
‘তেলাপোকা’ দলের উত্থান, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সিবিএসই রেজাল্ট কেলেংকারির দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা দাবির মধ্যে গণমাধ্যম তোলপাড় হচ্ছে ইউটিউব শিক্ষকদের সঙ্গে গোদি মিডিয়ার একশ্রেণির ‘অনুগত’ সাংবাদিকদের দ্বন্দ্ব ঘিরে। গণমাধ্যমে তোলপাড় তোলা এই অভূতপূর্ব রেষারেষির মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন এক অতি সাধারণ চরিত্র—বিহার, ঝাড়খন্ড ও উত্তর প্রদেশের গণ্ডি পেরিয়ে উত্তর ভারতের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে যাঁর পরিচয় স্রেফ ‘খান স্যার’।
কোভিডের সময় কোচিং–জগতে ধূমকেতুর মতো যাঁর উদয়, মাত্র ৩৩ বছরের সেই ফয়সল খানকে দেখে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ অনুষ্ঠানে বিহ্বল অমিতাভ বচ্চনকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘আমি বিস্মিত, খান স্যারের ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখ।’
যাঁর কোচিং সেন্টারে দৈনিক ৪ হাজার শিক্ষার্থী ক্লাস করেন, অনলাইনে ক্লাস করেন দৈনিক ১০–১৫ লাখ, যাঁর কোচিং সেন্টার কিনতে চেয়ে প্রতিষ্ঠিত এক ‘শিক্ষা ব্যবসায়ী’ ১০৭ কোটি রুপি দর তুললেও তিনি হেলে যাননি, সেই মানুষ আজ শুধু বিতর্কের মধ্যমণিই নন, আগামী দিনে তাঁর কোচিং সেন্টার নিস্তরঙ্গ সময় অতিবাহিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ২ জুন এক সংঘর্ষের ঘটনার পর অনেক কিছুই এখন পাটনা হাইকোর্টের রায়ের ওপর নির্ভরশীল।
বিহার–সংলগ্ন উত্তর প্রদেশের দেউড়িয়া জেলায় অতি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা ফয়সল খানের স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়া। সচ্ছলতা ছিল না বলে একটি পেনসিল কিনে দুই ভাগ করে দুই ভাই স্কুলে যেতেন। সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের মতো তিনিও চাকরির আশায় চলে এসেছিলেন বিহারের রাজধানী পাটনায়।
সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন থেকে এক কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে ট্রেনিং নিয়ে ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমির লিখিত পরীক্ষায় পাসও করে যান ফয়সল খান। কিন্তু আটকে যান মেডিক্যাল পরীক্ষায়। দমে না গিয়ে ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ফয়সল বিভিন্ন সরকারি পরীক্ষায় বসার কোচিং নিতে থাকেন, পাশাপাশি পার্ট টাইম পড়াতে থাকেন। দেড় ঘণ্টার ক্লাসের জন্য তাঁর আয় হতো ১৫০ রুপি।
এত করেও চাকরি পাননি ফয়সল খান। কিন্তু পড়ানো ও বিশেষ করে বোঝানোর গুণে ক্রমেই তিনি হয়ে ওঠেন খান স্যার। পাটনাতেই গড়ে তোলেন খান গ্লোবাল স্টাডিজ। শীর্ষস্থানীয় নামী সংস্থাগুলোয় কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (ইউপিএসসি) কোর্স ফি যেখানে দেড় থেকে আড়াই লাখ রুপি, খান স্যার সেখানে সেই পরিষেবা দিতে থাকেন মাত্র সাড়ে ৭ থেকে ১২ হাজার রুপির মধ্যে।
সমাজের দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের স্বপ্ন দেখানো শুরু করেন খান স্যার। বিভিন্ন পরীক্ষার নানা ধরনের কোর্স শুরু করেন, যাতে যাঁর যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু কোচিং নেওয়া যায়। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ফয়সল খানের লক্ষ্যই ছিল প্রান্তিক মানুষের জীবনের গতিবদল।
