গৌতম আদানি
গৌতম আদানি

আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে কী শর্তে জালিয়াতির মামলা প্রত্যাহার হচ্ছে

  • প্রসিকিউটরদের অভিযোগ ছিল, আদানি সৌর প্রকল্পের জন্য ঘুষ দিয়েছেন, যা তিনি অস্বীকার করেছেন।

  • আদানি ও তাঁর ভাইপো এসইসির দেওয়ানি জালিয়াতি মামলা ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে নিষ্পত্তি করেছেন, তবে কোনো দোষ স্বীকার করেননি।

  • আদানির আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, এই মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আইনি এখতিয়ার বা যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

ভারতের আলোচিত ব্যবসায়ী ধনকুবের গৌতম আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে করা ফৌজদারি জালিয়াতির অভিযোগ প্রত্যাহার করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। আদানি মার্কিন অর্থনীতিতে ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের বরাতে এ খবর দেওয়া হয়েছে।

আদানির বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) করা একটি দেওয়ানি জালিয়াতি মামলা গত বৃহস্পতিবার নিষ্পত্তি হয়েছে। ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছিল। মামলাটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির জন্য আদালতের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহারের প্রতিবেদনের বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে আদানি গ্রুপ কোনো সাড়া দেয়নি। তবে আগে তারা এই অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছিল।

আজ শুক্রবার ভারতীয় শেয়ারবাজারে আদানি গ্রুপের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম শুরুতে বাড়লেও পরে মিশ্র অবস্থায় ছিল। গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানি ‘আদানি এন্টারপ্রাইজেস’ লেনদেনের শুরুতে ৩ দশমিক ২ শতাংশ বাড়লেও পরে তা কমে ০ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়।

‘আদানি গ্রিন এনার্জি’র দাম ০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ এবং ‘আদানি এনার্জি সলিউশনস’-এর দাম ১ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ‘আদানি পোর্টস’-এর দাম ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে।

সূত্র জানায়, আদানির আইনজীবী রবার্ট জিউফ্রার একটি উপস্থাপনার পর ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহারের এই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জিউফ্রা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও ব্যক্তিগত আইনজীবী। গত মাসে বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে এক উপস্থাপনায় তিনি বলেছিলেন, মামলা চলাকালে আদানি তাঁর প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিনিয়োগ করতে পারবেন না।

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, আদানির প্রতিনিধিরা তাঁদের একটি স্লাইডে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রসিকিউটররা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিলে তবে এই ধনকুবের যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং প্রায় ১৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রসিকিউটররা পরে জিউফ্রাকে (আদানির আইনজীবী) জানান, এ প্রস্তাব মামলার ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না। যদিও বৈঠকের সময় একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রস্তাবের প্রতি ‘ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া’ দেখিয়েছিলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানিয়েছেন, জিউফ্রা তাঁর ১০০ পৃষ্ঠার উপস্থাপনার বেশির ভাগ অংশেই যুক্তি দিয়েছেন, মামলাটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ, এতে আইনি এখতিয়ার এবং প্রমাণের অভাব রয়েছে। গত মাসে এসইসির সমান্তরাল দেওয়ানি মামলাতেও তিনি একই যুক্তি দিয়েছিলেন।

তবে এক প্রসিকিউটর স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ১ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ এ মামলার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। অন্য কর্মকর্তারা বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। মার্কিন বিচার বিভাগও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে করা হাই প্রোফাইল ফৌজদারি মামলা বাতিলের সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে আদানির মামলা।

ফেডারেল প্রসিকিউটররা ২০২৪ সালের নভেম্বরে আদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, ভারতের বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির অনুমোদন পেতে আদানি ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের প্রায় ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঘুষ দিতে রাজি হয়েছিলেন।

প্রসিকিউটররা আরও বলেছিলেন, আদানি ও তাঁর সহযোগীরা ঋণদাতা ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে দুর্নীতির তথ্য গোপন করে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ ও বন্ড সংগ্রহ করেছেন। আদানি গ্রুপ বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি জালিয়াতি মামলার নিষ্পত্তি

আদালতের রেকর্ড অনুযায়ী, আদানি এসইসির একটি দেওয়ানি জালিয়াতি মামলারও আসামি হয়েছিলেন, যা গত বৃহস্পতিবার আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। তাঁর ভাইপো সাগর আদানিও এ মামলার আসামি ছিলেন।

আদালতের নথিতে দেখা গেছে, আদানি ও তাঁর ভাতিজা ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার দেওয়ানি জরিমানা দিতে রাজি হয়েছেন। অবশ্য তাঁরা কোনো দোষ স্বীকার বা অস্বীকার করেননি।

‘আদানি গ্রিন এনার্জি’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ও এসইসি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য নিউইয়র্কের একটি আদালতে আবেদন করেছে, যা এখন অপেক্ষমাণ।

গত মাসে আদানির আইনজীবীরা বলেছিলেন, এসইসির অভিযোগের পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। তাঁরা এসইসির দাবিগুলোকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক’ বলে অভিহিত করে বলেছিলেন, ওই বন্ডগুলো কখনো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে এসব মামলা প্রত্যাহার আদানি গ্রুপের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর হলেও ভারতে অন্তত নয়টি অভিযোগের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুটি সূত্র জানিয়েছেন, আদানি গ্রুপ ও তাদের অফশোর তহবিলগুলো সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, ভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তা এখনো খতিয়ে দেখছে।

ভারতের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড (এসইবিআই) এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। গত বছর এসইবিআই স্টক ম্যানিপুলেশন এবং ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের তিনটি অভিযোগ থেকে আদানি ও তাঁর কর্মকর্তাদের অব্যাহতি দিয়েছিল। ওই সব অভিযোগ এনেছিল মার্কিন শর্ট-সেলার প্রতিষ্ঠান হিনডেনবার্গ রিসার্চ।