ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার কাছে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন এক কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার কাছে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন এক কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর

ভারতে ধরপাকড় ও দমনপীড়নের আশঙ্কায় বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছেন কথিত অভিবাসীরা

ভারতের একটি সীমান্ত চৌকিতে অপেক্ষা করছিলেন হাসিনা বিবি। এ সময় তিনি তাঁর চার বছর বয়সী ক্ষুধার্ত মেয়েশিশুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন। নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের সম্ভাব্য কঠোর দমনপীড়ন ও ধরপাকড়ের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় তিনি ভারত ত্যাগের চেষ্টা করছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হাকিমপুরে গত দুই দিনে জড়ো হওয়া কথিত শত শত বাংলাদেশির মধ্যে তিনিও একজন। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করায় তাঁরা বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছেন।

ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই মাসের শুরুর দিকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তারা নথিপত্রহীন অভিবাসীদের ‘শনাক্ত, বাদ ও ফেরত’ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়ী হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পের কাছে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য আটকে রাখা নথিপত্রহীন কথিত কয়েক বাংলাদেশি অভিবাসী। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর

রাজ্য সরকারের এই তাড়াহুড়া অভিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগকে স্পষ্ট করে তুলেছে, যাঁদের অনেকের কাছেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভারত সরকারের জোরপূর্বক বহিষ্কার ও সীমিত আইনি সুরক্ষার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে।

অনেকেই এখন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একদিকে ভারত ছাড়তে চাপ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিকত্বের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ ছাড়া বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।

উপায়হীন অনেকেই মরিয়া হয়ে নদী পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছেন। যদিও দলে দলে এভাবে ভারত ছাড়ার প্রকৃত সংখ্যা বা পরিধি এখনো অস্পষ্ট।

গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাসহ ‘আটক বিদেশিদের’ জন্য ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটককেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে। এটি রাজ্যের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ মুসলিমের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

৪৫ বছর বয়সী হাসিনা বলেন, ‘আমাদের অবিলম্বে ভারত ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ভারত সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’

সীমান্ত চৌকির কাছে নির্মাণাধীন একটি ভবনে পরিবারগুলো যখন গুটিসুটি হয়ে বসে ছিল, তখন হাসিনার স্বামী তাঁদের সন্তানকে অবশিষ্ট রুটির টুকরা খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলেন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ কয়েক দিন ধরে ঠিকমতো খাবার পাননি।

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) পূর্বে অবস্থিত হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা সম্ভব—অভিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই সেখানে হঠাৎ ভিড় তৈরি হয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ ও উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্কের কারণে দুই দেশের মধ্যে মানুষের যাতায়াত রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মতো বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের রাজ্যগুলোতে নথিপত্রহীন অভিবাসীরা বছরের পর বছর ধরে অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে অধিকারকর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কেবল জাতিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আসাম থেকে শত শত মানুষকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে পাঠানো হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে পুলিশ সদস্যরা একটি ক্যাম্পে পাহারা দিচ্ছেন। সেখানে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের আটকে রাখা হয়েছে। যাচাই–বাছাই শেষে তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে রাজ্যের বিজেপি সরকার কর্তৃপক্ষ দাবি করছে। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর

‘আশাভঙ্গ’

কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আসামের এসব ঘটনা পশ্চিমবঙ্গেও আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাজ্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুব্রত সাহা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘মঙ্গলবার থেকে দলে দলে মানুষ হাকিমপুর সীমান্ত চেকপোস্টে আসছেন। তাঁরা খবর পেয়েছেন, এই চৌকি দিয়ে বাংলাদেশে পার হওয়া সম্ভব।’

কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে জড়ো হওয়া এসব মানুষকে প্রথমে প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর তাঁদের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

পশ্চিমবঙ্গের অভিবাসনের ইতিহাস ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ ভারত বিভাগের সময়কাল থেকে শুরু।

তখন ধর্মীয় ভিত্তিতে বেঙ্গলকে (বঙ্গ) বিভক্ত করা হয়েছিল—প্রধানত হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয় এবং মুসলিমপ্রধান পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ নামে আত্মপ্রকাশ করে।

অনেকের জন্য এই প্রত্যাবর্তন বেঁচে থাকার লড়াইয়ের পাশাপাশি পরিচয়ের প্রশ্নও বটে।

২০ বছর বয়সী আবদুল শেখ বলেন, ‘আমার বাবা-মা দুই দশকের বেশি সময় আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছিলেন। আমার জন্ম কলকাতায়, কিন্তু আমার (ভারতীয়) নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই।’

আবদুল জানান, মা–বাবার মৃত্যুর পর এখন তাঁকে ভারত ছাড়তে সতর্ক করা হয়েছে। ‘নতুবা এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার কাছে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন এক কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়। রাজ্যের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের দমনপীড়ন ও ধরপাকড়ের ভয়ে অনেকে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টায় সীমান্তে পালিয়ে এসেছেন। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর

আবদুল বলেন, ‘আমার সব আশা ভেঙে গেছে। আমি কীভাবে প্রমাণ করব আমি বাংলাদেশি, তা জানি না।’

অন্যরা বলেন, তাঁদের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না।

তিন বছর আগে বাবার চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা রাজমিস্ত্রি আরিফুল সরদার বলেন, ‘আমরা অসহায় বোধ করছি। যেহেতু এটি এখন সরকারি নির্দেশ, তাই আমরা ফিরে যাচ্ছি।’

সীমান্তরক্ষীরা সতর্ক করেছেন, পারাপারের সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই রাতের অন্ধকারে কাছাকাছি একটি নদী দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছেন।

বিএসএফের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘নদী পার হওয়া কঠিন নয়। বর্তমানে সীমান্ত পাহারা দেওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।’