হরমুজ প্রণালীতে চলছে নৌযান
হরমুজ প্রণালীতে চলছে নৌযান

হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রেখে কি ট্রাম্পকে নতিস্বীকার করাল ইরান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে ‘পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশ বিজয়’ বলে দাবি করেছেন। তবে চুক্তির শর্তগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হাতে রেখে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কতটা কার্যকর প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছে ইরান।

গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি ইরান খুলে দেওয়ার ওপর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া না-হওয়া নির্ভর করছে। এর মানে হলো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল পরিবহনের পথ এবং এর মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তেহরানের যে বিশাল প্রভাব, তা একপ্রকার পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্বালানিবিশেষজ্ঞ সামান্থা গ্রস গত মাসে বলেছিলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে ইরানের খুব বেশি সামরিক শক্তির প্রয়োজন নেই।’

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, তেলের বৈশ্বিক বাজার নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। গতকাল বুধবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে; একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং এক বিশ্লেষণী নোটে সতর্ক করে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নিতে এখনো বড় বাধা রয়েছে। বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

সব ধরনের জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। গতকাল ভোরের দিকে কিছু ট্যাংকার চলাচল করতে দেখা গেলেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলার পর ইরান আবার জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। আপাতত ইরানের সামরিক বাহিনীই এই নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করছে।

ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে ইরান। অথচ এই পথ দিয়েই বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ এবং ইউরিয়া সারের এক-তৃতীয়াংশ রপ্তানি হয়। আগে এমন অবরোধ কল্পনাতীত ছিল।

সামান্থা গ্রস বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সব সময় এই একটি বিষয় নিয়েই শঙ্কিত ছিলেন।’

তেল সরবরাহে এই ঐতিহাসিক বিঘ্নে সারা বিশ্বই এখন সংকটে পড়েছে। এশিয়ায় জ্বালানিসংকটের আশঙ্কায় ফিলিপাইন সরকার জাতীয় ‘জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে। ইউরোপে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এমনকি তেলসমৃদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান ভূরাজনৈতিক কৌশলী ড্যান আলামারিউ সিএনএনকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরান একটি যুদ্ধবিরতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। দেশটির শাসনব্যবস্থা দুর্বল হলেও টিকে আছে। ইরান মূলত এই প্রণালিকে ব্যবহার করে একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনা করছে।’

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানকে দুটি বড় সুবিধা দিয়েছে—বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কৌশলগত প্রভাব এবং চড়া দামে তেল বিক্রি করে যুদ্ধের অর্থায়নের সুযোগ।

বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ওয়াশিংটন এমনকি ইরানের প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষক হুমায়ুন ফালাকশাহির তথ্যমতে, মার্চ মাসে ইরান দৈনিক গড়ে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, যা আগের তিন মাসের গড়ের চেয়ে এক লাখ ব্যারেল বেশি।

সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার কম দামে তেল বিক্রি করে ইরান। কিন্তু ফালাকশাহি জানান, সম্প্রতি চীনের বাজারে তারা ব্রেন্ট ক্রুডের চেয়েও ৩ ডলার বেশি দামে তেল বিক্রি করেছে। ভারতের বাজারে এই বাড়তি মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৭ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।

যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায় তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরান যে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে এই অভিপ্রায় স্পষ্ট।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘর্ষের মধ্যে একটি পুলিশ স্টেশনে আগুন জ্বলছে। তেহরান, ইরান, ২ মার্চ

করপে কারেন্সি রিসার্চের প্রধান বাজার কৌশলী কার্ল শামোট্টা এক নোটে লিখেছেন, ‘ইরানের শাসকগোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করেছে এবং বিশ্ব তেল ও গ্যাসের বাজারকে নতিস্বীকারে বাধ্য করার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।’

অন্যদিকে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের প্রস্তাবগুলোকে আলোচনার জন্য ‘কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি স্থায়ী টোল বা মাশুলব্যবস্থা চালু করা হতে পারে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কেপলারের মতে, ওমান এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তারা টোল সংগ্রহ করে তার একটি অংশ ইরানকে দেবে, যা হতে পারে যুদ্ধে ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার একটি পথ।

শিপিং গোয়েন্দা সংস্থা লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে, ইরান ইতিমধ্যে জাহাজগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায় শুরু করেছে। অন্তত একটি জাহাজকে এই পথ ব্যবহারের বিনিময়ে ২০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।

গতকাল ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ইরান ও ওমান ওই জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ‘ট্রানজিট ফি’ বা যাতায়াত মাশুল আদায়ের পরিকল্পনা করছে। এ বিষয়ে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সিএনএন, তবে এখনো কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তথ্য বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের মতে, নীতিনির্ধারকদের তুলনায় বাণিজ্যিক শিপিং কোম্পানি এবং বিমাকারীরা এই যাতায়াত মাশুল মেনে নিতে বেশি আগ্রহী হতে পারে। কারণ হিসেবে তারা বলছে, পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর তেল রপ্তানির জন্য এই পথ ছাড়া বিকল্প কোনো কার্যকর রাস্তা নেই।