ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তিটিকে নেতিবাচক চোখে দেখছেন ইসরায়েলের জনগণ। একটি জরিপে অংশ নেওয়া ৯২ দশমিক ১ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, এই চুক্তিতে তেহরানই জয়ী হয়েছে। হিব্রু ইউনিভার্সিটির ওই জরিপ অনুযায়ী, ৮২ দশমিক ৯ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, এই লড়াই ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দিয়েছে। আর ৮৬ শতাংশ মানুষ যুদ্ধের ফলাফলের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকার বিষয়ে ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ ইসরায়েলি বলেছেন, যুদ্ধ পরিচালনায় তিনি ছিলেন দুর্বল বা পুরোপুরি ব্যর্থ। অন্যদিকে জরিপে দেখা যায়, ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ইসরায়েলি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও তাঁরা এটি চান।
১৭ থেকে ২০ জুনের মধ্যে হিব্রু ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যৌথভাবে আগাম ইনস্টিটিউট এই জরিপ পরিচালনা করে। দেশের পুরো জনসংখ্যার চিত্র তুলে ধরতে ১৭ বা এর চেয়ে বেশি বয়সী ৩ হাজার ৬৪৪ ইসরায়েলিকে আনুপাতিক নমুনা হিসেবে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জরিপকারীদের মতে, ৯৯ শতাংশ আস্থার মাত্রায় (কনফিডেন্স লেভেল) এতে ভুলের সর্বোচ্চ মাত্রা ২ দশমিক ২ শতাংশ।
জরিপের ফলাফল থেকে স্পষ্ট, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর ইসরায়েলিদের আস্থা দ্রুত কমছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সাফল্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দাবি তাঁরা বিশ্বাস করেন না।
সংঘাত মোকাবিলায় নেতানিয়াহুর ভূমিকাকে ‘ব্যর্থ’ বা ‘দুর্বল’ বলে মত দিয়েছেন অর্ধেকের বেশি মানুষ। এর মধ্য দিয়ে সংকটের সময় সরকারের পদক্ষেপের প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ফুটে উঠেছে।
রাজনৈতিক এই নেতিবাচক প্রভাব নেতানিয়াহুর অবস্থানের ওপরও পড়ছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রতি মানুষের সমর্থন মার্চের শুরুর দিকের ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে জুনে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
গতকাল রোববার সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেন। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, তেল রপ্তানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির লক্ষ্যে এই আলোচনা শুরু হয়; আর ঠিক এ সময়েই জরিপের ফলাফলটি সামনে এল। চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অস্থায়ী চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এই আলোচনা চলছে। তবে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াই এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকলেই কেবল এই আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব। অন্যদিকে ওয়াশিংটন আশাবাদী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে এই আলোচনা থেকে একটি বড় চুক্তির রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব হবে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষের পর শুক্রবার নতুন করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ওয়াশিংটন। তবে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
ইসরায়েল মূলত ইরান ও লেবানন ইস্যুকে আলাদা করে দেখতে চায়। তবে বাস্তবতা হলো ইসরায়েলি জনগণের কাছেও বিষয়টি এখন স্পষ্ট যে ইস্যু দুটি একটি অপরটির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে তাদের সামরিক কার্যক্রম ও বিমান হামলা কমাতে বাধ্য হতে হয়েছে। কারণ, এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের ক্ষোভ খুব স্পষ্ট ও জোরালো ছিল। নিজ দেশে লেবাননের এই যুদ্ধবিরতি একদমই জনপ্রিয়তা পায়নি। কারণ, ইসরায়েলি জনগণ এটিকে নিজেদের পরাজয় হিসেবেই দেখছেন।
নেতানিয়াহু বর্তমানে খুবই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দেখছেন, জরিপে তাঁর লিকুদ পার্টির সমর্থন হু হু করে কমছে। অন্যদিকে ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। ওয়াশিংটন থেকে এমন খবরও আসছে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এবং তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখন ইসরায়েলের বিরোধী নেতাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছেন। এর ফলে আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পতন হতে পারে।