মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী

ভবানীপুরে মমতা–শুভেন্দুর লড়াই, ভোটের দিন কেমন গেল তাঁদের

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে গতকাল বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাজ্যে চরম উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক মুখোমুখি অবস্থানের মধ্য দিয়ে সারা দিন কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গন।

ভোটের মাঠে কার্যত মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসপ্রধান ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপি নেতা ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকে তাঁরা দুজনই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

ক্ষমতায় টানা চতুর্থ মেয়াদে টিকে থাকার লড়াইয়ে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য তাই গতকাল ছিল এক ব্যতিক্রমধর্মী ভোটের দিন। সকাল থেকেই রাস্তায় ছিলেন তিনি।

সকালে কালীঘাটের বাসভবন থেকে বেরিয়ে চেতলা এলাকায় যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে দলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করেন। ফিরহাদ হাকিমও বিধানসভা নির্বাচনে একজন প্রার্থী। এরপর একটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।

মমতার অভিযোগ, ‘বহিরাগত’ পর্যবেক্ষকেরা বিজেপির নির্দেশে কাজ করছেন।

মমতা সাংবাদিকদের বলেন, ‘মানুষ ভোট দিতে আসছে, এভাবে ভোট গ্রহণ চলতে পারে? তারা (পুলিশ পর্যবেক্ষকেরা) বিজেপির তালে নাচছে…নির্বাচন কমিশন আমাদের প্রকাশ্যে হয়রানি ও নির্যাতন করছে। আমরা আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠিয়েছি, তবু অসংখ্য বহিরাগত পর্যবেক্ষক এখানে আনা হয়েছে।’

পরে সেখান থেকে চক্রবেরিয়া এলাকায় তৃণমূল কাউন্সিলর অসীম বসুর সঙ্গে দেখা করে মমতা অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী গভীর রাতে তাঁর বাড়িতে ঢুকে দলীয় কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়েছে।

মমতা বলেন, তাঁদের এজেন্ট ও দলীয় কর্মীদের সরাসরি নিশানা করা হচ্ছে। ভোটকর্মীদের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে মিথ্যা অভিযোগে আটক করা হচ্ছে।

ভোটের দিন বুধবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিজেপির ভয়, দমননীতি ও সশস্ত্র শক্তির রাজনীতি বাংলায় চলবে না। যত বেশি আমাদের হয়রানি করা হবে, আমরা ততই শক্তিশালী হব।’

অন্যদিকে একই এলাকায় কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নিরাপত্তায় উপস্থিত হন মমতার প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। দুই পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি স্লোগানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু অধিকারী বুধবার অভিযোগ করেন, ‘মমতা এত লোক নিয়ে কেন ঘুরছেন?’

শুভেন্দু বলেন, ‘মানুষ ভোট দিতে বেরিয়েছে…পরিবর্তনের জন্য ভোট দিন। ভবানীপুরে উচ্চ ভোটার উপস্থিতি হবে, হয়তো ৯০ শতাংশ। তৃণমূলের কৌশল কাজ করছে না। এবার সব বুথেই বিজেপি এজেন্ট বসাতে পেরেছে।

পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে মমতাকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন শুভেন্দু। এবার তিনি নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরে এই দুই আসনে মমতার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

দুপুরের দিকে জয় হিন্দ ভবন ভোটকেন্দ্রের সামনে তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় বাহিনী হস্তক্ষেপ করে।

দুপুরের দিকে জয় হিন্দ ভবন ভোটকেন্দ্রে তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান বিনিময়কে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হলে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। এ সময় শুভেন্দুর গাড়ি মুক্তাদল মোড় এলাকায় পৌঁছালে নারী তৃণমূল কর্মীরা ‘জয় বাংলা’ ও ‘চোর চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন।

এ সময় শুভেন্দু গাড়ি থেকে নামার চেষ্টা করেন। পরে কালীঘাট এলাকার পাটুয়াপাড়ার দিকে চলে যান। কেন্দ্রীয় বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

বিকেলে মিত্র ইনস্টিটিউশন ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়ে বিজয়সূচ চিহ্ন দেখান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট দিয়ে তিনি কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে আবারও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, তৃণমূলের প্রভাব সত্ত্বেও ভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বিজেপি বড় ব্যবধানে জয়ী হবে।

শুভেন্দো আরও দাবি করেন, বিজেপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হবে। ৭১ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পারবেন না। তিনি ‘বৃদ্ধ হয়ে গেছেন’। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ‘নিজের বুথেই দুই শতাধিক ভোটের বেশি ব্যবধানে’ পরাজিত হবেন।

দিন শেষে ভবানীপুরে ভোটের হার দাঁড়িয়েছে ৮৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ।