
শ্রীলঙ্কার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিনের আঘাতে ডুবে যাওয়া ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ভারতে আয়োজিত নৌ মহড়ায় অংশ নিয়েছিল বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। সেটি ইরানে ফেরার সময় ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশের পর হামলার শিকার হয়।
যুদ্ধজাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়ার এ ঘটনা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পরিধি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বহু দূরে ছড়িয়ে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ ঘটনায় ভারতেও ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে, বিশেষ করে যেখানে ভারত মহাসাগরে নয়াদিল্লির শক্তিশালী নৌ উপস্থিতি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জলসীমায় বুধবার ডুবে যাওয়া ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দিনা’ থেকে ৮৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী। এ ছাড়া ওই জাহাজ থেকে ৩২ জন ইরানি নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছুড়ে কোনো যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার এমন ঘটনা বিরল।
শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের যুদ্ধজাহাজটি থেকে একটি বিপৎসংকেত পেয়েছিল। তবে তারা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, সেখানে জাহাজের কোনো চিহ্ন ছিল না। সমুদ্রের পানিতে কেবল তেলের আস্তরণ ও ভাসমান নাবিকদের দেখতে পায় তারা। উদ্ধার হওয়া নাবিকদের শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের গলে শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, এ জাহাজডুবির ঘটনা দেখিয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে তাঁদের সামরিক অভিযান এখন দেশটির সীমান্তের বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে। তিনি আইআরআইএস দিনাকে একটি ‘মূল্যবান শিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের নৌবাহিনীকে পুরোপুরি নির্মূল করাই এ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে ইরানের জাহাজটিতে টর্পেডো হামলার মুহূর্তটি দেখা গেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পানির নিচে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ হয়। এতে জাহাজটি ভেঙে যায়। এ সময় বিশাল জলরাশি ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন নৌবাহিনীর এ পদক্ষেপকে ‘সমুদ্রে একটি নৃশংসতা’ আখ্যা দিয়েছেন। এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেছেন, এ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অচিরেই ‘চরম অনুশোচনা’ করতে হবে। জাহাজটিতে ইরানের প্রায় ১৩০ জন নাবিক ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ভারতীয় নৌবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আক্রান্ত ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ভারতের বিশাখাপত্তম বন্দরে গত ১৫ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ’ ও বহুজাতিক নৌ মহড়া ‘এমআইএলএএন ২০২৬’-এ অংশ নিয়েছিল। ভারতীয় নৌবাহিনী আয়োজিত এ আয়োজনে ৭৪টি দেশ যোগ দিয়েছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এক্সে একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। সেখানে মহড়া চলার সময় ইরানি যুদ্ধজাহাজটিকে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় দেখা যায়। অন্য একটি ছবিতে জাহাজের ডেকের ওপর ইরানের জাতীয় পতাকাকে পেছনে রেখে বেশ কয়েকজন নাবিককে ছবি তোলার জন্য প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এ যুদ্ধজাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘অতিথি’ হিসেবে দেশটিতে অবস্থান করছিল। তবে এ জাহাজে হামলার বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
ভারত মহাসাগরকে দীর্ঘকাল ধরে নিজের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে নয়াদিল্লি। বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান সমুদ্রপথগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভারতীয় নৌবাহিনী নিয়মিত টহল এবং বহুজাতিক মহড়া পরিচালনা করে থাকে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার ক্ষেত্রে ভারত ঐতিহাসিকভাবেই একটি সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে।
এ ঘটনার বিষয়ে সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভারতের বিরোধীদলীয় নেতারা। তাঁদের মতে, ভারতের সামুদ্রিক অঞ্চলের এত কাছাকাছি একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া জরুরি ছিল।
ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের ‘নীরবতার’ তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বিষয়টিকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বক্তব্যের দাবি জানিয়েছে।
ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘ভারত মহাসাগরে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংঘাত আমাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কিছুই বলছেন না।’
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার জন্য ভারত রাজনৈতিক বা সামরিক—কোনোভাবেই দায়ী নয়। তিনি আরও বলেন, ভারতের কাছে যেসব বিষয় সংবেদনশীল, সেগুলোকে উপেক্ষা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের আমন্ত্রণেই জাহাজটি এ জলসীমায় অবস্থান করছিল।