মেটার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান এআই–বিজ্ঞানী ইয়ান লেকুন সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ৫৫তম বার্ষিক সভায়। ২৩ জানুয়ারি, ২০২৫
মেটার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান এআই–বিজ্ঞানী ইয়ান লেকুন সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ৫৫তম বার্ষিক সভায়। ২৩ জানুয়ারি, ২০২৫

এআই এখনো অতটা বুদ্ধিমান নয়, বললেন এআই–বিজ্ঞানী

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি হটিয়ে দেবে বাস্তব বুদ্ধিমত্তাকে, বিশ্বজুড়ে আলোচনা যখন এ নিয়ে; তখন ভিন্ন সুর শোনা গেল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতের নেতৃস্থানীয় একজন ব্যক্তির কণ্ঠে। তাঁর মতে, প্রচলিত এআই এখন বুদ্ধিমত্তার সেই স্তরে পৌঁছায়নি।

কথাটি ইয়ান লেকুনের। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাস্তব জগতকে বোঝার সক্ষমতায় আমাদের তৈরি রোবটগুলো একটি ইঁদুরের ধারেকাছেও নেই।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত লেকুন। তিনি ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটায় এক দশক ধরে প্রধান এআই–বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছেন। তবে ২০২৫ সালে তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন অ্যাডভান্সড মেশিন ইন্টেলিজেন্স ল্যাবস (এএমআই ল্যাবস)।

চ্যাটজিপিটি, ক্লড বা জেমিনাইয়ের মতো বর্তমান এআই প্রযুক্তিকে ছাপিয়ে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য। তিনি মনে করেন, এসব প্রযুক্তির ব্যবহার থাকলেও এগুলো বাস্তব জগতের জটিল কাজগুলো সমাধান করতে পারবে না। যেমন একটি রোবটকে দিয়ে ঘরের সাধারণ কাজ করানো বর্তমান এআইয়ের পক্ষে সম্ভব নয়।

ফ্রান্সের প্রযুক্তি সম্মেলন ভিভাটেকে লেকুন বলেন, ‘এগুলো মানবস্তরের বা প্রাণীর মতো বুদ্ধিমত্তার পথে হাঁটছে না। কারণ, এগুলো বাস্তব বিশ্বের তথ্য নিয়ে কাজ করতে পারে না। আসলে এগুলো সেভাবে তৈরিই করা হয়নি।’

তাই প্যারিসভিত্তিক এএমআই ল্যাবস এমন এক নতুন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছে, যা চ্যাটজিপিটির প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি।

বিনিয়োগকারীরাও এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন। এ বছরই এএমআই ল্যাবস ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূলধন সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে। এই তালিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্রের চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া এবং অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবস্থাপনা তহবিল।

স্টার্টআপগুলোর প্রাথমিক পর্যায়ের তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে এটি ইউরোপের বড় ঘটনার একটি।

লেকুন বলেন, চ্যাটজিপিটির মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (এলএলএম) কোডিং, গণিত বা লেখা তৈরির মতো কাজে খুব দক্ষ। তবে তিনি মনে করেন, এগুলো কেবল সুনির্দিষ্ট ও অনুমানযোগ্য কাজ।

লেকুনের ভাষায়, ‘এগুলো মূলত তথ্য জমা করে। আপনি এদের শেখালে এরা সেই তথ্যের পুনরাবৃত্তি করতে পারে। তবে এগুলো খুব একটা বুদ্ধিমান নয়। এদের কোনো মৌলিক বোধগম্যতা নেই।’

চীনের গুয়াংদং প্রদেশের শেনঝেনে সরকার আয়োজিত একটি মিডিয়া ট্যুর চলাকালে ইউবিটেকের শোরুমে দাঁড়িয়ে মানবাকৃতির একটি রোবট। ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

বাস্তব জগতে যেকোনো কাজের ফলাফল হতে পারে অকল্পনীয়। আর এর জন্য দরকার আরও নমনীয় ও বুদ্ধিমান প্রযুক্তি।

নিজের যুক্তির ব্যাখ্যা দিতে লেকুন একটি কলম খাড়া করে দাঁড় করান। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা ছেড়ে দিলে কী হবে? যেকোনো শিশুই জানে কলমটি পড়ে যাবে। কিন্তু সেটি ঠিক কোন দিকে পড়বে, তা কেউ জানে না। আসলে এটি আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।’

কিন্তু একটি এলএলএম তার প্রশিক্ষণের পরিসংখ্যানগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কলমটি কোন দিকে পড়বে, তার একটি অনুমান দাঁড় করানোর চেষ্টা করবে।

এই অনুমান সম্ভবত ভুল হবে। কারণ, এলএলএম পদার্থবিজ্ঞানের বাস্তব নিয়মগুলো বুঝতে পারছে না। এটি কেবল পরিসংখ্যানগতভাবে যা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, তা অনুমান করবে।

লেকুন জানান, তাঁর কোম্পানি জয়েন্ট এমব্যাডিং প্রেডিক্টিভ আর্কিটেকচার (জেপিএ) নামে এমন একটি সিস্টেম তৈরি করছে, যা এ ধরনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে।

এই সিস্টেমটি বাস্তব জগতের একটি বিমূর্ত রূপ তৈরি করে। ফলে এটি যেকোনো কাজের সম্ভাব্য ফলাফল মূল্যায়ন করতে পারে। এই বিমূর্ত রূপ তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল গণিতনির্ভর। তবে সহজ কথায়, এটি অপ্রয়োজনীয় তথ্য ছেঁটে ফেলে এবং এআইকে জগতের একটি কার্যকর চিত্র দেয়।