রাজস্থানের কোটা, দিল্লির মুখার্জি নগর কিংবা উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজ (সাবেক এলাহাবাদ) যে সময় দেশের কোচিং হাব বলে পরিচিত, খান স্যার তখন শিক্ষার্থীদের নজর পাটনার দিকে ফেরাতে বাধ্য করেন কোভিডের কারণে। শুরু করেন অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা। ব্যবহার করেন ইউটিউবকে। অন্যদের চেয়ে তিনি বেশি সাফল্য পেতে থাকেন পড়ানোর টেকনিকের কারণে।
খান স্যার যেকোনো বিষয় হিন্দিতে এমন চমৎকারভাবে বোঝান যে তা শিক্ষার্থীদের মগজে গেঁথে যায়। ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে অমিতাভ বচ্চন তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন নিউট্রন, প্রোটন ও ইলেকট্রনের তুলনা ও ব্যাখ্যা দিতে। ফয়সল খান সেদিন তাঁর সঙ্গে আসা আরেক অতিথি কৌতুকশিল্পী জাকির খান ও অমিতাভ বচ্চনের ব্যক্তিত্বের তুলনা করে সেই ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। শুনে মুগ্ধ অমিতাভ বলেছিলেন, ‘এখন বুঝছি, কেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী খান স্যারের গুণমুগ্ধ।’
কোভিডের পর ফয়সল খান তাঁর সংস্থার পরিধি বাড়িয়ে দেন। শুরুতে যেখানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৫০০, কোভিডের পর তা ৪ হাজার ছাড়িয়ে যায়। বিভিন্ন চ্যানেলে বেড়ে চলে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা। বিহারের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি কোচিং সেন্টার খুলে ফেলেন দিল্লির মুখার্জি নগর ও করোলবাগে, উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজ ও নয়ডায়, উত্তরাখন্ডের দেরাদুনে।
শুধু কোচিং সেন্টারই নয়, ৩৩ বছর বয়সে খান স্যার খুলে ফেলেছেন সস্তার স্বাস্থ্য পরিষেবা খান হেলথকেয়ার হসপিটাল, খান ব্লাড (ডায়াগনসিস) সেন্টার। খান স্যার ফাউন্ডেশন নামে খুলেছেন এক পাঠাগার নেটওয়ার্ক, যাতে প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষার্থীরা সহজে বই পেতে পারেন। ছোট আকারে হলেও শুরু করেছেন পরিত্যক্ত গরু, বলদের জন্য এক গোশালা।
ফয়সল খানের অনুগামীদের দাবি, কোচিং সেন্টারকে সর্বজনীন করে তোলাই হয়েছে তাঁর কাল। কারণ, তাঁর শত্রুসংখ্যা বেড়ে গেছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কোচিং–ব্যবস্থা সাধারণের নাগালে পৌঁছে দেওয়ার কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছে প্রতিষ্ঠিত কোচিং ‘মাফিয়ারা’।
পাটনার কোচিং হাব মুসল্লাপুরে খান গ্লোবাল স্টাডিজের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জ্ঞান বিন্দু কোচিং সেন্টার। ফয়সাল খানের মতোই এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া রওশন আনন্দ ওই কোচিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা। দুজনের উত্থানকাহিনিও একই রকম। দুজনের লক্ষ্যও এক। দুজনেই চান সীমিত খরচে সাধারণের কাছে কোচিং পৌঁছে দিতে। দরিদ্রদের সহায়ক হতে। ফয়সল খানের দৃষ্টি যদি হয় অনলাইন–সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা, রওশন আনন্দের নজর তাহলে অফলাইন ক্লাসের রাজত্ব।
দুই কোচিং সেন্টারের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতাও যে নেই, তা নয়। খান স্যার ধুমধাম করে রাখি উৎসব পালন শুরু করেছেন। ফি বছর সব সেন্টারে সরস্বতীপূজার আয়োজন করেন। নিজের বিয়ে উপলক্ষে ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর ভোজ দিয়েছেন। রওশন আনন্দ তেমনই বিহার পুলিশ সাব–ইন্সপেক্টর পরীক্ষায় তাঁর সেন্টারের কৃতী ২০ জনকে মোটরবাইক উপহার দিয়েছেন। তাঁর কোচিং সেন্টারে অংশ নেওয়ার অর্থ নাকি পুলিশের পরীক্ষায় সাফল্য লাভ।
