হামলার পর মিনাবের সেই স্কুলে উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ। এ হামলায় অন্তত ১৬৮ জন মানুষ নিহত হয়
হামলার পর মিনাবের সেই স্কুলে উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ। এ হামলায় অন্তত ১৬৮ জন মানুষ নিহত হয়

ইরানে স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত

ট্রাম্প অস্বীকার করে গেলেও ভিন্ন প্রমাণই মিলছে

ইরানের মিনাব শহরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা অস্বীকার করেই যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, যুদ্ধের মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রই আঘাত হানে বিদ্যালয়টিতে, যাতে দেড় শতাধিক শিশু নিহত হয়। তবে এই হামলা ও প্রাণহানির জন্য যে যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী, নতুন নতুন ভিডিওতে তার প্রমাণ বেরিয়ে আসছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা শুরুর পরপরই মিনাব শহরের শাজেরেহ তৈয়্যেবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে বিদ্যালয়টির প্রায় অর্ধেক অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তাতে নিহত হয় ১৬৮ জন, যাদের বেশির ভাগই প্রাতঃকালীন ক্লাসে উপস্থিত ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু।

বেসামরিক লক্ষ্যস্থলে এই হামলার জন্য ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্কুলকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দায়ী করেন ইরানকে। নিজের বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ না দিয়ে তিনি গত রোববারও বলেন, ‘আমি যা দেখেছি, তার ওপর ভিত্তি করে আমার মনে হচ্ছে, এটি ইরানই করেছে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা তো জানেনই, তাদের (ইরান) গোলাবারুদ বা অস্ত্রশস্ত্র খুবই নিম্নমানের। তাদের কোনো ধরনের নিখুঁত লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা নেই। এটি ইরানই করেছে।’

এরপর সোমবারও ট্রাম্প বলেন, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ইরান পেয়ে থাকতে পারে; যদিও এই ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের হাতে যাওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।

তবে ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহর–এ প্রকাশিত নতুন একটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

সিএনএন ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, ওই দিন মিনাবের সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে ইরানরে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময়ই স্কুলটিতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।

ভিডিওতে দেখা গেছে, মিনাব শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে নৌঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি একসময় বৃহত্তর আইআরজিসি কমপ্লেক্সের অংশ ছিল। অন্তত আট বছর আগে সেটিকে আইআরজিসি কম্পাউন্ড থেকে দেয়াল দিয়ে আলাদা করে ফেলা হয়। স্যাটেলাইট চিত্রে ভবনটিতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্পষ্ট চিহ্নও দেখা গেছে, যার মধ্যে খেলার মাঠ এবং দেয়ালে আঁকা রঙিন ম্যুরাল দৃশ্যমান ছিল।

ইরানের মিনাবে শাজারেহ তায়িবা স্কুলে হামলায় নিহত শিক্ষার্থীদের দাফন করতে পাশাপাশি অনেকগুলো কবর খোঁড়া হয়। মার্চ ২, ২০২৬

মেহেরে প্রকাশিত ভিডিওটি অনুসন্ধানী সংস্থা বেলিংক্যাট যাচাই করে দেখেছে। যাচাই করা ভিডিও, হামলার পরবর্তী ছবি এবং স্যাটেলাইট ইমেজসহ ঘটনাস্থলের অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে এই নতুন ভিডিও ইঙ্গিত দিচ্ছে, আইআরজিসির ঘাঁটিতে হামলার সময় শাজেরেহ তৈয়্যেবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে এক দফা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হয়।

হামলার পরবর্তী স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, এই হামলায় অন্তত চারটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যালয়টি ছাড়া অন্য তিনটি আইআরজিসি কম্পাউন্ডের তিনটি ভবন।

অস্ত্রবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিডিওতে দেখা যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রটি স্পষ্টভাবে একটি ‘টমাহক’, যা সেখানে যুদ্ধরতদের মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রই ব্যবহার করছে।

গোয়েন্দা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘আর্মামেন্ট রিসার্চ সার্ভিসেস’-এর পরিচালক এনআর জেনজেন-জোনস গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। যুদ্ধের পক্ষগুলোর সক্ষমতা বিবেচনা করলে এটি একটি মার্কিন হামলা বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ, ইসরায়েলের কাছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আছে বলে জানা নেই।’

স্যাটেলাইট চিত্রে ওপরে চতুর্ভুজ আকৃতির শাজেরেহ তৈয়্যেবাহ স্কুলটির অবস্থান

আর্মামেন্ট রিসার্চ সার্ভিসেস বিভিন্ন দেশের সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সমরাস্ত্রসংক্রান্ত বিশ্লেষণ সরবরাহ করে থাকে।

জেনজেন-জোনস বলেন, ‘অনলাইনে বিভিন্ন দাবি ছড়িয়ে পড়লেও সংশ্লিষ্ট গোলাবারুদটি নিশ্চিতভাবেই ইরানের সুমার ক্ষেপণাস্ত্র নয়। কারণ, সুমার ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনের দিকের নিচের অংশে একটি স্বতন্ত্র ইঞ্জিন থাকে।’

বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাটি ‘যুদ্ধাপরাধের’ শামিল হিসেবে দেখে এ ঘটনার তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেসকো বলেছে, বিদ্যালয়ে এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের ‘চরম লঙ্ঘন’।

এ হামলার ঘটনা ‘তদন্ত’ করে দেখা হবে বলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্ররা জানিয়েছেন। তবে মিনাব নিয়ে আলোচনার মধ্যে ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর খোমেইনের একটি স্কুলে গতকাল সোমবার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর দিয়েছে মেহের নিউজ। এ হামলায় হাফেজ খোমেইনি স্কুল ও এর সংলগ্ন আবাসিক এলাকা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।