কলমের উদাহরণটিতে এআই বুঝতে পারবে যে কলমটি কোন দিকে পড়বে তা আগে থেকে অনুমান করার কোনো অর্থ নেই। রোবোটিকস–শিল্পের জন্য এমন এআই তৈরি করা এখন অগ্রাধিকারের বিষয়।

হিউম্যানয়েড বা মানবাকৃতির রোবট তৈরিতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে। প্রতিবছরই এদের সক্ষমতা বাড়ছে। কিন্তু ইস্তিরি করা বা ডিশওয়াশারে বাসন ধোয়ার মতো ঘরের কাজগুলো রোবটকে দিয়ে করানো ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়ছে।

লেকুনের মতে, বর্তমান এআই মডেলগুলো এই পরিবেশের জন্য কখনোই উপযুক্ত হবে না।

লেকুন আরও বলেন, ‘রোবোটিকসের জন্য এলএলএম মূলত অকার্যকর। এলএলএম বড় করলেই যে আমরা অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তায় পৌঁছে যাব, এমন দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন।’

এআইয়ের জগতের অনেকে লেকুনে সঙ্গে একমত। তাঁদের একজন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধ্যাপক এবং ফলিত এআই ল্যাবের পরিচালক ইঙ্গমার পোসনার। তিনি অ্যামাজন স্কলার হিসেবেও কাজ করেন।

পোসনার বলেন, ‘আমার মতে, আগামী দশকটি হবে ব্যাখ্যামূলক প্রযুক্তির। এমন মডেল আমাদের প্রয়োজন, যা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। যেমন কোনটি গুরুত্বপূর্ণ? কেন এমন ঘটছে? আমি যদি ভিন্ন কোনো কাজ করি, তবে কী হতে পারে?’

পোসনার ও তাঁর ১০ সদস্যের গবেষক দল চার বছর ধরে একটি বিকল্প এআই নিয়ে কাজ করছে। এটি ‘ওয়ার্ল্ড মডেল’ নামে পরিচিত।

ওয়ার্ল্ড মডেলের ধারণাটি কয়েক দশকের পুরোনো। তবে ২০১৮ সালে ডেভিড হা এবং ইয়ুর্গেন শ্মিডহুবারের প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র এই কাজে গবেষক দলকে অনুপ্রাণিত করেছে।

গবেষক দলের ধারণা ছিল, মেশিন লার্নিং ও কম্পিউটারের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এআই জগতের একটি ‘মানসিক সিমুলেশন’থেকে কাজ করতে শিখতে পারে। ২০১৮ সালের পর থেকে এই ধারণা ওয়ার্ল্ড মডেলের গবেষণায় জোয়ার এনেছে। গুগলও ‘ড্রিমা ওয়ার্ল্ড মডেল’ নিয়ে কাজ করছে। গত বছর মাইনক্রাফট গেমে হীরা সংগ্রহের জন্য একটি এআই কীভাবে ভবিষ্যতের দৃশ্য কল্পনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা প্রমাণিত হয়েছে।

পোসনার আশা করছেন, তাঁর দলের তৈরি ‘মেকানিস্টিক ওয়ার্ল্ড মডেল’ প্রযুক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতি আনবে। এটি জ্ঞানকে এমনভাবে সাজিয়ে রাখবে, যাতে এআই তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে।

পোসনার আরও বলেন, ‘আমাদের এমন সিস্টেম দরকার, যা জ্ঞানকে আলাদা ও গুছিয়ে রাখতে পারে। প্রয়োজনে যখন দরকার হবে, তখন এআই সেই জ্ঞান খুঁজে বের করবে, মিলিয়ে দেখবে এবং প্রয়োজনে পরিবর্তন করবে।’

তবে তেমন প্রযুক্তি তৈরি হতে কত সময় লাগবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন বলে মনে করেন পোসনার।

পোসনার আরও বলেন, ‘২০১৭ বা ২০১৮ সালে যদি কাউকে জিজ্ঞেস করতেন চ্যাটজিপিটির মতো কিছু আসতে কত সময় লাগবে, তবে তাঁরা বলতেন, কয়েক দশক।’

কিন্তু তার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসে।

গুগলের মালিকানাধীন ডিপমাইন্ড তাদের ‘জিনি’ মডেল এবং লন্ডনের প্রতিষ্ঠান ওয়েভ তাদের ‘গাইয়া’ সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে।

এদিকে এআই বিশেষজ্ঞ ফেই-ফেই লি ২০২৩ সালে সানফ্রান্সিসকোয় ‘ওয়ার্ল্ড ল্যাবস’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। লেকুন জানিয়েছেন, এএমআই ল্যাবস এ বছর তাদের মডেলটি আরও নিখুঁত করবে। আগামী বছর থেকে শিল্পকারখানায় এটি ব্যবহারের আশা করছেন তিনি।

যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে তাঁরা বড় পরিসরে চিন্তাভাবনা শুরু করবেন।

লেকুন বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমাদের এমন সাধারণ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিস্টেম থাকবে, যা খুব সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়েই পৃথিবীর যেকোনো কাজে লাগানো সম্ভব।’

তাহলে রোবট যখন স্বাধীনভাবে কাজ করবে, তখন মানুষের কী হবে?

লেকুন বলেন, ‘মানুষের কাজ মানুষই করবে। কী প্রশ্ন করতে হবে, কী তৈরি করতে হবে, কী সৃজন করতে হবে এসব সিদ্ধান্ত মানুষই নেবে। এটাই মূলত মানুষের কাজ।’

এআই মানুষের হয়ে কাজ করবে, যোগ করেন তিনি।

লেকুন আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতের এআই যদি আমাদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমানও হয়, তবু আমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হবে একজন শিল্পপতি বা রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাদের সহকারীদের সম্পর্কের মতো। অনেক সময় সহকারীরা নেতার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হলেও, তাঁরা নেতার নির্দেশেই কাজ করেন।’