন্য গুলি ছুড়ছে।
তবে মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ভারতে পুলিশের বেশির ভাগ গোলাগুলির ঘটনা তখন ঘটে, যখন সন্দেহভাজনের কাছ থেকে কোনো হুমকি থাকে না।
হাঁটুর নিচে গুলি লাগার এই ধারাবাহিক ধরন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, এটি প্রমাণ করে, এসব আঘাত প্রকৃত অর্থে আত্মরক্ষার্থে করা হয়নি।
উত্তর প্রদেশভিত্তিক অধিকারকর্মী এবং বিরোধীদলীয় নেতা সন্দীপ পান্ডে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা আইনকে তামাশায় পরিণত করেছে। এগুলো পুরো ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।’
পান্ডে বলেন, ‘এটি রাষ্ট্র-সমর্থিত সহিংসতা।’
উত্তর প্রদেশের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জওহরলাল নেহরু মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক মোহাম্মদ কালিম খান একটি বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দূর থেকে পালিয়ে যাওয়া বা লড়াইরত কোনো ব্যক্তির পায়ের পেছনের মাংসপেশিতে হাড় স্পর্শ না করে সমান্তরালভাবে গুলি লাগার সম্ভাবনা খুবই কম।
কালিম খান বলেন, ‘এটি আত্মরক্ষার্থে করা গুলি নয়। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে খুব কাছ থেকে করা গুলি।’
‘বিচারহীনতা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি’
এই সহিংসতা বিচার বিভাগেরও নজরে এসেছে।
গত জানুয়ারিতে রাজ্যের সর্বোচ্চ বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ এলাহাবাদ হাইকোর্ট উত্তর প্রদেশে পুলিশের ক্রমবর্ধমান গোলাগুলির ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেন। এটি ছিল এক বিরল ঘটনা। আদালত সতর্ক করে দেন, পুলিশ কর্মকর্তারা বিচারব্যবস্থার জায়গা নিতে পারেন না। আইনিভাবে বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন ও তদন্তপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় পুলিশকে তিরস্কারও করেন আদালত।
এ বছরের শুরুতে একটি জামিন শুনানির রায়ে এক বিচারক লিখেছেন, ‘এই আদালত লক্ষ করেছে, পুলিশের এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে আসামিদের পায়ে গুলি করার চর্চা যেন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ আইনের শাসনে এ ধরনের আচরণকে তিনি ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন।
হাইকোর্ট ইঙ্গিত দেন, কিছু কর্মকর্তা হয়তো ক্যারিয়ারের উন্নতি বা প্রচারের আশায় এমনটি করতে পারেন। আদালত উল্লেখ করেন, পুলিশ সম্ভবত ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বা সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পেতে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করছে’।
জুনে আরেকটি ভিন্ন মামলায় হাইকোর্টের অন্য এক বিচারক লিখেছেন, উত্তর প্রদেশে ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ চলছে। এ বিষয়ে তাঁর ‘গভীর সাংবিধানিক উদ্বেগ’ রয়েছে বলেও তিনি জানান।
প্রকাশ্যে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করা সত্ত্বেও, গত এক দশকে বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ বেশ ধীরগতিতে চলেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে মানবাধিকার সংগঠন ‘পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ’ উত্তর প্রদেশে পুলিশের এনকাউন্টার হত্যার প্রমাণ উপস্থাপন করেছিল। তারা এসব ঘটনার তদন্ত একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে আদালতের কাছে আবেদন জানায়। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
এর পর থেকে উত্তর প্রদেশে পুলিশের গোলাগুলির ঘটনা, যাতে মৃত্যু ও আহতের ঘটনা ঘটছে, তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অমিতাভ যশ বিচারব্যবস্থাকে রাজনীতিকরণের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, সন্দেহভাজনদের গুলি করার জন্য পুলিশকে কোনো পুরস্কার দেওয়া হয় না।
অমিতাভ বলেন, ‘পুলিশের কোনো অভিযানের সঙ্গে পদোন্নতি বা ক্যারিয়ারের অগ্রগতির কোনো নীতি নেই। একেবারেই নেই।’
‘গোলাগুলি আমাদের নিঃস্ব করে দেয়’
বার্তা সংস্থা এপি উত্তর প্রদেশের ছয়জন মুসলিম পুরুষের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা সবাই পুলিশের গুলিতে পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন।
সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। কারণ, প্রকাশ্যে কথা বলতে তাঁরা অত্যন্ত ভয় পান। ওই সময়ে ওই ছয়জন পুরুষই কারাগারে ছিলেন অথবা লুকিয়ে জীবন পার করছিলেন।
এক নারী জানান, তাঁর ছেলে মহিষের ব্যবসা করে যৌথ পরিবার চালাতেন। মহিষের ব্যবসা গরু সুরক্ষা আইনের আওতায় পড়ে না।
ওই নারী বলেন, ‘তাকে খোঁড়া করে দেওয়া হয়েছে। তার পায়ে বড় ফোলা দেখা দিয়েছে। কেউ কিছু দিলে আমরা তা নিই। এভাবেই আমাদের দিন কাটছে। ওই বেচারা আর বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারে না। মানুষ যা দেয়, আমরা তা–ই খাই।’
আরেক নারী বলেন, তাঁর ছেলে দুধের মহিষের ব্যবসা করতেন। তাঁর দুই হাঁটুতেই গুলি করা হয়েছে। এর ফলে পরিবারটিকে ছোট ছোট ঋণ নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।
এই নারী জানান, হাসপাতালে ছেলেকে দেখতে গিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর ক্ষতস্থান চুইয়ে রক্ত ঝরছে।
এই মা বলেন, ‘আমার ছেলে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সে শুধু আমাদের হাত ধরে রেখেছিল। পুরো পরিবার কেঁদেছিল। ছেলেও অনবরত কাঁদছিল।’
গোলাগুলির ঘটনার ধর্মীয় দিক
দ্য সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গরু পাচারসংক্রান্ত এনকাউন্টারে আহত সন্দেহভাজনদের প্রায় ৯৩ শতাংশই মুসলিম।
ভারতের জনসংখ্যা ও পুলিশ বাহিনীর বিশাল অংশই হিন্দু।
এই বিশ্লেষণ কেবল ৬২৭টি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যেখানে নাম বা অন্যান্য পরিচায়ক তথ্য পাওয়া গেছে।
সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রাকিব নায়েক বলেন, শত শত গোলাগুলির ঘটনার সংগৃহীত প্রমাণ ‘স্পষ্টতই দেখায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন চালানোর মাধ্যম হিসেবে ক্রমশ বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে’।
রাকিব বলেন, এটি দেখে মনে হয় নিপীড়নের একটি আমলাতান্ত্রিক রূপ তৈরি হয়েছে। এখানে পুলিশের কাজ ক্রমশ সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হয়।
মোদির বিজেপি শাসনামলে ভারত তার ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ভিত্তি থেকে সরে এসেছে এবং হিন্দু-ফার্স্ট (হিন্দুরাই প্রথম) রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ এই উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কঠোর অবস্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সমালোচকেরা বলছেন, অপরাধ দমনে তাঁর এই কঠোর নীতি মূলত মুসলিমদের ওপর এক গোপন হামলা, যা কট্টরপন্থী হিন্দু ভোট টানার কৌশল।
অধিকারকর্মী ও বিরোধীদলীয় নেতা পান্ডে বলেন, ‘যখন আপনি গবাদিপশু বহনকারী মানুষকে গুলি করেন, তখন আপনি এই বার্তাই দেন, আপনি একটি হিন্দু এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।’
পুলিশ কর্মকর্তা অমিতাভ যশ দাবি করেন, গরু পাচারে অভিযুক্ত হিসেবে পুলিশের গুলিতে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলিমদের হার বেশি হওয়ার কারণ হলো, গবাদিপশুর ব্যবসায় প্রচুরসংখ্যক মুসলিম জড়িত।
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীতে সব জাতি ও ধর্মের মানুষ আছে। আপনি কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর চেষ্টা করতে পারেন না।’
পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত মুসলিমদের অনুপাত প্রকাশ করা প্রায় এক দশক আগেই বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। ২০১৩ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সে সময় উত্তর প্রদেশের পুলিশ বাহিনীতে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব ছিল খুবই কম, মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
ভুক্তভোগী এবং তাঁদের পরিবারের কাছে এসব গোলাগুলির পরিণাম হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী।
মুসলিম এক ব্যক্তি বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, তাঁর ভাতিজা নিজের সন্তানদের দেখতে যাওয়ার পথে পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর গরু পাচারের অভিযোগ তুলে তাঁর পায়ে গুলি করা হয়। তিনি বলেন, ‘তারা পুরোপুরি নিরপরাধ মানুষকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়।’
ওই ব্যক্তি বলেন, ‘এখন একটাই ভয় কাজ করে, গরুর নাম করে তারা হয়তো অন্য কাউকে তুলে নিয়ে যাবে, কিংবা অন্য কাউকে গুলি করে বসবে।’