
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়া সেই হাই-প্রোফাইল ‘ভাড়ায় খুনের’ মামলায় ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্ত গত শুক্রবার নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে দোষ স্বীকার করেছেন।
৫৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তি যখন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে খালিস্তানি আন্দোলনের নেতা মার্কিন নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্রে নিজের ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন, তখন এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার এক বিরল ও অকপট চিত্র সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ভারত সরকারের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার যোগসূত্র ছিল।
১৩ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিচারক সারাহ নেটবার্নের সভাপতিত্বে এই শুনানিতে সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নি কামিল ফ্লেচার, আলেকজান্ডার লি, অ্যাশলে নিকোলাস এবং নিখিল গুপ্তের আইনজীবী ডেভিড টুজারসহ একটি বড় আইনি দল উপস্থিত ছিল।
গুপ্ত মূলত ইংরেজিতেই কথা বলছিলেন। তবুও আইনি বিষয়ের সূক্ষ্ম দিকগুলো যাতে তিনি সঠিকভাবে বুঝতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে উমেশ সি পাসি এবং মধু মিশ্র নামে দুজন হিন্দি দোভাষীকে সেখানে শপথ পাঠ করানো হয়েছিল। শুনানির সময় নিখিল গুপ্ত বলেন, বন্দী থাকাকালে তাঁর ইংরেজি বেশ উন্নত হয়েছে। তবে তাঁর প্রবেশন ইন্টারভিউয়ের সময় তিনি তাঁর আইনজীবীর উপস্থিতি চেয়েছেন।
দোষ স্বীকার করার আগে বিচারক নেটবার্ন একটি পদ্ধতিগত বিষয় পরিষ্কার করেন। সেই অনুযায়ী নিখিল গুপ্ত ডিস্ট্রিক্ট জজের পরিবর্তে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তাঁর দোষ স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। মার্কিন ফেডারেল সিস্টেমে এটি একটি সাধারণ নিয়ম, যেখানে আসামি প্রক্রিয়াটি দ্রুত করতে ডিস্ট্রিক্ট জজের পরিবর্তে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে প্রাথমিক দোষ স্বীকার করেন।
অবশ্য, চূড়ান্ত সাজার রায় ডিস্ট্রিক্ট জজই দেবেন।
নিখিল গুপ্ত নিশ্চিত করেন, তিনি এই অধিকারের বিষয়টি বোঝেন এবং তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এরপর বিচারক তাঁর বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ পড়ে শোনান—ভাড়ায় খুনের ষড়যন্ত্র, ভাড়ায় খুনের মূল কাজ এবং অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্র।
যখন নিজের দোষ স্বীকারের সপক্ষে বর্ণনা দেওয়ার সময় আসে, তখন আদালত নিখিলকে নিজের ভাষায় সব বলতে বলেন। আদালতের ট্রান্সক্রিপ্ট থেকে প্রাপ্ত কথোপকথনটি হুবহু নিচে দেওয়া হলো—
আসামি: ২০২৩ সালের বসন্তকালে আমি অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এক ব্যক্তিকে হত্যার পরিকল্পনা করতে রাজি হয়েছিলাম। সেই অপরাধকে এগিয়ে নিতে আমি সেলফোন বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অন্য একজনকে ১৫ হাজার ডলার নগদ অর্থ পাঠিয়েছিলাম।
নিখিল গুপ্ত এরপর পরিষ্কার করেন, অর্থ দেওয়ার সময় তিনি ভারতে থাকলেও জানতেন, অর্থ গ্রহণকারী এবং যাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, দুজনই নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে ‘কুইন্স’ এলাকার কথা উল্লেখ করেন।
শুনানির সময় আদালত জানান, নিখিল গুপ্ত তার আবেদন পরিবর্তন করে দোষ স্বীকার করতে চান—এ কথা তাদের আগেই জানানো হয়েছিল। গুপ্ত নিশ্চিত করেছেন, অভিযোগপত্রটি ইতিমধ্যে তাঁর জন্য অনুবাদ করা হয়েছে। আদালতে আসার আগে তিনি তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে দোষ স্বীকারের ‘ভালো ও মন্দ’ দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
এই অপরাধ প্রমাণিত হলে নিখিল গুপ্তের সর্বোচ্চ ৪০ বছরের সাজা হতে পারে। ভাড়ায় খুনের দুটি অভিযোগে ১০ বছর করে এবং অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্রের জন্য ২০ বছর। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ‘পিমেন্টেল লেটার’ (সাজার সম্ভাব্য হিসাব–সংবলিত আনুষ্ঠানিক চিঠি) অনুযায়ী, তাঁর সাজা ২৩৫ থেকে ২৯৩ মাস (প্রায় ১৯ বছর ৫ মাস থেকে ২৩ বছর ৫ মাস) হতে পারে।
এ ছাড়া নিখিলকে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। নিখিল গুপ্ত নিশ্চিত করেছেন, শুনানির আগে তিনি এই চিঠিটি দেখেছেন এবং আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
নিখিল গুপ্তের জন্য ২৩৫ থেকে ২৯৩ মাসের এই সাজার সীমাটি মার্কিন ফেডারেল বিচারব্যবস্থায় ব্যবহৃত ‘সেনটেন্সিং গাইডলাইনস’ নামক একটি জটিল গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রসিকিউটররা আদালতকে জানান, নিখিল গুপ্তের ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা বা ‘টোটাল অফেন্স লেভেল’ ৩৮-এ পৌঁছেছে, যা তাঁর সাজার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
আদালত মামলাটির জন্য আগামী ১৫ মে একটি ‘কন্ট্রোল ডেট’ নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে প্রবেশন বিভাগকে একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। মার্কিন ফেডারেল আদালতে ‘কন্ট্রোল ডেট’ হলো এমন একটি সময়সীমা, যার মাধ্যমে আদালত নিশ্চিত করেন, প্রবেশন অফিস আসামির জীবনবৃত্তান্ত ও অপরাধের বিস্তারিত বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেছে কি না। এটি আগামী ২৯ মে ডিস্ট্রিক্ট জজ ভিক্টর মারেরোর চূড়ান্ত সাজা ঘোষণার প্রস্তুতির অংশ বলা যেতে পারে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করা নিখিল গুপ্ত চেক প্রজাতন্ত্রে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁকে ২০২৪ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে তিনি প্রায় তিন বছর ধরে মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন।
মার্কিন ব্যুরো অব প্রিজনসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক নগরের ‘মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার ব্রুকলিন’-এ বন্দী আছেন। সাজা ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই থাকবেন।