এই পেশাদারি রেষারেষি থেকেই ২ জুন দুই কোচিং সেন্টারের মধ্যে গোলমাল শুরু। অভিযোগ, রওশনের অনুগামীদের নিশানা হয় খান গ্লোবাল স্টাডিজ। ইটপাটকেল ছোড়া হয়। ভাঙচুর চলে খান স্যারের প্রতিষ্ঠানে। সংস্থার নিরাপত্তারক্ষীরা আত্মরক্ষায় গুলি ছোড়েন।
ফয়সল অভিযোগ করেন জ্ঞান বিন্দুর পরিচালক রওশন আনন্দের বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। রওশন আনন্দকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। খান স্যারের নিরাপত্তারক্ষীরা আবার জবানবন্দিতে বলেন, নিয়োগকর্তার নির্দেশেই তাঁরা গুলি ছুড়েছিলেন। সেই স্বীকারোক্তি বিপাকে ফেলেছে ফয়সল খানকে। বিষয়টি এখন পাটনা জেলা আদালত ও পাটনা হাইকোর্টের বিবেচনাধীন।
এই পরিস্থিতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। নিট ও সিবিএসই কেলেংকারি নিয়ে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) উত্থান ও আন্দোলন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যখন তোলপাড়, ফয়সল খান ও তাঁরই মতো প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় অনলাইন কোচিং সেন্টারের শিক্ষকেরা তখন সরকারের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রশ্ন ফাঁস–সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে সরব।
শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি, বারবার প্রশ্ন ফাঁস সত্ত্বেও সরকারের কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার সমালোচনা করে তাঁরা যেসব প্রশ্ন তোলেন, সরকার তাতে বিপন্ন বোধ করতে থাকে।
ফয়সল খান ও অন্য ইউটিউব শিক্ষকেরা দুর্নীতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে সরাসরিই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ২০২৪ সালেও নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। সরকার কিছু করেনি। কারও চাকরি যায়নি। কাউকে দায়ী করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন আজও প্রকাশিত হয়নি।
২০২৬ সালেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সরকার একই রকম নির্বিকার। সরকার অনুগত গণমাধ্যমের সমালোচনা করে তাঁরা বলেন, গোদি মিডিয়ার নজর এই ভয়ংকর প্রবণতার দিকে পড়ে না। তারা চাটুকারিতায় মগ্ন।
এই সমালোচনার কারণে ‘সরকার অনুগত’ এক টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ফয়সল খানের মতো ইউটিউব শিক্ষকদের ‘দুই পয়সার’ সঙ্গে তুলনা করলে বিতর্ক চরমে ওঠে। ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সমস্বরে আওয়াজ তোলেন ইউটিউব শিক্ষকেরা।
ফয়সল খান ও অন্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক অঞ্জনা ওম কাশ্যপ ২ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ নিয়ে সরগরম।
সরগরম রাজনীতিও। শিক্ষা দুর্নীতি ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ‘তেলাপোকারা’ ছড়িয়ে পড়ছেন দিকে দিকে। দিল্লির পর তারা সফল সমাবেশ করেছে পুনে ও লক্ষ্ণৌয়ে। ক্রমেই বিক্ষোভ হবে দেশের অন্যত্র। নিরবচ্ছিন্নভাবে। ইউটিউব শিক্ষক ও তেলাপোকারা সরকার বিরোধিতার এক অন্য নজির সৃষ্টি করেছেন।