পশ্চিমবঙ্গের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র
পশ্চিমবঙ্গের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র

মুসলমান কর্মকর্তাদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ করে জাতিসংঘে চিঠি লেখায় মামলা করেছে পুলিশ: মহুয়া মৈত্র

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি থেকে ইচ্ছা করে বাদ দেওয়া হয়েছে পুলিশের শীর্ষস্থানীয় মুসলমান কর্মকর্তাদের। সম্প্রতি জাতিসংঘের ‘স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার অন মাইনরিটি ইস্যুজ’-এর উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে এমনই অভিযোগ করেছেন তৃণমূল কংগ্রেস (মমতাপন্থী) সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র।

এই মর্মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মহুয়া মৈত্র। এ কথাও তিনি জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুক্রবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে বিষ্ণুপুর থানায় তলব করে সমন পাঠানো হয়েছে বলে দাবি মহুয়া মৈত্রের। বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। ভারতীয় জনতা পার্টিও (বিজেপি) বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেনি।

১ সেপ্টেম্বর নিজস্ব এক্স হ্যান্ডেল থেকে টুইট করে মহুয়া অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গে অমিত শাহর সফর চলাকালে বেছে বেছে মুসলিম পুলিশ কর্মকর্তাদের সব সরকারি অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, উত্তরবঙ্গ সফরের সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার ওয়াকার রাজাকে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সফরে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানেই আমন্ত্রিত হননি স্পেশাল টাস্কফোর্সের মহানির্দেশক জাভেদ শামিম। উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠক চলাকালীন কক্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের (আইএএস) প্রবীণ অফিসার খলিল আহমেদকেও। টুইটে রাজ্য প্রশাসনের এ ধরনের ‘অর্থহীন সাম্প্রদায়িক আচরণের বিরুদ্ধে’ প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান তৃণমূলের এই সংসদ সদস্য।

সেই টুইটের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে ডায়মন্ড হারবারে মহুয়ার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সাইবার ক্রাইম পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে। তবে এসব প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ সত্ত্বেও নিজের অবস্থানে অনড় থেকে মহুয়া মৈত্র জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ‘অফিস অব দ্য হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস’-এর সংখ্যালঘুবিষয়ক স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নিকোলাস লেভরাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

জাতিসংঘ নিযুক্ত বিশেষ প্রতিনিধি অধ্যাপক লেভরাট মূলত বিশ্বজুড়ে জাতীয়, জাতিগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাধা শনাক্তকরণের দায়িত্বে রয়েছেন। মহুয়া মৈত্র তাঁর চিঠিতে বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন, গত জুলাই ও আগস্ট মাসে অমিত শাহর তিনবারের পশ্চিমবঙ্গ সফরকালে এই তিন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে হয় বৈঠক ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে, নয়তো সরকারি অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নিতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

অধ্যাপক লেভরাটকে লেখা চিঠিতে মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেছেন, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সহকর্মীরা যখন নির্দ্বিধায় ও যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে সরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অনুমতি পান, তখন শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সব অনুষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, এই তিন কর্মকর্তাকে শুধু তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দূরে রাখা হয়েছে। এই প্রশাসনিক বর্জনকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁর মতে, এই কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল সরাসরি সরকারি প্রটোকল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসংক্রান্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

চিঠিতে মহুয়া মৈত্র এই পুরো ঘটনাকে একটি সুপরিকল্পিত এবং ধারাবাহিক বর্জনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ যদি সরকারি ও প্রশাসনিক স্তরে চলতে থাকে, তবে দেশের নিরাপত্তা সংস্থা ও পুলিশ প্রশাসনের ওপর সাধারণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জাতিসংঘের ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র’ এবং ‘আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি’র বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে দাবি করেন, এ ঘটনা সরাসরি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে।

তৃণমূল সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সময় এমন ঘটনা অত্যন্ত হতাশাজনক। তাঁর মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ পুলিশিব্যবস্থা, সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনী ও বিভিন্ন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যাঁর অধীন রয়েছে, সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সময় এমন ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সময় একই সঙ্গে তিন মুসলিম পুলিশ কর্মকর্তাকে ইচ্ছা করে বাদ দেওয়ার কারণ অনুসন্ধানে ভারত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধির দ্বারস্থ হয়েছেন মহুয়া মৈত্র। চিঠিতে তিনি আরও অনুরোধ করেছেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকারি অনুষ্ঠান বা কার্যক্রমে কোনো কর্মকর্তাকে শুধু তাঁর ধর্মের ভিত্তিতে যেন বাদ না দেওয়া হয়।

এ ছাড়া দেশের পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো যেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তা-ও সুনিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছেন মহুয়া। পাশাপাশি তথ্যপ্রমাণের সুরক্ষার স্বার্থে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলা সফরসংক্রান্ত সব সিসিটিভি ফুটেজ, কর্মকর্তাদের ট্যুর ডায়েরি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি অবিলম্বে সংরক্ষণ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

পরিশেষে নিজের বার্তার সমর্থনে মহুয়া মৈত্র জাতিসংঘের সংখ্যালঘুবিষয়ক প্রতিনিধিকে তাঁর পদের এখতিয়ার এবং নিজস্ব নির্দেশিকা মেনে এ বিষয়ে উপযুক্ত যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।