ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথ অনুসরণ করতে চলেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ভোটে তাঁরা হারেননি। চক্রান্ত করে, ১০০ আসন লুট করে তাঁদের জবরদস্তি করে হারানো হয়েছে। অতএব ইস্তফা তিনি দেবেন না। রাজভবনে যাবেন না। পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হলেও হুকুম মানবেন না।
তা হলে কী হবে। বিকেল থেকেই রাজ্যে এই নিয়েই শুরু হয়েছে জল্পনা। তবে তিনি পদত্যাগ করুন আর না–ই করুন, বিজেপি সরকার গড়তে কাজ শুরু করে দিয়েছে। বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতা আসছেন। বিধায়কেরা তাঁদের মধ্য থেকে পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচন করবেন।
মমতা যে এমন আচরণ করবেন, গত সোমবারও সে রকম ইঙ্গিত ছিল না। সকাল থেকেই সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোট গণনা চলছিল। রাতে গণনা শেষ হওয়ার আগেই হার নিশ্চিত দেখে তিনি গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যান। মনে করা হচ্ছিল, তিনি হয়তো সোজা চলে যাবেন রাজভবনে। কিন্তু তা না করে চলে যান কালীঘাটে নিজের বাড়ি। তখনই জানাজানি হয়, মঙ্গলবার বিকেলে অভিষেককে সঙ্গে নিয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলন করবেন। বিকেলে সেখানেই তিনি জানান, রাজভবনে যাবেন না। পদত্যাগও করবেন না। কারণ, তিনি হারেননি। জোর করে হারানো হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঠিক এমনই করেছিলেন ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে হেরে। নির্বাচনের ফল মানতে চাননি। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আইনি লড়াই করে ফল বদলে দেবেন বলেছিলেন। মামলা তিনি করেও ছিলেন। তবে সব মামলাই খারিজ হয়ে যায়।
পরে ৭ জানুয়ারি ট্রাম্পের সমর্থকেরা ক্যাপিটল হিলে হামলা করেন। পরের দিন এক ভিডিও বার্তায় জাতিকে তিনি বলেন, নতুন এক প্রশাসন দেশের দায়িত্ব নেবে। সেই বার্তায় বাইডেনের নাম পর্যন্ত তিনি উচ্চারণ করেননি।
মঙ্গলবার বিকেলে এ রকম ট্রাম্পোচিত আচরণ করলেও নির্বাচনী ফলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত মমতা দেননি। দেশের কোনো রাজ্যের কোনো মুখ্যমন্ত্রী কখনো এমন পরিস্থিতিতে পদত্যাগ না করার গোঁ ধরেও থাকেননি। সংবিধান রচয়িতারাও এমন পরিস্থিতি আসতে পারে বলে ভাবেননি। কাজেই এমন হলে কী হবে, সেই নির্দেশ সংবিধানে নেই।
মমতা তাঁর জেদ আঁকড়ে বসে থাকলে এক নতুন নজির সৃষ্টি করবেন, এই যা। হেরে গিয়ে পদত্যাগ করাটা এ দেশের রেওয়াজ। সব মুখ্যমন্ত্রী সব প্রধানমন্ত্রী এতকাল সেটাই করে এসেছেন। সেদিক থেকে মমতা হবেন ব্যতিক্রমী।
মমতার এ ঘোষণা অবশ্য কোনো ধরনের সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করবে না। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার, ৭ মে। তারপর মমতা আর মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন না। পদত্যাগ না করলেও তিনি হয়ে যাবেন ‘সাবেক মুখ্যমন্ত্রী’। তখন তাঁর ইস্তফা দেওয়া না–দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বহীন ও অর্থহীন হয়ে যাবে। দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জেতা বিজেপির পরিষদীয় দল যাঁকে নেতা নির্বাচন করবে তিনিই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন।
বৃহস্পতিবারের পরদিন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ নিলে একরকম। না নিলে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য রাজ্যপাল প্রশাসনের শীর্ষে থাকবেন। শোনা যাচ্ছে, আগামী শনিবার, ৯ মে, রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হতে পারে। অতঃপর প্রশ্ন, কী করবেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা? আহত বাঘিনীর মতো রুখে দাঁড়াবেন, নাকি বয়সের ভারে ভাগ্যকে মেনে অবসন্ন হৃদয়ে ধীরে ধীরে সরে যাবেন পাদপ্রদীপের আলো থেকে? প্রশ্নটি আলোচিত হচ্ছে।
এটা এখন মোটামুটি নিশ্চিত, এখনই রাজ্যে মাথা তুলে দাঁড়ানো মমতার পক্ষে অসম্ভব। বিপুল রায়ের পর জন–অসন্তোষ, বিজেপির সর্বভারতীয় শক্তি এবং অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তীক্ষ্ণ নজরদারি মমতা ও তাঁর দলকে দাবিয়ে রাখবে। তাঁর সামনে বিচরণের একমাত্র আঙিনা সর্বভারতীয় রাজনীতি। সেখানে কোন ভূমিকায় তাঁকে দেখা যাবে, সময় তা জানিয়ে দেবে।
এই নির্বাচনের আগে সর্বভারতীয় বিরোধী রাজনীতির পরিসরে মমতার যে অবস্থান ছিল, হারের পর অবশ্যই তাতে বদল ঘটবে। যে অবস্থান থেকে এত দিন তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিরোধী রাজনীতিতে নিজের অভিমত যেভাবে জাহির করেছেন, এখন তা পারবেন কি?
সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে শ্রদ্ধামিশ্রিত সুসম্পর্ক থাকলেও মমতা কোনো দিনই নেতা হিসেবে রাহুল গান্ধীকে মেনে নেননি। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ তৈরি হওয়ার সময়েও নেতৃত্বের প্রশ্নে তিনি রাহুলের বিরোধিতা করে গেছেন। নীতীশ কুমার যত দিন ‘ইন্ডিয়া’ জোটে ছিলেন, রাহুলের পরিবর্তে তাঁকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। সম্পর্কের রসায়ন এমন ছিল যে রাহুলের ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’–কেও তিনি গুরুত্ব দিতে চাননি। সংসদীয় অধিবেশন চলাকালে বিরোধীদের মধ্যে ‘ফ্লোর কো–অর্ডিনেশনে’ তৃণমূল সব সময় সম্মত হননি। বারবার চেষ্টা করেছে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে। কংগ্রেস থেকে একটু আলাদা থাকতে।
মমতার সেই আচরণ নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির পক্ষে সহায়ক ছিল। মোদি সব সময় চেয়েছেন কংগ্রেসকে দুর্বল রাখতে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধীরা যাতে জোটবদ্ধ হতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে। কারণ, বিজেপির কাছে সর্বভারতীয় পর্যায়ে এখনো কংগ্রেসই মূল প্রতিপক্ষ। দুর্বল হলেও বিরোধীদের মধ্যে এখনো তারাই একমাত্র দল, যার সর্বভারতীয় উপস্থিতি রয়েছে। সেই দলকে নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখতে পারলে বিজেপির লাভ। মমতা তাঁদের সেই চাহিদা বারবার পূরণ করে এসেছেন।
বিভিন্ন রাজ্যে প্রার্থী দিয়ে কংগ্রেসের ভোটে ভাগ বসানো ছাড়াও প্রকাশ্যে রাহুলের নেতৃত্ব ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। মোদিও নানা বিষয়ে মমতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুর্নীতির’ বিরুদ্ধে তদন্ত হলেও তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বারবার জেরা করলেও কেন কাউকে ইডি বা সিবিআই এখনো গ্রেপ্তার করেনি, জনতার পাশাপাশি বিভিন্ন দলের নেতারা বারবার সেই প্রশ্ন তুলেছেন। এ থেকেই জন্ম ‘দিদি–মোদি সেটিং’ তত্ত্ব।
রাজনৈতিক মহলে এই তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা ও জল্পনার অন্ত ছিল না। কানাকানি হতো, ‘রাজ্যে দিদি–মোদির কুস্তিটা নকল, কেন্দ্রে দুজনের দোস্তিটাই আসল।’ দিল্লি গিয়ে মোদির সঙ্গে মমতা একা দেখা করতেন।
এবারের ভোটের ফল সেই তত্ত্ব পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিল। সেই সঙ্গে তুলে দিল মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা। গত সোমবার ভোটের ফল নিশ্চিত হওয়ার পর রাহুল ফোন করেছিলেন মমতাকে। মমতার ‘১০০ আসনে ভোট চুরির’ অভিযোগকে রাহুল সমর্থন করেছেন। তিনি অবশ্যই চাইবেন শর্তহীন মমতাকে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে বেশি করে শামিল করতে। রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে পরাস্ত ও বিপর্যস্ত মমতারও হয়তো এ ছাড়া অন্য উপায় নেই।