
চীনের প্রতিষ্ঠানের বরাত পাওয়ার ওপর থেকে ভারত সরকার কি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চলেছে? সরকারিভাবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো না হলেও ইতিমধ্যেই এ নিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে গতকাল শুক্রবার বলেছেন, কেন্দ্রীয় উদ্যোগ নিয়ে রটনা ঠিক হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সংসদের আসন্ন অধিবেশনে জবাবদিহি করতে হবে।
বিতর্কের কারণ সরকারি নীতি। ২০২০ সালের জুন মাসে পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে চীনের সৈন্যদের আক্রমণে ২০ জন ভারতীয় সৈনিক নিহত হয়েছিলেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, সেই সময় থেকে চীনের ফৌজ বহু ভারতীয় এলাকায় ঢুকে পড়ে এবং এখনো অনেক জায়গায় তারা বসে আছে। সংঘর্ষ পূর্ববর্তী স্থানে ফিরে যায়নি। সেই সংঘর্ষের পর কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বরাত পেতে চীনের সংস্থাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
তখন থেকে নিষেধাজ্ঞার কারণে এখনো চীনের কোনো সংস্থা সরকারি প্রকল্পের বরাতে দরপত্র দিতে পারে না। ইদানীং শোনা যাচ্ছে, সরকার নাকি সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে চলেছে।
জল্পনা অনুযায়ী, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদসচিব রাজীব গাউবার নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। শোনা যাচ্ছে, সরকার নাকি ‘দেশের অর্থনীতির স্বার্থে’ ওই প্রস্তাব মেনে নেওয়ার পক্ষে।
এই জল্পনাই মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মল্লিকার্জুন খাড়গে সরকারের পররাষ্ট্রনীতিকে দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামের দোদুল্যমানতার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
খাড়গে সরকারি নীতির সমালোচনা করে বলেছেন, যে দেশের সেনারা গালওয়ানে ভারতীয় জওয়ানদের প্রাণ নিল, মোদি সরকার এখন তাদের সংস্থাদের জন্য লাল কার্পেট বিছিয়ে দিতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি মুখে যা বলেন, কাজ করেন তার বিপরীত।
খাড়গে বলেন, দেশের মাথা নত হতে দেবেন না, অথচ যা করতে চলেছেন তা নতমস্তক হওয়ারই শামিল।
একইভাবে মোদি সরকারের সমালোচনা করেছেন কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশও। তিনি এই ক্ষেত্রে দেশের উপ–সেনাপ্রধান লে. জেনারেল রাহুল সিংহের বলা এক মন্তব্যের উল্লেখ করেছেন। অপারেশন সিঁদুরের পর উপ–সেনাপ্রধান বলেছিলেন, চার দিনের ওই সংঘাতের সময় পাকিস্তানকে চীন সব রকমভাবে সহায়তা করেছে।
সেই কথা মনে করিয়ে দিয়ে রমেশ বলেন, উপ–সেনাপ্রধান বলেছিলেন, চীনই ভারতের প্রকৃত প্রতিপক্ষ। অথচ আশ্চর্য, পাঁচ বছর আগে সেই প্রতিপক্ষের ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞাই সরকার বাতিল করতে চলেছে।
জয়রাম রমেশ বলেন, এর আগে চীনা সংস্থাকে ইলেকট্রনিকস ক্ষেত্রে লগ্নির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। চীনা কর্মীদের জন্য ভিসার নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। এখন সরকারি বরাতে দরপত্র দেওয়ার ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার রাস্তাতেও সরকার হাঁটতে চলেছে।
বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে, চীনা সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির দরুণ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প শেষ হতে বিলম্ব হচ্ছে। অনেক প্রকল্প শুরু হলেও শেষ হচ্ছে না। তাতে প্রকল্প খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
রাজীব গাউবা কমিটি তাই দেশের অর্থনীতির স্বার্থে সিদ্ধান্ত বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
গালওয়ানে সংঘর্ষের পর কেন্দ্রীয় সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, যেসব দেশের সঙ্গে ভারতের সীমানা রয়েছে সেসব দেশের সংস্থাদের ভারতের সরকারি প্রকল্পগুলোতে অংশ নিতে হলে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিশেষ ছাড়পত্র নিতে হবে।
এই নিয়মের কারণে চীনের বহু প্রতিষ্ঠান ভারতের রেল, টেলিকম, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্পে অংশ নিতে পারছে না। এতে বহু প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। কোনো কোনো প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। এতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
এই বিধিনিষেধের ফলে চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কোটি ডলার অর্থমূল্যের ভারতীয় প্রকল্পে অংশ নিতে পারেনি। চীনের সিআরআরসি নামের প্রতিষ্ঠানের হাতছাড়া হয়েছিল ১ হাজার ৮০০ কোটি রুপিতে ৪৪টি বন্দে ভারত ট্রেন তৈরির প্রকল্প।
গালওয়ান সংঘর্ষের পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘসহ (আরএসএস) বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন চীনের পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিল। তারা আন্দোলনও শুরু করেছিল। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।
সেই সময় দিল্লিতে চীনা রাষ্ট্রদূত সংবাদ সম্মেলন করে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, তেমন পদক্ষেপ ভারতেরই ক্ষতি করবে। ভারতীয় অর্থনীতি বিপর্যন্ত হবে।